• ঢাকা
  • সোমবার, ১৭ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬ জুলাই, ২০২৩
সর্বশেষ আপডেট : ৬ জুলাই, ২০২৩

দেবে গেছে ৬৮১ কোটির বেড়িবাঁধ, কিছু অবকাঠামোর নাট-বল্টু গায়েব

প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ৪ বছর ১০ মাস। শেষ হয় ৯ বছর ১০ মাসে। কাজ শেষ হওয়ার পাঁচ বছর না যেতেই পরিলক্ষিত হচ্ছে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বেড়িবাঁধের অবকাঠামোর ঢালে রেইনকাট ও মাটি দেবে গেছে। পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোগুলো আবর্জনা-গাছপালায় ঢেকেছে। স্লুইসগেটগুলোর অবস্থাও নাজুক। বন্ধ পানিপ্রবাহ। অথচ এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৬৮১ কোটি টাকা। এত টাকা ব্যয় করেও মিলছে না প্রকৃত সুফল।

ইমার্জেন্সি ২০০৭ সাইক্লোন রিকভারি অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট (ইসিআরআরপি) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) কম্পোনেন্ট সি সাব কম্পোনেন্ট শীর্ষক প্রকল্পে দেখা গেছে এ অব্যবস্থাপনা। প্রকল্পের আওতায় বরগুনা জেলার খাজুরতলা পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোটি সচল থাকলেও এতে নাট-বল্টু নেই। স্লুইসগেটের পিন সঠিকভাবে কাজ না করায় ভোগান্তিতে স্থানীয়রা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

প্রতিবেদনে উঠে আসা প্রকল্পের দুর্বল দিকের মধ্যে রয়েছে সুনির্দিষ্ট এক্সিট প্ল্যান না থাকা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তীর সংরক্ষণ বাঁধসহ অবকাঠামোগুলো টেকসই না হওয়া, বাঁধ নির্মাণে জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘ সময় নেওয়ার ফলে কাজে ধীরগতি, পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোগুলোর স্থানীয়ভাবে পরিচালনার সু-ব্যবস্থা না করা ইত্যাদি। প্রকল্প বাস্তবায়নের নানা ধরনের ত্রুটির বিষয়ে জানতে চেয়ে চিঠি দেবে আইএমইডি।

আইএমইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রকল্পটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করেছি। বিষয়টি নিয়ে মিটিং করবো। আলাদাভাবে সুপারিশ করে বিষয়গুলো জানতে চাইবো। পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে তা জানতে চাইবো। বই আকারে প্রতিবেদন দিলে তেমন কোনো কাজ হয় না। অনেকে বই নিয়ে রেখে দেয়। মিটিং করে চিঠি দিলে কিছু কাজ হবে। যাতে একই ব্যত্যয় বারবার না হয় সে বিষয়েও আমরা সুপারিশ করবো।’

আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বরগুনা জেলার সদর উপজেলাধীন খাজুরতলা, ফুলতলা, কুমারখালী বরাবর বিষখালী নদী সংলগ্ন খালের ডান তীর বরাবর চেইনেজ কিমি ১২ দশমিক ২০০ থেকে ১৮ দশমিক ৪০০ পর্যন্ত বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করে আইএমইডি। এই পোল্ডারের বাঁধের কাজ ২০১৪ সালে শেষ হয়। খাজুরতলা পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোটি অনুযায়ী উচ্চতা সচল থাকলেও এতে নাট-বল্টু মিসিং রয়েছে। এছাড়া ফুলতলা স্লুইসগেটটি রয়েছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।

বেড়িবাঁধের অবস্থা ভালো নেই। সিসি ব্লকের কিছু অংশ দেবে গেছে। স্টক সিসি ব্লকগুলো খোলামেলা অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। গেটগুলো মেরামত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তীর সংরক্ষণ কাজ ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী হয়নি। বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলায় ভোরা পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো অচল। স্লুইসগেটের পিন সঠিকভাবে কাজ না করায় অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণে স্থানীয়রা পড়ছে ভোগান্তিতে।

প্রকল্পের মূল ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুযায়ী মোট ১৮০ কোটি ৬৪ লাখ ৯ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে আগস্ট ২০০৮ থেকে জুন ২০১৩ সাল মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২৩ অক্টোবর ২০০৮ সালে একনেকে অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটি প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ২০০৯ সালের মে মাসে সংগঠিত ঘূর্ণিঝড় আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্বাসনের কাজ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে মেয়াদ এক বছর ও প্রাক্কলিত ব্যয় ১৫৮ কোটি ৫৮ লাখ ৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে প্রকল্প মেয়াদ আগস্ট ২০০৮ থেকে জুন ২০১৪ এবং প্রাক্কলিত ব্যয় মোট ৩৩৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

পরবর্তীসময়ে দ্বিতীয় সংশোধনকালে প্রকল্প মেয়াদ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত বৃদ্ধি ও ব্যয় ৩৬৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বাড়ানো হয়। সবশেষ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে মেয়াদ বাড়িয়ে শুধু ব্যয় ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা বাড়ানো হয়। উন্নয়ন সহযোগীর পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে এক কোটি ৭ লাখ টাকা নির্বাহের জন্য ৩১ মে ২০১৬ তারিখে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরে নির্ধারিত সময়ে কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০১৮ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ব্যয় বাড়ে ২৭৭ দশমিক ১০ শতাংশ, মেয়াদ ৬০ মাস বা ১০৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাড়ে।

আইএমইডি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৭৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ৯৮ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৬৮১ কোটি ২২ লাখ টাকা, যা অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৯১ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি ৯ শতাংশ কম। আর্থিক অগ্রগতিও ৯ শতাংশ কম অর্জিত হয়েছে।

প্রকল্পের মূল কাজের মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় নদ-নদীগুলোর ভয়াবহ ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস থেকে পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার ১২টি উপজেলার ২৯টি পোল্ডার এলাকা রক্ষার জন্য ৩৬৫টি (নতুন ১৭৪টি মেরামত ১৯৯টি) পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ। মেরামতের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩৫৮টি (নতুন ১৬৭টি, মেরামত ১৯১টি) স্থাপনা নির্মাণ ও মেরামত করা হয়েছে, যা আর্থিক লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। মোট ৫১৪ দশমিক ২৪ কিমি (নতুন ৩৫.৪৩ কিমি, মেরামত ৪৭৮.৮১ কিমি) বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৫১৩ দশমিক ০৪ কিমি (নতুন ৩৪.২৩ কিমি ও মেরামত ৪৭৮.৮১ কিমি) বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামত করা হয়েছে।

এছাড়া লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাঁধের ঢালে দুই কিমি অংশে সম্পন্ন হয়েছে বনায়ন। প্রকল্পের আওতায় ৯৫ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৮৯ দশমিক ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করে প্রায় ২৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। খাতের কিছু অর্থ প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে হস্তান্তর বাকি।

প্রকল্পের আওতায় ২৩টি পণ্য, ৪২টি সেবা ও ১২টি কার্য সম্পর্কিত প্যাকেজ কেনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মূল ডিপিপিতে উল্লিখিত ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে ক্রয় কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়নি। প্রায় সব ক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে কার্য সংক্রান্ত প্যাকেজের কার্যক্রম সমাপ্ত করা হয়েছে।

আইএমইডি জানায়, প্রকল্পের উপকারভোগীদের ১২ বছর আগের পেশা এবং বর্তমান পেশার তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষিকাজে নিয়োজিতদের ক্ষেত্রে ৩৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ২৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, পোল্ট্রি/গবাদিপশু পালনে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ, শ্রমিক/দিনমজুর ২৪ দশমিক ১ শতাংশ কমে ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, মৎস্য চাষ ২ দশমিক ৩১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ব্যবসায়ী ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হয়েছে।

উপকারভোগী উত্তরদাতার মধ্যে ৮০ দশমিক ৫১ শতাংশ (৬২৮ জন) প্রকল্পের কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। নদীতীর সংরক্ষণ/বেড়িবাঁধের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে টার্গেট গ্রুপের ৩৪ দশমিক ২৮ শতাংশ উত্তরদাতা ভালো বলে মতামত দেন। প্রকল্পের সবল দিকের মধ্যে স্থানীয় জনসম্পদ নদীভাঙন ও বন্যার কবল থেকে রক্ষা, স্থানীয়ভাবে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রকল্প এলাকায় লবণাক্ততা হ্রাস, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গতি পেয়েছে।

আইএমইডির সুপারিশে দেখা যায়, প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষাকালে ডিপিপি, সংশোধিত ডিপিপি, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা এবং পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। উপকূলীয় তীর সংরক্ষণ বাঁধ ও পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার/মেরামত ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া জরুরি। এছাড়া বাঁধে টার্ফিং করা, বাঁধের দুই পাশে গভীর মূলবিশিষ্ট গাছপালা কিংবা ঘাস লাগানো, সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম গ্রহণ ইত্যাদি বিবেচনা করা যায়।

প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে কি না তা যাচাই করার জন্য প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত তিনটি জেলার ১২টি উপজেলার ১০টি পোল্ডার সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোট ৭৮০ জন উপকারভোগী (প্রোগ্রাম গ্রুপ) ও ৩৯০ জন উপকার বহির্ভূতসহ (কন্ট্রোল গ্রুপ) মোট ১১৭০ জন এলাকাবাসীর কাছ থেকে প্রশ্নের মাধ্যমে সংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া গুণগত তথ্য সংগ্রহের জন্য মোট ৪০টি কেআইআই, ১০টি এফজিডি, ১০টি কেস স্টাডি এবং পটুয়াখালীতে একটি স্থানীয় কর্মশালা পরিচালনা করা হয়।

আরও পড়ুন