• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১ ডিসেম্বর, ২০২৩
সর্বশেষ আপডেট : ১১ ডিসেম্বর, ২০২৩

ডাকাতির সময় শব্দ করায় নৈশপ্রহরীকে হত্যা

উপজেলা প্রতিনিধি, কবিরহাট : কবিরহাটে নৈশপ্রহরীকে হত্যা করে স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় মামলার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডাকাতি হওয়া স্বর্ণ, রৌপ্য, নগদ টাকা এবং আগ্নেয়াস্ত্রসহ পাঁচ ডাকাত ও তাদের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, কারাগারে থাকাকালে পরিচয় ও বন্ধুত্বের সুবাদে বড় ধরনের ডাকাতির পরিকল্পনা করেন তারা।

সোমবার (১১ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে নিজ সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহীদুল ইসলাম।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৮ ডিসেম্বর (শুক্রবার) ভোরে কবিরহাট উপজেলার চাপরাশিরহাট ইউনিয়নের চাপরাশিরহাট বাজারে নৈশপ্রহরীকে হত্যার পর দুইটি স্বর্ণের দোকানে দুর্র্ধষ ডাকাতির ঘটনা সংঘটিত হয়। খবর পেয়ে কবিরহাট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

প্রাথমিকভাবে জানা যায় আনুমানিক ১০/১৫ জনের একটি ডাকাত দল রাত ৩ টার পর চাপরাশিরহাট বাজারে প্রবেশ করে নৈশ প্রহরীসহ অন্যান্য চলাচলকারী লোকজনদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হাত-পা বেঁধে আনুমানিক দেড়/দুই ঘণ্টা ব্যাপী ডাকাতি করে। এসময় ডাকাত দলকে বাঁধা প্রদান করতে গেলে তারা নৈশ প্রহরী শহিদুল্লাহকে মাথায় আঘাত করে। যার ফলশ্রুতিতে ঘটনাস্থলেই উক্ত নৈশ প্রহরী শহিদুল্লাহ মারা যায়। এ হত্যাসহ ডাকাতির ঘটনায় কবিরহাট থানায় পেনাল কোড ৩৯৬ ধারায় একটি মামলা রুজু করা হয়।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা যায়, মামলা রুজুর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ও ডাকাতির মালামালসহ ৭ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, লক্ষীপুরের কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের চরপাগলা গ্রামের মৃত শহীদুল্লার ছেলে মো. নোমান (৩৫), একই উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নের পশ্চিম চর মার্টিন গ্রামের মোরশেদ আলমের বাড়ির মো. মোরশেদ আলমের ছেলে মো.সুজন হোসেন (২৭), হাজীরহাট ইউনিয়নের কৃঞ্চপুর গ্রামের ছৈয়াল বাড়ির সুভাষ চন্দ্র সরকারের ছেলে কৃঞ্চ কমল সরকার (৩২), নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার নদনা ইউনিয়নের জগজীবনপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে মো. শাহাদাত হোসেন (৩২), একই উপজেলার বজরা ইউনিয়নের মুসলিম গ্রামের হাজী বাড়ির মো. সোলেমানের ছেলে মো. সাদ্দাম হোসেন ওরফে জিতু (৩০), বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভার করিমপুর এলাকার মুন্সি বাড়ির মৃত অলি উল্যার ছেলে সালাউদ্দিন (৩২), কবিরহাট উপজেলার কবিরহাট পৌরসভার ১নম্বর ওয়ার্ডের জৈনদপুর গ্রামের মোশারফ বিএসসির বাড়ির মৃত মো. শহীদুল্লার ছেলে মো. মিজানুর রহমান ওরফে রনি (৩৬)।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক তারা সালাউদ্দিনের গ্যারেজে একত্রিত হয়। শাহাদাত চট্টগ্রাম থেকে ট্রাক আনে। সেই ট্রাকে করে শাহাদাত, সালাউদ্দিনসহ প্রায় ৫/৬ জন লোককে ডাকাতির উদ্দেশ্যে বেগমগঞ্জের চৌমুহনীর চৌরাস্তায় নিয়ে আসে। অন্য দিকে রনি তার সাথে আরো ০৪ জনসহ মোট ০৫ জন কবিরহাট থেকে চৌরাস্তায় আসে। রনি চৌরাস্তায় এসে শাহাদাতের সাথে মিলিত হয়। পরবর্তীতে সবাই একসাথে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা থেকে রাত ১ টায় রওনা দেয়। ট্রাকটি ডাকাতদের নিয়ে চৌমুহনী-সেনবাগ হয়ে দাগনভূঁইয়া বাজারের কিছু আগে সময়ক্ষেপণ করার জন্য আধাঘণ্টা অপেক্ষা করে। পরে আবার রাত আড়াইটায় সেখান থেকে চাপরাশির হাটের উদ্দেশ্যে রওনা করে। রাত আনুমানিক সাড়ে তিনটায় তারা দুধমুখা বাজার হয়ে ভূঁইয়ার হাট বাজারে পৌঁছে বামে ইউটার্ন নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ বাজারে না ঢুকে নির্জন শাখা রোডে ঢুকে চাপরাশির হাট বাজারে পৌঁছে। প্রথমে তারা বাজারের পশ্চিম পাশে নামে। নেমে বাজারের নাইট গার্ডকে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মুখে স্কচটেপসহ হাত-পা বেঁধে ট্রাকে তোলে। তারপর আবার ট্রাক নিয়ে সামনে যায় এবং অন্য একজন নাইট গার্ডকে একই ভাবে মুখে স্কচটেপসহ হাত-পা বেঁধে ফেলে। দুই জনকে বাঁধার পর বাজারের পূর্বাংশে গেলে সেখানে অন্য দুইজন নাইট গার্ড এর সাথে দেখা হলে তাদেরকেও একই কায়দায় বেঁধে ট্রাকে তোলে। কিন্তু একজন নাইট গার্ড ডাকাতদের বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করলে তাকে ডাকাতদের মধ্য থেকে কেউ আঘাত করে। ধারণা করা হচ্ছে, ডাকাতদের কারো আঘাতের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নাইটগার্ড মারা যায়।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, খবর পেয়ে পুলিশের একাধিক টিম ঘটনার তদন্ত শুরু করে। মামলার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে দুই সহযোগীসহ ৫ ডাকাতকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। এসময় তাদের কাছ থেকে লুন্ঠিত ৬০ ভরি স্বর্ণ-১৬০ ভরি রুপা এবং স্বর্ণ বিক্রির ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, একটি দেশীয় তৈরী পাইপগান ও দুই রাউন্ড কার্তুজ, একটি গ্যাস সিলিন্ডার ও একটি পাইপ উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, এই দুর্র্ধষ ডাকাতির পরিকল্পনাকারী মো. শাহাদাত। ২০১৮ সালে তার সাথে মো. মিজানুর রহমান রনির পরিচয় হয়। ঐ সময় দুজনই জেলে ছিল। জেল থেকে বের হয়ে তারা দুজনে মিলে নোয়াখালী ও আশপাশের জেলায় বিভিন্ন সময় ডাকাতির চেষ্টা করে। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। গত আট ডিসেম্বর এই ডাকাতির ১৫ বা ২০ দিন আগে শাহাদাত ও রনি চাপরাশিরহাট বাজার রেকি করে। এ সময় তারা মা-মনি জুয়েলার্সকে টার্গেট করে। রেকির পর তারা বিভিন্ন সময়ে বেগমগঞ্জে অবস্থিত সালাউদ্দিনের দোকানে বসে পরিকল্পনা করে। কে কতজন লোক আনবে, কে কি অস্ত্র নিবে, কিভাবে, কখন ডাকাতি করতে যাবে এসকল পরিকল্পনা শেষে তারা সালাউদ্দিনের দোকানে বসে দিন তারিখ ঠিক করে ডাকাতি করার জন্য।

তিনি আরও বলেন, সকল নাইট গার্ডকে বেঁধে ফেলার পর তারা পরিকল্পনা মাফিক মা-মনি জুয়েলার্সে ডাকাতি শুরু করে। দোকানের মেইনগেট কাটার দিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা করে, কিন্তু সেটা ভাঙ্গা সম্ভব হয় না। পরবর্তীতে তারা বিকল্প হিসেবে গ্যাস কাটার ব্যবহার করে সফল হয়। তারপর দোকানের তালা ভেঙ্গে দোকানে ঢুকে এবং সিন্ধুক কাটার জন্য প্রথমে নকল চাবি ব্যবহার করে। কিন্তু তাতে কাজ না হওয়ায় গ্যাস কাটার ব্যবহার করে সিন্দুক কেটে স্বর্ণালংকার ডাকাতি করে। পরবর্তীতে নুর জুয়েলার্সে যায় ডাকাতি করতে। সেখানে স্বর্ণের নাকের দুল ও রুপা ডাকাতি করে। ডাকাতি করার সময় তারা মা-মনি জুয়েলার্সের সিসিটিভি ভেঙ্গে হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যায়। ডাকাতির সময় তারা পরস্পর পরস্পরকে ‘মেম্বার’ বলে সম্বোধন করে।

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম ও অপস) মোহাম্মদ ইব্রাহীম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. মোর্তাহীন বিল্লাহ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বেগমগঞ্জ সার্কেল) মো. নাজমুল হাসান রাজিব, সহকারী পুলিশ সুপার (চাটখিল সার্কেল) নিত্যানন্দ দাস, কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলামসহ জেলায় কর্মরত প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ায় সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

  • কবিরহাট এর আরও খবর