• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২১ ডিসেম্বর, ২০২৩
সর্বশেষ আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০২৩

ঐতিহ্য চেনাতে ৩০ বছর ধরে জেলায় জেলায় ঘুরছেন মাইন উদ্দিন

নিজস্ব প্রতিবেদন : কি চমৎকার দেখা গেলো। পড়নে রংবেরঙের পোশাক। মাথায় রঙিন চুল, মুখে জোকারের মুখোশ। এমন দৃশ্য বর্তমানে বিরল। এক সময়কার গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী বিনোদন ছিল বায়োস্কোপ দেখা। এখন আর আগের মত চোখে পড়ে না। কিন্তু বাংলা থেকে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য বায়োস্কোপ ৩০ বছর ধরে দেখিয়ে শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষদের আনন্দ দেয়ার মাধ্যমে নিজের সংসার চালাচ্ছেন মো. মাইন উদ্দিন (৫০)।

নোয়াখালীর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় দেখা মিললো মাইন উদ্দিন ও তার বায়স্কোপের সাথে। দেশের বিভিন্ন জেলায় ঐতিহ্য চেনাতে বায়স্কোপ নিয়ে ঘুরছেন তিনি। মাইন উদ্দিন কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার আলীপুর গ্রামের মো. কাশেমের ছেলে।

একসময় গ্রামাঞ্চলে বায়োস্কোপের ব্যাপক প্রচলন ছিল। কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স ঝুলিয়ে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে যেত বায়োস্কোপ চালনাকারী। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো পেছন পেছন ছুটতো শিশু-কিশোররা। চাল বা সামান্য কিছু টাকা দিলেই দেখাতেন বায়োস্কোপ। গ্রাম-গঞ্জে, হাটে, মেলায়, অনুষ্ঠান ছাড়াও পাড়া-মহল্লায় বায়োস্কোপ দেখানো হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকায়নে বায়োস্কোপ এখন বিলীন।বলা চলে এটি বিলুপ্ত! তবে বায়োস্কোপের পতনে প্রথমত দায়ী টেলিভিশন। টেলিভিশন আসার পর থেকে বায়োস্কোপের দৌরাত্ম্য কমতে শুরু করছে। রঙিন টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল বায়োস্কোপের পতনকে ত্বরান্বিত করেছে। বর্তমানে জাদুঘরে রাখার পরিস্থিতিতে এটি। তবে বায়োস্কোপ নামে যে হারিয়ে যাওয়া একটি ঐতিহ্য ছিল তা নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেন না।

জানা গেছে, মাইন উদ্দিনের স্ত্রীসহ এক ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি ঢাকার গাজীপুরে থাকেন। দীর্ঘ ৩০ বছর যাবত বায়োস্কোপ দেখিয়ে সংসার চালিয়ে জীবন-যাপন করছেন। আগে বিভিন্ন হাট-বাজারে দর্শকদের বায়োস্কোপ দেখিয়ে আয় হলেও বর্তমানে তেমন আয় নেই। তবে বিবাহ, গায়ে হলুদ ও জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেলে ভালো টাকা আয় হয়।

সরেজমিনে নোয়াখালীর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় দেখা গেছে, মাইন উদ্দিনের বায়স্কোপ ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড়। কেউ কেউ বায়স্কোপের ছবি তুলছে কেউ আবার ভিডিও করছে। পড়নে রংবেরঙের পোশাক ও মাথায় রঙিন চুল থাকায় কেউ আবার মাইন উদ্দিনের সাথেও তুলছেন ছবি। অভিভাবকরা দাঁড়িয়ে থেকে শিশুদের দেখাচ্ছেন বায়স্কোপ।

ইসরাত জাহান নামের এক স্কুল শিক্ষার্থী বায়োস্কোপ দেখে বলেন, আমি আগে কখনও বায়োস্কোপ দেখিনি এবারই প্রথম দেখলাম। সবার কাছে বায়োস্কোপের গল্প শুনেছি আজ দেখলাম সত্যিই অনেক ভাল লাগছে। অনেক কিছু দেখলাম এর মধ্যেও অনেক কিছু শেখার আছে।

আইনজীবী এমদাদ হোসেন কৈশোর বলেন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের যুগে এই বায়স্কোপ দেখানো হচ্ছে এটাই বিশেষত্ত্ব। একদিকে ইন্টারনেট আরেকদিকে বায়স্কোপ। হারিয়ে যাওয়া বায়স্কোপ নোয়াখালীর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলায় দেখতে পাচ্ছি। এটাই আমাদের বেশ ভাল লাগার একটা বিষয়।

মাইন উদ্দিন বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে বায়স্কোপের সাথে আছি। আগে ছিল রিল সিস্টেম এখন ডিজিটাল হয়েছে। গায়ে হলুদসহ নানা অনুষ্ঠানে বায়স্কোপ দেখে তাই ধরে রাখা। বায়স্কোপে আমি বাংলাদেশের কিছু ঐতিহ্য রেখেছি। গরুর গাড়ি, পালকি, সুন্দরবন, পদ্মা সেতু, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন নায়ক নায়িকার ছবি দিয়ে একটা গল্প এই বায়স্কোপে রেখেছি। এই বায়স্কোপ টা আমি নিজেই বানিয়েছি।

মাইন উদ্দিন আরও বলেন, আমি ঢাকা আসছি মানুষজনকে বায়স্কোপ চেনাতে। যা আয় হয় তা দিয়ে চলা যায় না। এক হাজার বা ১২ শ টাকা হয় দিনে। অনেকে নাম ই শুনছে কিন্তু দেখে নাই। বাস্তবে বায়স্কোপ দেখাতে আমি এসেছি। খেয়ে দেয়ে আমার সমান সমান হলেও আমি এই বায়স্কোপ দেখিয়ে যাবো। এই ঐতিহ্যকে হারিয়ে যেতে দিবো না। কেউ দেখুক না দেখুক এটা তাদের বিষয় তবে আমি ঐতিহ্য ধরে রেখেছি এটাই আমার স্বার্থকতা।

আরও পড়ুন

  • বিশেষ প্রতিবেদন এর আরও খবর