• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৮ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ১২ জানুয়ারি, ২০২৪

গ্রামের স্কুল শিক্ষকের ছেলে ওবায়দুল কাদের টানা চার মেয়েদে মন্ত্রী

উপজেলা প্রতিনিধি, কোম্পানীগঞ্জ : বড় রাজাপুর গ্রামের মোশাররফ হোসেন মাস্টারের ছেলে ওবায়দুল কাদের। এই পরিচয়কে সব থেকে গর্বিত পরিচয় মনে করেন তিনি। বাড়িতে আসলেই ছুটে যান বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে। যেনো বারবার বাবা-মাকে বলার চেষ্টা করেন দেখো দেখো তোমাদের কাদের আসছে তোমাদের সাথে কথা বলতে। আজ তার কত কিছু হয়েছে। কত মানুষ তাকে ভালবাসে। কত সম্মান বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন। নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে বেড়ে উঠা গ্রাম্য মাস্টারের ছেলে ওবায়দুল কাদের আজ টানা চার মেয়াদে মন্ত্রী।

বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তৃতীয়বারের মতো মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি এবারও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট) আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে ২০১১ সাল থেকে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

জানা গেছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক আলোচিত নাম ওবায়দুল কাদের। একাধারে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক; অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই সামলাচ্ছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের গুরু দায়িত্ব। ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের বড় রাজাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ওবায়দুল কাদের। তার বাবার নাম মোশাররফ হোসেন এবং মায়ের নাম ফজিলাতুন্নেছা। বাবা মোশাররফ হোসেন সরকারি চাকুরি ছেড়ে দিয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী ছিলেন। ওবায়দুল কাদের বসুরহাট সরকারি এএইচসি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি ও নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে মেধা তালিকায় স্থান নিয়ে এইচএসসি পাশ করেন। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ।

ওবায়দুল কাদের কলেজ জীবন থেকে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলন ও ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং কোম্পানিগঞ্জ থানা মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) অধিনায়ক ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার কারাবরণ করেন।

১৯৭৫-এর পর এক নাগাড়ে দীর্ঘ আড়াই বছর কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং পরপর দুইবার ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত। দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

রচনা করেছেন আটটি গ্রন্থ। গ্রন্থগুলি হলো: ১. Bangladesh: A Revolution Betrayed (ইতিহাসগ্রন্থ), ২. এ বিজয়ের মুকুট কোথায়, ৩.বাংলাদেশের হৃদয় হতে (ভ্রমণ কাহিনি), ৪. পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু (অনুবাদ), ৫. তিন সমুদ্রের দেশে, ৬. মেঘে মেঘে অনেক বেলা, ৭. রচনা সমগ্র, ৮. কারাগারে লেখা অনুস্মৃতি: যে কথা বলা হয়নি।

ওবায়দুল কাদের বিগত ১২ জুন’ ৯৬- এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নোয়াখালী-৫ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২৩ জুন’ ৯৬ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং একই দিনে যুব ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তিনি ২০০১ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সৎ ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। ২০০২ সালের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন থেকে ২০০৯-এর সম্মেলন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। ১/১১ পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে তিনি ২০০৭ সালের ৯ মার্চ জরুরি বিধিতে গ্রেপ্তার হয়ে ১৭ মাস ২৬ দিন কারাবরণ করেন। ২০০৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তিনি জামিনে মুক্ত হন। কারাগারে থাকাকালে কারাজীবনের বর্ণনা দিয়ে ‘অনুস্মৃতি: যে কথা বলা হয়নি’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

তিনি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর পুনরায় দ্বিতীয়বারের মতো নোয়াখালী-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে তিনি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন।

শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০১১ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ২১তম সম্মেলনেও পুনরায় নির্বাচিত হন তিনি। ২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বর ২২তম সম্মেলনেও তিনি টানা তৃতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হন।

ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই বসুরহাট পৌরসভার মেয়র ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল কাদের মির্জা বলেন, একজন স্কুল শিক্ষকের ছেলে আমরা। আমাদের লালন পালন করতে গিয়ে বাবা নিজেও অনেক কষ্ট করেছেন। আমার ভাই ওবায়দুল কাদের সাহেব আজ অনেক বড় মানুষ হয়েছেন। গর্বে বুকটা ফুলে উঠে। বাবা-মা বেঁচে থাকলে কি যে খুশী হতেন তা বলে প্রকাশ করা যাবে না। ওবায়দুল কাদের সাহেব নিতান্তই একজন ভালো মানুষ, সৎ মানুষ। একজন স্বচ্ছ, কর্মঠ রাজনীতিবিদ। পূর্ণাঙ্গ সফলতায় পূর্ণ উনার জীবন। সারা জীবনই ওনি কর্মের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন এবং বিভিন্ন পদে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন।

কাদের মির্জা আরও বলেন, টানা চতুর্থ মেয়াদে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় ওবায়দুল কাদের সাহাবের নির্বাচনী এলাকা কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাটে বইছে আনন্দ- উচ্ছ্বাস। আমরা সবাই বেশ আনন্দিত হয়েছি। এই অঞ্চলে এত বড় সম্মান সামনে কেউ পাবে কিনা আমাদের জানা নাই। তিনি নোয়াখালীর উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। আগামীতেও তিনি ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন এটা আমাদের বিশ্বাস।

প্রসঙ্গত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট) আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ নিয়ে টানা চতুর্থবারের মতো আইন প্রণেতা হলেন তিনি।

রোববার (৭ জানুয়ারি) রাত ৯টার দিকে পাওয়া বেসরকারি ফল অনুযায়ী আসনের ১৩২টি কেন্দ্রে ওবায়দুল কাদের পেয়েছেন ১ লাখ ৮১ হাজার ২৭৯ ভোট। অপরদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খাজা তানভীর আহমেদ (লাঙ্গল) পেয়েছেন ৯ হাজার ৭০২ ভোট। এই হিসেবে ওবায়দুল কাদের প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ভোটে খাজা তানভীর আহমেদকে পরাজিত করেছেন। ফলে পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন ওবায়দুল কাদের।

আরও পড়ুন