• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

গণধর্ষণে মৃত্যুদণ্ড রায়ের দিনেই ফের মা মেয়েকে ধর্ষণের শিকার

নিজস্ব প্রতিবেদন : সুবর্ণচর উপজেলায় দলবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দিনে আরেকটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ঘরের সিঁধ কেটে চুরি করতে ঢুকে মা ও মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রধান আসামি স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বিগত বছরগুলোতেও ধর্ষণের বরাবরই আলোচনায় থাকতো সুবর্ণচর উপজেলা। এসব ঘটনায় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীনদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন রাতে সুবর্ণচরে গৃহবধূকে (৪০) দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলার রায়ে ইউপি সদস্য রুহুল আমিনসহ ১০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়াও ৬ আসামিকে যাবজ্জীবন এবং প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

নোয়াখালী নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সদস্য সচিব জামাল হোসেন বিষাদ বলেন, সারাদেশের মানুষ যখন দেখেছে দলবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার রায়টি যেমন ঐতিহাসিক হয়েছে। সেদিন আবার ও মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাটি আমাদের জন্য ন্যাক্কারজনক। আমরা লজ্জিত এসব ঘটনা। আগের মামলায় ইউপি সদস্য রুহুল আমিন জড়িত ছিল। এবার ইউপি সদস্য খায়ের মুন্সি। তিনি চরওয়াপদা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিও। যারা সমাজের পথপ্রদর্শক তারাই যদি এমন ঘটনার সাথে জড়িত হয় তাহলে মানুষ কোথায় যাবে।

নারী অধিকার জোটের সভাপতি লায়লা পারভীন বলেন, সুবর্ণচর উপজেলা চরাঞ্চল হওয়ায় এখানে মানুষজন ক্ষমতাসীনদের কাছে অসহায়। তারা অতীতেও যেমন ধর্ষণের শিকার হয়েছে বর্তমানেও হচ্ছে। সব কিছু আমাদের কাছে আসেনা। ভিটেমাটি আর নিজেদের জীবন রক্ষায় তারা তাদের এসব অপরাধ গোপন রাখছেন। পূর্বে বিভিন্ন ভূমিদস্যরা নদী ভাঙ্গনের শিকার পরিবার গুলোকে জমি দেওয়ার কথা বলে ধর্ষণ করতো৷ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার মতো কারো অবস্থা থাকতো না।

সুশাসনের জন্যে নাগরিক সুজনের জেলা সভাপতি অ্যাভোকেট মোল্লা হাবিবুর রাছুল মামুন বলেন, ভূমিহীনরা একটু ঠাই এর জন্য ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে জমি কিনতো। ওইসব ভুমিহীনদের ঘরে থাকা স্ত্রী সন্তানকে সম্ভ্রম হারাতে হতো। তাদের পরিবারের কর্তা দিনমজুর হওয়ায় তারা বিভিন্ন সময় ইটভাটা বা নদীতে মাছ শিকারে থাকতো। নিজেদের ইজ্জতের ভয়ে এসব কথা প্রকাশ পেতো না। পেলেও ন্যায় বিচার না হয়ে শালিশের মাধ্যমে সামান্য জরিমানা দিয়ে মিমাংসা হতো।

তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন রাতে এক গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের বিষয়টি মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দেখেছেন আদালত। নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক (জেলা জজ) ফাতেমা ফেরদৌস আলোচিত এ মামলার রায় পর্যালোচনায় বলেছেন, আসামিরা শুধু ভিকটিমের ক্ষতি করেনি বরং রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করেছে। এ ধরনের অপরাধ করে আসামিরা যদি খালাস পায় তাতে বিচারক ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। তাই আসামিরা বিচারকের কোনো ক্ষমা কিংবা করুণা পেতে পারেন না বরং তারা তাদের প্রকৃত অপরাধের সাজা পেলে ন্যায় বিচার নিশ্চিত হবে। ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি এ ধরনের অপরাধ করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকবে।

এ রায়কে দৃষ্টান্তমূলক হিসেবে তুলে ধরে বিচারক বলেন, এ মামলায় পক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষীদের মৌখিক সাক্ষ্য, দালিলিক সাক্ষ্য, ভুক্তভোগীর ২২ ধারায় জবানবন্দি, ভুক্তভোগীর ডাক্তারি সনদপত্র প্রদর্শন, আসামিদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। আইনে বলা আছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে নারী বা শিশু আহত হন তাহলে তাদের প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজার বিধান আছে।

সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হানিফ চৌধুরী বলেন, ২০১৮ সালের গণধর্ষণের ঘটনায় ইউপি সদস্য রুহুল আমিনকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। সংগঠনবিরোধী কাজে জড়িত হওয়ায় সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবুল খায়ের মুন্সি মেম্বারের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরাও চাই দোষী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি। তারা আমাদের দলের পরিচয় দিয়ে অপকর্মে জড়িত হবে তা হতে পারে না।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একেক স্থানে একেক ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়। চরাঞ্চলে মানুষজনের আনাগোনা কম থাকে। সেখানে বসতি যেমন কম তেমনি কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা প্রকাশ হতেও সময় লাগে। তার মধ্যে আইনের সহযোগিতায় পাওয়ার আগেই অনেকে শালিশের মাধ্যমে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এতে করে নিজেদের মধ্যে আইনের প্রতি অনাস্থা চলে আসে। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক ঘটনা আবার অপ্রকাশিত থেকে যায়। এসব ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করানো দরকার এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার থাকা দরকার বলে আমি মনে করি।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, যেকোনো ঘটনা আমরা পেলে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করে থাকি। এসব ক্ষেত্রে আসামি ক্ষমতাবানদের অনুসারী নাকি জনপ্রতিনিধি সেসব আমাদের দেখার বিষয় না। আইন আইনের গতিতে চলে। ২০১৮ সালের গণধর্ষণের ক্ষেত্রে ইউপি সদস্য রুহুল আমিন মামলার আসামি ছিলেন না। আমরা তদন্তে নাম পেয়ে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছি। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। অপরাধী সব সময় অপরাধী। বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধীদের এক চুলও ছাড় দেওয়া হবে না। আশা করি এধরণের মামলায় ভুক্তভোগী ন্যায় বিচার পাবেন।

আরও পড়ুন

  • বিশেষ প্রতিবেদন এর আরও খবর