• ঢাকা
  • বুধবার, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

পর্যটকদের কাছে টানছে নিঝুম দ্বীপের খেজুর গুড়

নিজস্ব প্রতিবেদন : শীতকালের প্রধান আকর্ষণ খেজুরের রস ও খেজুরের গুড়। শীতের পিঠা পুলি তৈরিতে খেজুরের গুড়ের জুড়ি নেই। শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার নিঝুমদ্বীপে ঘুরতে আসা পর্যটকরা মাতোয়ারা খেজুরের গুড় ও রসে। গাছ থেকেই খেজুরের রস খাচ্ছেন পর্যটকরা। পাশাপাশি খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় নিয়ে যাচ্ছেন আত্মীয় স্বজনদের জন্য। সারাদেশে পাঠানো হচ্ছে এখানকার গুড়। গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে রাসায়নিক কোনো দ্রব্য ব্যবহার ছাড়াই গুড় তৈরি করেন এখানকার গাছিরা। দিন দিন বাড়ছে এখানকার খেজুর গুড়ের কদর।

জানা গেছে, গাছিদের মধ্যে কেউ বংশ পরম্পরায়, কেউ বা শীতের মৌসুমে অর্থনৈতিক লাভের আশায় খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করেন। জেলার প্রতিটি উপজেলায় খেজুরের রস সংগ্রহ করা হলেও সব চেয়ে বেশি গাছ রয়েছে হাতিয়ায়।

সরেজমিনে নিঝুম দ্বীপে দেখা যায়, নিঝুম দ্বীপের প্রতিটি সড়কে সারি সারি খেজুর গাছ। গাছে লাগানো হাড়ি। রাতভর ফোঁটা ফোঁটা রস পড়ে ভর্তি হয় হাড়িগুলো। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে সেই রস সংগ্রহ করছেন গাছিরা। গাছিদের সঙ্গে থেকে পরিবারের শিশুরা এগিয়ে দিচ্ছে কলসি-হাড়িগুলো। রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। রস চুলায় জ্বাল দেওয়ার প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে লাল গুড় তৈরি হতে। রস জ্বালিয়ে তৈরি করা গুড়ের চাহিদাও অনেক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৯৯ হেক্টর জমিতে রোপনকৃত খেজুরের গাছ থেকে ৪৯৬ মেট্রিক টন খেজুরের রস সংগ্রহ করেন গাছিরা। প্রতি হেক্টর জমির খেজুরের রস থেকে গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ টন করে।

হাতিয়া উপজেলার প্রায় ২৮ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের খেজুর গাছের আবাদ রয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে প্রায় ১০৯৯ টি গাছ রয়েছে। প্রতি শীত মৌসুমে গাছিরা এই গাছগুলো থেকে রস সংগ্রহ করে খেজুর গুড় তৈরি করে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য হিসেবে এই খেজুরের রস ও গুড়ের বেশ চাহিদা রয়েছে। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে খেজুর গাছ থাকলেও নিঝুম দ্বীপ ও জাহাজমারাতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে। হেক্টর প্রতি ১৬ টন হারে ৪৫০ মেট্রিকটন গুড় উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

৩০ বছর ধরে নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের মোল্লা গ্রামের সিরাজ উদ্দিন ও তার পরিবার খেজুরের রস ও গুড়ের সঙ্গে জড়িত। ভোর হলেই সিরাজ উদ্দিন গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে চুলায় গরম করে। তারপর রস থেকে গুড় হলে তা বিক্রি করে। সিরাজ উদ্দিনের ছেলে স্বপন উদ্দিন বলেন, আমাদের রসের যেরকম চাহিদা গুড়েরও সেরকম চাহিদা আছে। পর্যটকরা পর্যটকরা রস যেমন খায় তেমনি গুড় নিয়ে যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম সারাদেশে আমাদের এই গুড়ের রয়েছে। এছাড়াও শীতের পিঠা তৈরি করে মেহমানদেরকে গুড় ও নারকেলসহ খেতে দিয়ে সম্মান করা হয়।

মো. জসিম উদ্দিন নামের আরেক রস ও গুড় বিক্রেতা বলেন, পর্যটকরা আশায় আমাদের গুড়ের দাম এবং রসের দাম বাড়ছে। ঘুরতে এসে এসব রস ও গুড় তারা তাদের পরিবারের জন্য নিয়ে যায়। তারা গিয়ে যখন আবার এই রস ও গুড়ের কথা বলে তখন নতুন পর্যটকরা এসে এসব সংগ্রহ করে। এসব কারণে আমরা ভালো দাম পাচ্ছি।

বেলাল আহমেদ নামের আরেক বিক্রেতা বলেন, আমাদের এই গুড় বাড়িতেই বিক্রি হয়। বেপারীরা আমাদের বাড়িতে এসে তারা নোয়াখালী নিয়ে যায় এবং সেখানে গিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। আমরা কেজি প্রতি ১৫০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা বিক্রি করি।

নিঝুমদ্বীপে ঘুরতে আসা রাজু আহমেদ বলেন, আমরা নিঝুমদ্বীপ ঘুরতে আসছি। আমাদের পরিবারের জন্য মিঠাই নিয়েছি ১৪ লিটার, মধু নিয়েছি ১ লিটার আর রস নিয়েছি ১০ লিটার। এখানের মধু, মিঠাই ও রস খুব ভালো। আমরা এখানে খেয়েছি আবার পরিবারের জন্য নিয়ে যাচ্ছি।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মো. কেফায়েত হোসেন বলেন, নিঝুম দ্বীপের পর্যটকদের কাছে খেজুরের রস ও গুড় বিখ্যাত। তারা তাজা রস খেয়ে অনেক বেশি আনন্দিত হয়। কিভাবে খেজুরের গুড় বানানো হয় তারা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখে, সেখান থেকেই তারা গুড় সংগ্রহ করে তাদের পরিবারের জন্য নিয়ে যায়। নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দারা যদি সংরক্ষণ করে বাহিরে নিয়ে গিয়ে সরাসরি গুড় বিক্রি করতে পারত ভালো দাম পেত। তারপরেও পর্যটকরা আসার কারণে দাম পাচ্ছে। পর্যটকরা সবাই ৫ লিটার, ১০ লিটার করে নিয়ে যাচ্ছে। নিঝুম দ্বীপের মানুষ খেজুরের গুড় দিয়ে লাভবান হচ্ছে।

নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আফছার দিনাজ বলেন, খেজুরের গুড়ের জন্য নিঝুম দ্বীপ বিখ্যাত। বাণিজ্যিকভাবে এটি ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। লবণাক্ত জায়গায় খেজুর গাছ ভালো হয়। নিঝুম দ্বীপে বেড়িবাঁধ নেই। যদি বেঁড়িবাধ হলে গাছগুলো সংরক্ষণ করা যেত। এছাড়াও নতুন করে খেজুর গাছ রোপন করা গেলে ভালো হতো।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নোয়াখালীর উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শহীদুল হক বলেন, নোয়াখালী জেলায় প্রায় ৯৯ হেক্টর জমিতে খেজুরের চাষ হচ্ছে। আমরা ৪৯৬ মেট্রিক টন খেজুরের রস পেয়ে থাকি। পর্যটকরা যারা যায় তারা সকালে খেজুরের রসকে খুব তৃপ্তি মনে করে খায়। শুধু তাই নয় তারা পিঠা পায়েস খাওয়ার জন্য খেজুরের রস নিয়ে আসে। আমরা আমরা চেষ্টা করছি নতুন করে খেজুরের গাছ লাগানো যায় কিনা। এর মধ্যে অনেক গাছ পুরাতন হয়ে গেছে। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে গাছ রোপনের চেষ্টা করছি। আশা করি আগামীতে খেজুরের রস ও গুড় বৃদ্ধি পাবে। সাথে সাথে পর্যটকদের সংখ্যা ও আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।

আরও পড়ুন

  • বিশেষ প্রতিবেদন এর আরও খবর