• ঢাকা
  • রবিবার, ১৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৪ মার্চ, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ১৪ মার্চ, ২০২৪

ভাইয়ের কাছে নাবিকের বার্তা/সোমালিয়ান পাইরেটস অনবোর্ড, বাঁচি থাকলে দেখা হবে

স্টাফ রিপোর্টার : ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের হাতে জিম্মি বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর এবি’ (অ্যাবল সীমেন) হিসেবে কর্মরত মোহাম্মদ আনারুল হক রাজুর (২৯) তার বড় ভাই মো জিয়াউল রনিকে খুদে বার্তা পাঠিয়েছেন। সেখানে তিনি জানান, সোমালিয়ান পাইরেটস অনবোর্ড, বাঁচি থাকলে দেখা হবে, দোয়া কইরেন। এরপর রাত ১০টায় ভয়েজ মেসেজে জানায়, আমাদরকে সোমালিয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে দোয়া করবেন।

বুধবার (১৩ মার্চ) দুপুরে রামপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আজিজুল হক মাস্টার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় জিম্মি নাবিক আনোয়ারুলের বাবা-মা, ভাই-বোনরা সবাই কান্নাকাটি করছেন।

অপহৃত মোহাম্মদ আনারুল হক রাজু কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের (আজিজুল হক মাস্টারের বাড়ি) আজিজুল হক মাস্টার ও দৌলত আরা বেগমের ছেলে। তার পাসপোর্ট নম্বর চচ. ঘড়.অ১২০১২৯৪৪। সে অবিবাহিত। ২ ভাই ১ বোনের মধ্যে সে তৃতীয়।

রাজু বামনী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে এসএস পাস করেন। বামনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। চট্টগ্রামের ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট (এনএমআই) থেকে সিডিসি কোর্চ সম্পূর্ণ করেন। পরিবারের একটিই দাবি বাংলাদেশিদের উদ্ধার করে সরকার যেন স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে।

রাজুর বড় ভাই মো জিয়াউল রনি বলেন, আমরা দুই ভাই এক বোন সে সবার ছোট রাজু। ২০১৬ সালে সে জাহাজে উঠে গত ৮ বছর সে জাহাজ কর্মরত রয়েছে। গত নভেম্বরে সে সিঙ্গাপুর থেকে জাহাজে ওঠে। গতকাল সে আমার মোবাইলে মেসেজ লেখেন ‘সোমালিয়ান পাইরেটস অনবোর্ড, বাঁচি থাকলে দেখা হবে, দোয়া কইরেন…..’!
রাজুর মা দৌলত আরা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ঘর ভাঙ্গা ছিল, এখন বিল্ডিং করতেছি ঘরের কাজ শেষ হলে ছেলে জাহাজ থেকে এলে তাকে বিয়ে করাবো, তার জন্য পাত্রী দেখতেছি। এরই মধ্যে গতকাল খবর পেলাম আমার ছেলেসহ ২৩ জন্য বাংলাদেশিসহ অপহৃত হয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের নেতা সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সহযোগিতা চাই।

রাজুর বন্ধু ইমরান সময় বলেন, গতকাল (১২ মার্চ) ভোর রাতে রাজু হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে বলেন তাদরকে জাহাজের একটি কেবিনে আটকিয়ে রেখেছে। রাতে সেহরি খাবার জন্য দিয়েছে দস্যুরা। এরপর তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

রাজুর বাবা আজিজুল হক মাস্টার বলেন, আমার ছেলেসহ সবাইকে উদ্ধার করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও কোম্পানীগঞ্জের সংসদ সদস্য সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সহযোগিতা কামনা করছি। গতকাল থেকে আমাদের পরিবারে হতাশা ও আতংক। তার মা ক্ষণে ক্ষণে ছেলের জন্য মূর্ছা যাচ্ছেন।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ২৩ জন জিম্মি হওয়া বাংলাদেশি নাবিকের মধ্যে দুই জনের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। অ্যাবল সীমেন (নাবিক) হিসেবে মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক রাজু (২৯) ও ফাইটার হিসেবে মোহাম্মদ সালেহ আহমেদ। এরমধ্যে মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক রাজুর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের ৮নম্বর ওয়ার্ডের রামপুর গ্রামের আজিজুল হক মাস্টারের ছেলে।সালেহ আহমেদের বিস্তারিত পরিচয় জানতে আমরা মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করছি।

জানা গেছে, অপহৃত জাহাজটি চট্টগ্রামের কবির গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এস আর শিপিং লিমিটেডের মালিকানাধীন। যার নাম এমভি আবদুল্লাহ, পণ্যবাহী জাহাজটি কয়লা নিয়ে, ভারত মহাসাগর হয়ে মোজাম্বিক থেকে আরব আমিরাতের আল-হামরিয়া বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। গন্তব্য ছিল দুবাই। বুধবার (১৩ মার্চ) মালিকপক্ষ জিম্মি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে নাবিকদের ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান কবির গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টার দিকে ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবলে পড়া বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আবদুল্লাহতে জিম্মি আছেন ২৩ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু। আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে কয়লা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার পথে জাহাজটি জলদস্যুর কবলে পড়ে। এরপর বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জাহাজটি ভারত মহাসাগর থেকে সোমালিয়া নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করে দস্যুরা। বর্তমানে নাবিকদের ইন্টারনেট কানেকশন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে বুধবার (১৩ মার্চ) সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাংলাদেশি জাহাজটি এখন উপকূল থেকে প্রায় ২৭৫ নটিক্যাল মাইল দূরে। সোমালিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এমভি আব্দুল্লাহ দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপ কেএসআরএম’র মালিকানাধীন এসআর শিপিংয়ের জাহাজ। এর দৈর্ঘ্য ১৮৯ দশমিক ৯৩ মিটার এবং প্রস্থ ৩২ দশমিক ২৬ মিটার। প্রথমে জাহাজটির নাম ছিল ‘গোল্ডেন হক’। বাংলাদেশের কেএসআরএম গ্রুপের বহরে যুক্ত হওয়ার পর এর নাম হয় ‘এমভি আবদুল্লাহ’। এটি একটি বাল্ক কেরিয়ার।
বৈশ্বিক জাহাজের অবস্থান নির্ণয়কারী সাইট মেরিন ট্রাফিক জানিয়েছে, জাহাজটি ৪ মার্চ আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুটো বন্দর ছেড়ে আসে। ১৯ মার্চ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। তার আগেই এর দখল নেয় জলদস্যুরা।

জিম্মি নাবিকদের মধ্যে রয়েছেন- জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ আবদুর রশিদ। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর গোসাইলডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা। চিফ অফিসার আতিক উল্লাহ খানের বাড়ি চন্দনাইশ উপজেলার বরকলে, সেকেন্ড অফিসার মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা, থার্ড অফিসার এন মোহাম্মদ তারেকুল ইসলাম ফরিদপুর জেলার মধুখালি থানার বাসিন্দা, ডেক ক্যাডেট সাব্বির হোসাইন টাঙ্গাইল জেলার নাগপুর থানার বাসিন্দা, চিফ ইঞ্জিনিয়ার এ এস এম সাইদুজ্জামানের বাড়ি নওগাঁ সদর উপজেলায়, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. তৌফিকুল ইসলাম ও থার্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. রোকন উদ্দিন খুলনা জেলার সোনাডাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহমেদ ও ইলেকট্রিসিয়ান ইব্রাহীম খলিল উল্লাহ ফেনী জেলার বাসিন্দা, ইঞ্জিন ক্যাডেট আইয়ুব খানের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানায়।

এছাড়া ক্রু দের মধ্যে মো. শরিফুল ইসলামের বাড়ি চট্টগ্রাম নগরের বন্দর থানা এলাকায়, মো. আসিফুর রহমানের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, মোশাররফ হোসেন শাকিল ও আইনুল হকের বাড়ি মিরসরাই উপজেলায়। মো. সাজ্জাদ হোসেন, নুর উদ্দিন ও মোহাম্মদ সামসুদ্দিনের বাড়ি চট্টগ্রামের কর্ণফুলি উপজেলায়। মো. আনোয়ারুল হকের বাড়ি নোয়াখালির কোম্পানিগঞ্জ, জয় মাহমুদের বাড়ি নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া, মো. নাজমুল হকের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার কামারাখন্দ ও মো. আলী হোসেনের বাড়ি বরিশালে বানাড়িপাড়া গ্রামে।

আরও পড়ুন

  • বিশেষ প্রতিবেদন এর আরও খবর