• ঢাকা
  • সোমবার, ২৭শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২৮ মার্চ, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ২৮ মার্চ, ২০২৪

১৩ বছরে একবারও সংস্কার হয়নি সড়ক, পর্যটক হারাচ্ছে নিঝুমদ্বীপ

বিশেষ প্রতিবেদন : নিঝুমদ্বীপের নাম শুনলেই চোখে ভাসে মায়াবী হরিণ, সুদীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, দিগন্ত বিস্তৃত বিশাল কেওড়া বন। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এ দ্বীপটিকে যেন ঢেলে সাজিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। সাগরের জলরাশি আর ঢেউয়ের গর্জনের সঙ্গে হিমেল হাওয়ায় মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ।

নৈসর্গিক এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু হাজারো পর্যটক ঘুরতে আসেন নিঝুম দ্বীপে। কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জরিত হওয়ায় সম্ভাবনাময় নিঝুমদ্বীপে দিন দিন কমছে পর্যটক সমাগম।

এছাড়া খানাখন্দে ভরা দ্বীপের প্রধান সড়কের কারণে চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটকদের। ক্রমেই আকর্ষণ হারাচ্ছে দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন স্পটটি। তবে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশের অন্য যেকোনো পর্যটন কেন্দ্রের মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে দ্বীপটি।

জানা যায়, ২০০১ সালে সরকার এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করলেও চোখে পড়ে না তেমন কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম। দ্বীপে হাতেগোনা কয়েকটি থাকার হোটেল ও খাবার রেস্টুরেন্ট থাকলেও তা খুবই নিম্নমানের। এতে নানা দুর্ভোগে পড়েন পর্যটকরা।

দীর্ঘ ১৩ বছর আগে আইলা প্রকল্পের আওতায় আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে বন্দরটিলা ঘাট থেকে নামার বাজার বিচ পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কটি নির্মাণ করা হয়। এই ১৩ বছরে একবারও তা মেরামত করা হয়নি। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কারণে একাধিকবার চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে সড়কটি। প্রতিটি জলোচ্ছ্বাসের পর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সামান্য মাটি দিয়ে খানাখন্দ ভরাট করা হলেও কিছু দিন চলার পর তা আবারও গর্তে পরিণত হয়। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের সময় এই সড়কের ওপর দিয়ে ৬ ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হয়। এতে করে অনেক জায়গা ভেঙে খালে পরিণত হয়।

সরেজমিন দেখা যায়, রাস্তার মাঝখানে বিশাল বিশাল গর্ত হয়ে আছে। জোয়ারের স্রোতে সড়কের নিচের মাটি সরে গিয়ে ভেঙে পড়েছে ওপরের আরসিসি ঢালাইয়ের বিভিন্ন অংশ। মোটরসাইকেলে চলা গেলেও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও টমটম পার করতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। যাত্রীসহ তিন-চারজন একসঙ্গে হয়ে ধাক্কা দিয়ে গাড়িগুলো পার করতে হচ্ছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় যাত্রী নামিয়ে খালি গাড়ি পার করছেন অনেকে।

স্থানীয়রা জানান, এই ভাঙা রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন অনেকে। কয়েক দিন আগেও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নিঝুম দ্বীপ ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আলাউদ্দিনের ছেলে সম্পদ। কয়েক মাস আগে ধান বোঝাই একটি টমটম উল্টে আহত হন এক কৃষক। একইভাবে পা ভেঙে যায় ৩নং ওয়ার্ডের আবুল কালাম নামের আরও এক কৃষকের।

অটোরিকশাচালক নবীর উদ্দিন বলেন, রাস্তার ঢালাই ভেঙে যাওয়ায় সরু পথ দিয়ে অনেক ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। বন্দরটিলা বাজার থেকে যাত্রী এবং মালামাল বোঝাই করে নামার বাজার যাওয়ার সময় আটকা পড়েছি। এখন গাড়ি থেকে মালামাল নামিয়ে মাথায় বহন করে ভাঙা অংশটুকু পার করতে হবে। প্রতিদিনই আমাদের এই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

আরেক অটোরিকশাচালক রুবেল বলেন, দিনের বেশিরভাগ সময় স্থানীয় মানুষের চেয়ে পর্যটকদের আনা নেওয়া করা হয়। কিন্তু রাস্তার এই খারাপ অবস্থা দেখে পর্যটকরা অনেক বিরক্ত হন। অনেকে মোবাইলে অন্যদের না আসার পরামর্শ দেন।

ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা আকতারুজ্জামান বলেন, লোকমুখে শুনে পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে এসেছি। যে কষ্ট পেয়েছি তাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার সব ইচ্ছা মাটি হয়ে গেছে। নৈসর্গিক এ সৌন্দর্যের মায়ায় পরবর্তী সময়ে আবার আসার ইচ্ছে থাকলেও কষ্টের জন্য আসা হবে না।

নিঝুমদ্বীপের বাসিন্দা মো. মিলাদ উদ্দিন মাঝি বলেন, আশ্বাসে আশ্বাসে দিন যাচ্ছে কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমরা শুনেছি এই ব্রিজটা হবে, তবে কবে হবে জানি না। যদি এই ব্রিজ ও সংযোগ সড়কটা দ্রুত হয় তাহলে পর্যটকদের জন্য যেমন ভালো হতো তেমন আমাদের জন্য ভালো হতো।
আরেক বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পর্যটকের সংখ্যা অনেক কম। এতে সর্বস্তরের ব্যবসায়ী খারাপ সময় পার করছেন। সড়কটি দ্রুত সংস্কার না হলে পর্যটকরা নিঝুম দ্বীপ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।

নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. কেফায়েত হোসেন বলেন, পর্যটক একটু কম। রাস্তাঘাট ভালো না তাই পর্যটক এসে কষ্ট পাচ্ছে। সেটি যদি ভালো হয় তাহলে অনেক পর্যটক আসবে। নিঝুম দ্বীপে দেখার অনেক কিছু রয়েছে। যেমন চৌধুরী খাল, চর কবিরা, দমার চর, পালকির চর। এছাড়াও সমুদ্র সৈকত, মায়াবী হরিণ ও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল তো আছেই।

দ্বীপটিতে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য সরকারিভাবে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া আক্তার লাকী। তিনি বলেন, বর্তমানে পর্যটকদের সংখ্যা এতো বেশি সে তুলনায় আমাদের আবাসন পর্যাপ্ত নয়। সেই সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে। নিঝুমদ্বীপের প্রধান যে সড়কটি তা প্রতি বছর পরিবেশগত কারণেই বিপর্যস্ত হয়ে যায়। আমরা যদি বরাদ্দ পাই তাহলে সড়কটি সুন্দর করতে পারব। আমাদের ডাকবাংলো আছে, কিছু রিসোর্ট আছে। তবে যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসে তাহলে আবাসন ব্যবস্থার আরও উন্নতি হবে। পর্যটন কর্পোরেশন একটি আবাসন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেটি চলমান রয়েছে।

আরও পড়ুন

  • হাতিয়া এর আরও খবর