বাজার সন্ত্রাস! শব্দটা কিছুটা বিপ্রতীপ মনে হচ্ছে। রাজনৈতিক ও জঙ্গী সন্ত্রাসের কথা হরহামশাই আমরা শুনে থাকি। মিডিয়ায় নিত্য প্রচারিত হচ্ছে এ সন্ত্রাস প্রসঙ্গ। কিন্তু লম্পট পুঁজির ফেরওয়ালারা ‘বাজার সন্ত্রাস’ বা ‘মূল্য সন্ত্রাসী’ চক্রের কথা ভুলেও বলেনা। ‘বিশ্ব নারী দিবস’ পালিত হয়, তথাকথিত রং ফর্সাকারী ক্রিমের সৌজন্যে। বিশ্বজুড়ে বাজারি মোড়ল ইউনিলিভারের পণ্যের বিরুদ্ধে কথা বলবে এমন বুকের পাটা বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়ারই নেই। এটাই হলো ‘বাজার সন্ত্রাস’। এদেশের লক্ষ লক্ষ নারী সামান্য পুষ্টিকর খাবার না পেলেও মাত্র ৫০ গ্রাম ওজনের রং ফর্সাকারী ক্রিম উচ্চ দামে কিনে ৮ সপ্তাহ নয়, বছরের পর বছর ব্যবহার করেও ফর্সা হচ্ছে না, কখনোই ফর্সা হবে না। কারণ ক্রিম মেখে মানুষের ত্বকের রং পাল্টানো অসম্ভব। এমন হলে তো আফ্রিকা ও খোদ আমেরিকার কালোরাই এতোদিনে ফর্সা হয়ে যেতো। কোটি কোটি টাকা বিজ্ঞাপন দিয়ে গরীব দেশের মানুষের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এমন অনেক বহুজাতিক গোষ্ঠী। এটিই হলো ‘বাজার সন্ত্রাস’।
বেশির ভাগ ভোক্তার কাঁধে জবরদস্তির মাধ্যমে ব্যয় চাপিয়ে দেয়ার হিসেবটা আমাদের তথাকথিত অর্থনীতিবিদরা করতে নারাজ। এটাকে তাঁরা প্রকৃত ব্যয় বলতে চান না। আমাদের এলিনিয়েটেড বুদ্ধিজীবী তাত্ত্বিক অর্থনীতিবিদগণের চিন্তা ও মতাদর্শই হলো এলিট ও কর্পোরেট পুঁজির ব্যয়ের হিসেব করা। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানতে দেখুন- ঘড়ধস ঈযড়সংশু : ওসঢ়বৎরধষ অসনরঃরড়হং : ২০০৫। বাংলাদেশে বাজার সন্ত্রাস বহুমাত্রিক শক্তিতে সংগঠিত। একচেটিয়া বাজার আর সম্মিলিত জোটের সদস্যরা সন্ত্রাসী কায়দায় চাল, ডাল, পিয়াজ, রসূন, আদা, তেল, গুঁড়ো দুধ, যানবাহন ভাড়া, পানি-বিদ্যুৎ, গ্যাস, শশ্যবীজ সবই এরা নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় এভাবে বাজার সন্ত্রাস চলছে। রাষ্ট্রের আইন-কানুন, বিধি-বিধান এমনভাবে তৈরি যা বাজার সন্ত্রাসীদেরই স্বার্থ রক্ষা করছে। গণমাধ্যম ও টেলিকম এমনভাবে সজানো যা বাজার সন্ত্রাসকেই প্রণোদনা দেয়। রাষ্ট্রের আর্থিক খাতে প্রকল্প ঋণ, এলটিআর, ক্যাশ ক্রেডিট, ঋণ-এর অবলোপন, পুন:তফসিলীকরণ, খেলাপী ঋণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়মকে উৎসাহ, আমদানি বাণিজ্যে ওভার ইনভয়েসিং হচ্ছে। এসব অনৈতিক সুবিধা ধান্ধাবাজ ব্যবসায়ী; রাজনৈতিক গোষ্ঠী, ক্ষমতার সুবিধাভোগী অসৎ আমলা ও ধনীদের পক্ষেই যাচ্ছে। ফলে বাজার সন্ত্রাসের নির্মম শিকার হচ্ছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিকার বঞ্চিত গরীব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণ। এ বাজার সন্ত্রাস অর্থনীতিতে নতুন উপযোগিতা বা সম্পদ সৃষ্টি করেনা বরং সম্পদ ধ্বংস করে।
বাংলাদেশে দীর্ঘসময় সামরিক শাসন ও স্বাধীনতা বিরোধিরা ক্ষমতায় থাকার সুবাধে ধর্মতান্ত্রিক মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী অপশক্তির বেশ ভালো একটা অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে। জঙ্গিবাদী সন্ত্রাস ও আত্মঘাতী বোমার আতঙ্ক সমাজে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করেছে। এই বোধ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার মর্মমূলে আঘাত করেছে। মৌলবাদী সন্ত্রাস ও মৌলবাদী অর্থনীতি বাংলাদেশের মুক্ত সমাজে সন্ত্রাস হানাহানি বৃদ্ধি, প্রাসঙ্গিক কারণে বৈষম্য ও দারিদ্র্য চক্রাকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মসূচীর বাইরে রাষ্ট্রকে সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ নির্মূলে কার্যকর উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।
‘বাজার সন্ত্রাস’ নির্মূলে রাষ্ট্রের করণীয় কী? বিশ্বায়ণের এ যুগে একটি রাষ্ট্র একাই বাজার সন্ত্রাস পুরোপরি নির্মূল করতে অক্ষম। কর্পোরেট সাম্রাজ্যবাদ বিশ্বজুড়ে যে আগ্রাসী থাবা বিস্তার করছে তাকে মোকাবেলা করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন নৈতিকতা ও দেশপ্রেম। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয় ছিল শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ গড়া। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনার তৃতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, “আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলেই ‘বাজার সন্ত্রাস’ অচিরেই পালিয়ে যাবে। আমাদের সম্মিলিত দুর্ভাগ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপ্রসূত সমাজ, রাষ্ট্র নির্মাণে আমরা চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। বর্তমানের যে বাংলাদেশ, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিপুল বৈষম্যের এমন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্নের সাথে অঙ্গীকৃত নয়।
পরিবেশসম্মত পাট ও পাটজাতদ্রব্য উৎপাদনকারী পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পাটকল ‘আদমজী জুট মিল’ সুবিধাবাদী গণবিরোধী দুর্নীতিবাজ আমলা ও লুন্ঠনকারী রাজনীতিবিদরা মিলেমিশে পানির দরে বিক্রি করে দিয়েছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির ছবকদাতা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ নিয়ে পৃথিবীর কোন দেশ উন্নত হয়েছে এমন নজির নেই। বিশ্বব্যাংক হচ্ছে বিশ্ব পুঁজি সন্ত্রাসী সংস্থা। আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আমাদের আত্মশক্তিতে বলীয়ান হতে হবে।
বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার ইশতেহার ঘোষণা করেছে বর্তমান সরকার। ‘পুঁজি ও বাজার সন্ত্রাস’ বিদ্যমান রেখে আলোচ্য অঙ্গীকার তথা ইশতেহার বাস্তবায়ন সত্যি অসম্ভব। বাজার সন্ত্রাস বন্ধ করতে না পাললে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করে যে শ্রমিক, যে মানুষ, সে আরো নি:স্ব দরিদ্র হয়ে পড়বে এবং এরাই হলো সমাজের অধিকাংশ মানুষ।
অধিকাংশ মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে যারা অবরুদ্ধ করে রেখেছে সেই দৃর্বৃত্ত বাজার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রকেই একাজে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই রাষ্ট্র হবে সত্যিকার গণতন্ত্রের, জনগণের।
লেখক : কবি, প্রবন্ধিক।