উপজেলা প্রতিনিধি, সোনাইমুড়ী ; ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরির চক্র আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে জেলাতে। জন্মনিবন্ধন তৈরি করতে চক্রটি হাতিয়ে নিতেছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। ভুয়া তথ্যে জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি করে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বা টিকা দেয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বোর্ড পরীক্ষা, চাকরিতে নিয়োগ, পাসপোর্ট নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয় পত্র নিবন্ধনসহ ১৯ টি ক্ষেত্রে জন্ম সনদের প্রয়োজন হয়। আবার মৃত্যু নিবন্ধনেও প্রয়োজন হয় জন্ম সনদের। না হলে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা যায়না। সে হিসেবে জন্ম সনদ একজন নাগরিকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নথি। অথচ বাংলাদেশের জন্ম নিবন্ধনের তথ্য যেসব সার্ভারে থাকে সেটি হ্যাক করে নানা মাত্রায় জাল-জালিয়াতির জানা যায়, সোনাইমুড়ী উপজেলার নতুন বাজার এলাকার আব্দুল হাকিমের ছেলে আবুল কালাম স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে সপরিবারে ভারতে পাড়ি জমান। ভারতে তার নাগরিকত্ব রয়েছে।
সেখানের রেল বিভাগে তিনি কর্মরত রয়েছেন। বাংলাদেশে থাকা তার পৈত্রিক জমি হাতিয়ে নিতে প্রতারক চক্র আবুল কালামের নামে ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরী করে। অনুসন্ধানে জানা যায়, আবুল কালামের জন্মস্থান পৈতৃক বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার চাষিরহাট ইউনিয়নের পোরকরা গ্রামে। তবে নদনা ইউনিয়ন পরিষদের সচিবকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ৩ মে ১৯৬২ ইং বয়স দিয়ে নিবন্ধন করেছেন। হাফিজুর রহমান জন্ম তারিখ ১১ ডিসেম্বর ২০০২। বাবা নজির আহমেদ। স্থায়ী ঠিকানা জেলার সোনাইমুড়ী উপজেলার বজরা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে লিখা রয়েছে জন্মনিবন্ধনে। জন্মনিবন্ধনটি করতে দালালদের দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা। আর নিবন্ধনটি করা হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে। ওই জন্মনিবন্ধনে স্বাক্ষর রয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সহকারী রেজিস্ট্রার হোসনা রহমান ও রেজিস্ট্রার সুজায়েদুল্লার। সোনাইমুড়ী উপজেলা ছনগাঁও গ্রামের আলমগীর হোসেন তার জন্মনিবন্ধন রয়েছে বজরা ইউনিয়ন পরিষদের।
তার স্থায়ী ঠিকানা বজরা ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামে। কিন্তু সে জন্ম তারিখ বাড়িয়ে ৩০ নভেম্বর ১৯৯১ বয়স দিয়ে জন্মনিবন্ধন করেছেন নোয়াখালী পৌরসভা থেকে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তাকে দিতে হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। সোনাইমুড়ীর বজরা ইউনিয়নের পূর্ব চাঁদপুর গ্রামের কবির হোসেনের ছেলে মোখলেছুর রহমানের জন্মনিবন্ধন এই ইউনিয়নে রয়েছে। তিনি ২১ জুন ১৯৮৮ বয়স দিয়ে পার্শ্ববর্তী নদনা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আরেকটি জন্মনিবন্ধন করেছেন। এই নিবন্ধন করতে দালাল চক্রকে দিতে হয়েছে ৮ হাজার টাকা। সোনাইমুড়ীর ছনগাঁও গ্রামের আক্কাছ মিয়ার ছেলের শফিকুল ইসলাম দালাল চক্রকে টাকা দিয়ে একইভাবে ১ জানুয়ারি ১৯৫৯, বয়স বাড়িয়ে নদনা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন করেছেন। আর নিবন্ধন করতে দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে জনসাধারণ, বাড়ছে ঘুষ লেনদেন। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী বাজার, বজরা ইসলামগঞ্জ বাজার, কাশিপুর বাজার, নদনা বাজার, বাজারের বিভিন্ন কম্পিউটার দোকানদাররা এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও জালিয়াতি চক্রের সদস্যদের মোটা অঙ্কের টাকা দিলেই পাওয়া যাচ্ছে জন্মনিবন্ধন। ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে টাকার বিনিময়ে এসব জন্মনিবন্ধন চলে যাচ্ছে রোহিঙ্গাসহ অপরাধীদের হাতে।
তৈরি হচ্ছে পাসপোর্টও। বাংলাদেশি পরিচয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে রোহিঙ্গারা। আর এ সুযোগে জন্মনিবন্ধন জালিয়াত চক্রটি হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলার বাজারের কম্পিউটার দোকানদাররা এখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। কম্পিউটার দোকানে টাকা দিলেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, জেলা পৌরসভা, উপজেলার বিভিন্ন পৌরসভা, ইউনিয়নের জন্মনিবন্ধন বয়স বাড়িয়ে ও কমিয়ে পাওয়া যাচ্ছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, সেনবাগ, চাটখিল ও সোনাইমুড়ীতে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরিতে অবৈধ চক্রের দৌরাত্ম্য। এ কাজে উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও কম্পিউটার দোকানের মালিকরা জড়িত। এ চক্রের সদস্যরা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, যেখানেই বাড়ি হোক- যেকোনো একটি এলাকার নাম দিয়েই বানিয়ে দেবে জন্ম সনদ। প্রতি সনদের জন্য তারা নেয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা।
যেখানে সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ১০০ টাকা। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালে নোয়াখালী হাতিয়ায় জাল জন্মনিবন্ধন তৈরির সঙ্গে জড়িত হাবিবুর রহমান (২১) নামে একজনকে আটক করে। এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। আটক হাবিবুর রহমান বুড়িরচর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মোহাম্মদ আলীর ছেলে। তিনি পেশায় একজন কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট দোকানের মালিক। হাবিবের বুড়িরচর ইউনিয়ন পরিষদের পাশে একটি কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট দোকান রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেগমগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদের সচিব জানান, বেগমগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলার বাসিন্দারা সোনাইমুড়ীর নদনা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বয়স বাড়িয়ে জন্মনিবন্ধন করছে। টাকা দিলেই সেখানে সবই হয়। বয়স বাড়াতে নিবন্ধনপ্রতি বছরে নেওয়া হয় ৪ হাজার টাকা ।সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার ফোনে জানান, বিষয়টি তার জান ছিল না। খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।