নোখালীর কথা ডেস্ক: দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে শ্রম আইন সংশোধন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার ১৮০টিরও বেশি প্রস্তাবিত সংশোধনী বিবেচনা করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে এবং সব শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই সংশোধনীর মূল লক্ষ্য।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে সলিডারিটি সেন্টার আয়োজিত শ্রম আইন সংস্কার প্রক্রিয়া বিষয়ক অংশীজনদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বক্তারা শ্রম আইনের প্রস্তাবিত প্রধান সংশোধনীগুলোর প্রভাবসহ শ্রমিক প্রতিনিধিত্ব, যৌথ দর-কষাকষি ও কর্মক্ষেত্রের গণতন্ত্রের ওপর কীভাবে পড়বে—তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বক্তারা জানান, সরকার এখন পর্যন্ত প্রায় ১৮০টিরও বেশি প্রস্তাবিত সংশোধনী বিবেচনা করেছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনগুলো প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব ও কর্মক্ষেত্রের গণতন্ত্র কতটা নিশ্চিত করতে পারবে। তারা বলেন, আইনটি যেন কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত হয়, সে বিষয়ে সকল অংশীজনের পরামর্শ গ্রহণ অপরিহার্য।
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন- সলিডারিটি সেন্টারের প্রোগ্রাম অফিসার খন্দকার সাফিন হাবিব শান। এতে বলা হয়, অন্তত ২০ জন শ্রমিক নিয়োজিত এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকেরা একটি ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করতে পারবে, এমন প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে যে ২০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে- তা বাতিল করে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে ইউনিয়ন গঠন প্রক্রিয়া সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। তবে এতে শ্রমিক সংখ্যার স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য রেকর্ড রাখার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে অযৌক্তিকভাবে ইউনিয়ন নিবন্ধন বাতিল করা না হয়।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয় যে, কোনো প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ পাঁচটি ইউনিয়ন সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবটি শ্রমিকদের অংশগ্রহণ সীমিত করতে পারে এবং এতে নিয়োগকর্তা-প্রভাবিত বা তথাকথিত “হলুদ ইউনিয়ন” গঠনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এতে বলা হয়, সিবিএ ও নন-সিবিএ ইউনিয়ন—উভয়ের কার্যক্রমের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নন-সিবিএ ইউনিয়নগুলোর অভিযোগ নিষ্পত্তি, শ্রম অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সদস্যদের সহায়তায় গঠনমূলক ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধে ৫০ শতাংশের বেশি শ্রমিকের সমর্থন পাওয়ার শর্তে ইউনিয়নকে সিবিএ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাবটিকে “একটি পশ্চাদগামী পদক্ষেপ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা শ্রমিকদের দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে এবং আলোচনার প্রক্রিয়া স্থবির করে দিতে পারে।
অন্য প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সময়মতো ও স্বচ্ছ ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচন আয়োজন, পুনর্গঠিত শ্রম আদালতের মাধ্যমে শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো এবং চা শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা; কারণ তারা এখনও ছুটি ও সুবিধা সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, “সুপারিশ প্রণয়নে শ্রম খাতের সকলের মতামত নেয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে সহজ ছিলো না। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই সুপারিশ ফেলে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন গঠনে কতজন শ্রমিক দরকার তা নিয়ে এখনো নাকি সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সুপারিশে এ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলা আছে।”
সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একেএম নাসিম বলেন, “মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন যে শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে। এই প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় না হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু বছরের আলোচনা ও পরামর্শের পর আমরা অবশেষে বাংলাদেশ শ্রম আইনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কারের আশা করতে পারি। এত দীর্ঘ ও নিবেদিত প্রচেষ্টার পর আমাদের যেন হতাশ হতে না হয়।”
কর্মজীবি নারী এর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা বলেন, “অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ৯২ শতাংশই নারী শ্রমিক। তাদের বাইরে রেখে কিভাবে একটি আইন পূর্ণাঙ্গ হয়? নারী শ্রমিকদের অধিকারের প্রতিফলন এই আইনে হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
আলোচকদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রেভল্যুশনারি গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন এর সভাপতি সালাহউদ্দিন স্বপন, কারখানা ও স্থাপনা পরিদর্শন অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ এর অধ্যাপক জাকির হোসেন ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর ডিরেক্টর (লিগ্যাল) মো. বরকত আলী।