ছোটগল্প
ছাঁকনি
ক্ষুদীরাম দাস
মফস্বলের এক ছোট শহর-চন্দনপুর। শহরটা ছোট হলেও সেখানে মানুষের বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা আর গর্বের গল্পগুলো ছিল বড় বড়। ঠিক এই শহরেই বাস করত রণজিৎ। বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। পেশায় সে একজন ব্যবসায়ী-চিনি আর মুড়ির ব্যবসা করে বেশ নাম করেছে। তার দোকান “রণজিৎ ভাণ্ডার” ছিল শহরের প্রধান বাজারের মোড়ে, এমন জায়গায় যে সকালের বাজারে পা রাখলেই প্রথমে চোখে পড়ত সেই বড় সাইনবোর্ড।
রণজিতের জীবন তখন দুধের মতো মিষ্টি। টাকা, নাম, সম্মান-সবকিছুই ছিল তার হাতে। বাজারে গেলে সবাই “রণজিতদা, কেমন আছেন?” বলে হাত বাড়িয়ে সালাম দিত। পাড়ায় কোনো অনুষ্ঠান হলে প্রথম নিমন্ত্রণ যেত তার বাড়িতে। এমনকি দূর সম্পর্কের আত্মীয়রাও হঠাৎ করে দেখা করতে চলে আসত-কখনও বলে, “তোমার দোকানের মিষ্টি না খেলে মনই ভরে না”, কখনও আবার বলে, “তোমার সঙ্গে একটু পরামর্শ করতে এসেছি।”
রণজিৎ হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলত, উদারভাবে সাহায্য করত। সে ভাবত-“দেখো, সবাই আমাকে কত ভালোবাসে!”
তার স্ত্রী মীনা মাঝে মাঝে হেসে বলত,
-“সবাই ভালোবাসে, ঠিকই, কিন্তু সবাই কি তোমার আপন?”
রণজিৎ উত্তর দিত-
-“এই দুনিয়ায় আপন-পর বলে কিছু নেই, যার ভালো, সে-ই আপন।”
মীনা চুপ করে থাকত, শুধু চোখের কোণে হালকা হাসি ফুটত, যেন বলছে-“সময়ই শেখাবে।”
কিন্তু সুখের দিন চিরকাল থাকে না। একদিন হঠাৎ করে বাজারে চিনি ব্যবসায় ধস নামল। রণজিতের বড় বড় অর্ডার বাতিল হয়ে গেল। পাশাপাশি তার দোকানে চুরি হলো-রাতের অন্ধকারে কয়েকজন দুষ্কৃতী দোকানের মালপত্র উধাও করে দিল। বীমার টাকা আসতে দেরি হলো, আর সে-সময়েই ব্যাংকের ঋণের কিস্তি জমা না দিতে পারায় ব্যাংক দোকানের মালিকানা নিয়ে নিল।
এক মাসের মধ্যেই রণজিত যেন ভেঙে পড়ল।
যে দোকানে একসময় ভিড় লেগে থাকত, আজ সেখানে তালা ঝুলছে।
যে বন্ধুরা প্রতিদিন দেখা করতে আসত, তারা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
রণজিত ফোন করত এক এক জনকে-
“ভাই, একটু কষ্টে আছি, একটু সাহায্য দরকার...”
কেউ বলত, “আরে, এখন তো হাতে টান, পরে দেখা হবে।”
কেউ ফোনই ধরত না।
যাদের একসময় সে নিজের আপন ভাবত, তারা যেন হঠাৎ দূরদেশে চলে গেছে।
দিন গড়াল। সংসার চালাতে কষ্ট বাড়তে লাগল। মীনা নিজের গয়না বিক্রি করে বাড়ির খরচ চালাল।
ছেলে রোহন স্কুলে যেতে কাঁদত-বন্ধুরা নাকি বলে, “তোমার বাবা দেউলিয়া!”
রণজিত চুপ করে শুনত, কোনো উত্তর দিত না।
একদিন সন্ধ্যায় বাজারে গিয়ে দেখল, তার পুরনো বন্ধুরা এখন অন্য দোকানে আড্ডা দিচ্ছে।
কেউ তাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিল, কেউ শুধু মাথা নেড়ে দূর থেকে অভিবাদন জানাল।
বাজারের এক প্রান্তে বসে থাকা পুরনো ভিখারি হরিদাস বলল,
-“বাবু, আগে তো আপনিই আমায় এক কাপ চা খাওয়াতেন, আজ মুখটা এমন কেমন লাগছে?”
রণজিত হেসে বলল,
-“সবকিছু পাল্টে গেছে হরিদাস কাকা।”
ভিখারিটা বলল,
-“সব পাল্টে যায় না বাবু, মানুষের মুখ পাল্টায়, মন না।”
রণজিতের চোখে জল চলে এল। সত্যিই তো-যে মুখগুলো একসময় হাসিতে ভরা ছিল, আজ তারা ঠান্ডা, অপরিচিত।
সেই কঠিন সময়ে, দু’জন মানুষই কেবল রণজিতের পাশে রইল।
একজন তার স্ত্রী মীনা-যে কোনো অভিযোগ না করে প্রতিদিন তাকে সাহস দিত।
আরেকজন, দোকানের পুরনো কর্মচারী সুধীর।
সুধীর ছিল গরিব, কিন্তু একনিষ্ঠ। অন্য দোকানে কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকলেও সে বলেছিল-
-“বাবু, আমি যতদিন বাঁচব, আপনাকে ছেড়ে যাব না। দোকান নেই, ঠিক আছে, কিন্তু আপনি আছেন তো!”
রণজিত অবাক হয়েছিল। সে ভাবত, চাকরিটা না থাকলে সুধীরও চলে যাবে। কিন্তু না-এই মানুষটাই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াল।
সুধীরই তার সঙ্গে গিয়ে ব্যাংকের কাগজপত্র দেখল, ক্ষতির হিসাব করল, এমনকি একদিন নিজের বেতনের টাকা দিয়ে রোহনের স্কুল ফি জমা দিল।
এক রাতে মীনা বলল,
-“দেখলে তো? সুখে কতজন ছিল, কিন্তু বিপদেই বোঝা যায় কে নিজের।”
রণজিত চুপ করে জানালার বাইরে তাকাল। চাঁদ উঠেছে। হঠাৎ মনে হলো, জীবনের আসল আলো তো এমনই-অন্ধকারে দেখা যায়।
কিছুদিন পরে রণজিত একটা ছোট দোকান ভাড়া নিল-পান-বিস্কুটের দোকান।
আগের মতো বড় দোকান নয়, ছোট্ট একটা চায়ের টং, কিন্তু তার চোখে তাতে নতুন আশার আলো জ্বলল।
সুধীর বলল,
-“শুরু ছোট হোক, কিন্তু মনটা বড় রাখলে আবার উঠবেন, বাবু।”
রণজিত মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
দিন যেতে লাগল। ধীরে ধীরে তার দোকানে কিছু পুরনো ক্রেতা ফিরতে লাগল। কেউ বলত, “রণজিতদা, আগের মতো মিষ্টি চা চাই।” কেউ আবার বলত, “আপনি ফিরে এসেছেন দেখে ভালো লাগছে।”
কিন্তু এবার রণজিতের হাসিতে আগের মতো উচ্ছ্বাস ছিল নাÑছিল সংযম, ছিল অভিজ্ঞতার ছাপ।
একদিন পুরনো বন্ধু নীলু দোকানে এসে বলল,
-“দোস্ত, তখন খুব ব্যস্ত ছিলাম, তাই তোর খবর নিতে পারিনি, মন খারাপ করিস না।”
রণজিত শুধু মৃদু হেসে চা দিল। মনে মনে ভাবল,
“ছাঁকনিতে যেমন ময়লা বাদ যায়, তেমনি সময়ও আমার জীবনের ভেজাল মানুষদের ছেঁকে দিয়েছে।”
এক সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে রণজিত নদীর ধারে হাঁটছিল। শীতের হাওয়া বইছে, আকাশে হালকা চাঁদ।
সে ভাবছিল, সুখের দিনে কত লোক তাকে ঘিরে ছিল-যেন মিষ্টি দুধের গন্ধে ভিড় করা মাছি।
কিন্তু দুঃখের দিনে তারা উধাও হয়ে গেল।
তবু সে তাদের জন্য কষ্ট পায়নি, কারণ আজ সে জানে-
যে সম্পর্ক দুঃখের পরীক্ষায় টিকে না, তা কখনোই সত্যিকারের সম্পর্ক নয়।
সে হাসল-একটা দীর্ঘ, প্রশান্ত হাসি।
তার পাশে এসে দাঁড়াল মীনা, হাতে একটা কাপ গরম চা।
মীনা বলল,
-“তুমি আজ খুব শান্ত দেখাচ্ছো।”
রণজিত চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বলল,
-“বুঝেছি, সুখের দিনে দুধের মাছির অভাব হয় না। কিন্তু বিপদই মানুষকে শেখায়, কে সত্যিকারের আপনজন।”
মীনা হেসে বলল,
-“দেখলে তো, আমি তো আগেই বলেছিলাম, সময়ই শেখাবে।”
পরবর্তী বছরেই রণজিতের চায়ের দোকান বড় হলো। শহরের বাসস্ট্যান্ডের পাশে সে একটা ছোট রেস্টুরেন্ট খুলল-নাম দিল “ছাঁকনি ক্যান্টিন”।
দোকানের নাম শুনে অনেকে হাসত,
-“এ আবার কেমন নাম রে?”
রণজিত শুধু বলত,
-“ছাঁকনিই তো আমার জীবনের সত্যি শিক্ষক।”
তার দোকানের দেওয়ালে ঝুলছিল একটা ফ্রেমে লেখা-
“সুখের দিনে দুধের মাছির অভাব হয় না।
কিন্তু বিপদ এলে জানা যায়, কে আপন, কে পর।
সময়ই সব ছাঁকনির মতো ছেঁকে দেয় মিথ্যা মুখগুলো।”
মানুষ এসে সেই লেখা পড়ে মুগ্ধ হত। কেউ বলত, “দোস্ত, দারুণ কথা!” কেউ চুপচাপ ছবি তুলত।
রণজিত হাসত-এখন সে জানে, জীবনের আসল স্বাদ মিষ্টির মতো নয়, তেতো আর মিষ্টির মিশ্রণে লুকানো।
বছর ঘুরে গেল। রণজিত আজ আবার স্বচ্ছল, কিন্তু আগের মতো অন্ধ নয়।
সে এখন বুঝেছে,
সুখের দিনে পাশে থাকা মানুষদের নিয়ে অহংকার করার দরকার নেই,
বরং বিপদের দিনে যারা হাত বাড়ায়, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
তার জীবন যেন এক ছাঁকনির মতো-
যেখানে সুখ-দুঃখের ঝাঁঝ পেরিয়ে এখন কেবল সত্যিকারের সম্পর্কই টিকে আছে।
সেই সম্পর্কের নাম-ভালোবাসা, বিশ্বাস, ও সত্যিকারের আপনজন।
রাতের দোকান বন্ধ করে যখন সে বাড়ি ফেরে, মীনা চুপচাপ দরজা খুলে দেয়।
রোহন এসে বলে,
-“বাবা, আজ তো দোকানে অনেক ভিড় ছিল!”
রণজিত হেসে বলে,
-“হ্যাঁ, কিন্তু এবার সেই ভিড়ের মানে আমি জানি।”
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
কারণ সে এখন জানে-
সুখের দিনে দুধের মাছির অভাব হয় না, কিন্তু দুঃখই শেখায় কে সত্যিকারের আপন।