বাংলাদেশের দক্ষিণে, বঙ্গোপসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে আছে এক সম্ভাবনাময় দ্বীপ হাতিয়া উপজেলা।
নদী- নালা, খাল-বিল আর সাগরের মিশ্রণে গড়া এই দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি।
সবুজবীথির অপরূপা দ্বীপাঞ্চল হাতিয়া উপজেলা কেবল একটি দ্বীপ নয়, সম্ভাবনাময় এটি হতে পারে বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর । মূল আয়তনের চেয়েও বহুগুণ ছাড়িয়ে যাবে এ উপজেলাটি। রূপসৌন্দর্য্যের নিদারুণ সজ্জা, মুগ্ধতা, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের অপরূপা চিত্রগুলো আকর্ষণীয় ভাবে নজর কেড়ে নেয় সকলের।
হাতিয়া উপজেলা নোয়াখালী জেলার একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা। হাতিয়া উপজেলা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড হতে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা উর্বর এবং সৌন্দর্যের প্রতীক বহন করা একটি স্বর্গভূমি । ঢেউয়ের নির্মল শব্দ আর নরম বাতাসের হাতছানিতে সাগরের বুকে টিকে থাকার লড়াই কেবল বারবার জানান দেয় এটি হতে পারে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম উপজেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
৭ লক্ষ জনসংখ্যা এবং ২১শত বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলাটি হয়ে ওঠতে পারে বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর। প্রতিনিয়ত সমুদ্র হতে জেগে ওঠা চরসমূহ বারবার যেন সে ইঙ্গিত দিচ্ছে । একঝাঁক নতুন চর এবং বৃহত্তম অর্থনীতির চাকা সচল করার সুদীপ্ত প্রতিজ্ঞা রেখে এ দ্বীপের বেড়ে ওঠা। এর উত্তরে রয়েছে সুবর্ণচর উপজেলা, পূর্বে মেঘনা নদী, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে মনপুরা উপজেলা। কেওড়া বন, উর্বর চর এবং নদীর পলিমাটি মিশ্রিত আবাদি ফসলি জমিগুলো হাতিয়ার আত্মার খোরাক। জীববৈচিত্র্যের সরল-সৌন্দর্য, প্রকৃতির সমন্বয়ে নিদারুণ হাস্যরসের অসমাপ্ত দৃষ্টান্ত এবং সাগর-নদীর কোলাহল, সবকিছুর একাগ্রতায় হাতিয়া উপজেলা যেন এক নতুন ইতিহাস। ভাসানচর, কালাম চর, ঢালচর, দমারচর, নিঝুমদ্বীপ, এবং এর আশেপাশে রয়ে থাকা অসংখ্য চর। একেকটা নতুন চর যেন একেকটা নতুন বার্তার জানান দেয়।
নোয়াখালী জেলার সবচেয়ে আলোচিত, পরিচিত এবং দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নিঝুমদ্বীপ। সাগরের পলি জমে জমে নতুন করে জন্ম নেয়া এ দ্বীপটির আয়তন ১৬৩.৪৫ বর্গকিলোমিটার। ধারণা করা হয় ১৯৫০ সালের দিকে এ দ্বীপটির জন্ম হয়। ১৯৭০-এর দশকে এই দ্বীপে চিতা হরিণ ও বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির বসতি গড়ে ওঠে। যা দ্বীপের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং খ্যাতি এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন বিভাগ ১৯৭৪ সালে এখানে বনায়ন কার্যক্রম শুরু করার উদ্দেশ্যে গেওয়া, কেওড়াসহ নানান জাতের বনজ গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে এ দ্বীপটি হয় ওঠে সৌন্দর্যের রানি। এর ফলে নিঝুম দ্বীপ অনন্য জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। দীর্ঘ প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল, বাংলাদেশ সরকার নিঝুমদ্বীপকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। এটি বাংলাদেশের ষষ্ঠ জাতীয় উদ্যান ।
মানদণ্ডে এবং বৈশিষ্ট্যগত উন্নয়নর ফলে ২০১৩ সালে জাহাজমারা ইউনিয়ন হতে এ দ্বীপটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এর পার্শ্ববর্তী আরো বেশ কয়েকটি চর নতুন করে আশা জাগাচ্ছে। যা সম্ভবনাময় বৃহত্তম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে মর্যাদা লাভ করতে পারে।
শুধু এ নিঝুমদ্বীপ নয়, হাতিয়াকে ঘিরে জেগে ওঠা নতুন চরগুলো প্রতিনিয়ত আশার আলো দেখাচ্ছে দ্বীপাঞ্চলের মানুষদের মনে। এইসব চরের সমন্বয়ে পর্যটন, মৎস্যসম্পদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সমুদ্র গবেষণায় হাতিয়া হতে পারে দেশের সমুদ্র অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যদি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হয়, মৎস্য আহরণ এবং রপ্তানির যথার্থ সুযোগ ও শিল্পখাত তৈরি করে দিতে পারলে এই দ্বীপ হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অংশীদার। শিল্পখাত নির্মাণ, মৎস্য চাষের প্রশিক্ষণ, খামার করার উদ্দোক্তা সৃষ্টি এবং বেকারত্বের হার কমিয়ে আনা গেলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো সচ্ছল হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর একান্ত সাহায্য জরুরী। যেমন বেকার তরুণদেরকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার মাধ্যমে জাতীয় অর্থে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
তবে বর্তমান সময়ে নোয়াখালীবাসীর প্রাণের দাবী হলো হাতিয়াকে জেলা রূপান্তর করে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলাকে বিভাগ গঠন করা।
সময়ের দাবী এখন হাতিয়াকে জেলায় বাস্তব কটে সমুদ্রসীমাকে কাজে লাগানো। হাতিয়াকে জেলা গঠন ও নোয়াখালীকে বিভাগ করে সমুদ্রসীমাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো সচল করা সম্ভব।
জাতীয় খাতে হাতিয়াকে কাজে লাগানো জরুরী। হাতিয়াকে সমুদ্র বন্দর কিংবা উপ-সমুদ্র বন্দর করা গেলে অধিক চাপ কমে আসবে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরে।এবং আশেপাশের অঞ্চল হতে যাতায়াতে অধিক সুবিধাও হবে। তবে এই সম্ভাবনাময় ভূমির সামনে এখনো আছে নানা চ্যালেঞ্জ। নৌযান চলাচলের সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা, আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয় - এসবের মাঝেও টিকে আছে হাতিয়ার মানুষ।
তারা বিশ্বাস করে, যদি যথাযথ পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ আসে, তবে এই দ্বীপ একদিন সত্যিই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর।
লেখক : এম এ জিন্নাহ, হাতিয়া