সোনাইমুড়ী দেশের একটি ছোট উপজেলা। কিন্তু এই ছোট জায়গায় যা ঘটছে, তা বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির জন্য এক বড় বার্তা হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ বছরের রাজনৈতিক সহযাত্রার পর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন মুখোমুখি। একসময় যাদের বন্ধন ছিল সংগ্রামের, আজ তাদের সম্পর্কের জায়গায় এসেছে সন্দেহ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের রাজনীতি।
দেওটি ইউনিয়নে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা রনিকে হত্যার হুমকি, মহিলা জামায়াতের কোরআন তালিম প্রোগ্রামে হামলার অভিযোগ এই ঘটনাগুলোর প্রতিটি কেবল স্থানীয় নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির গভীরে জমে থাকা অবিশ্বাসের প্রতিফলন। যে দুটি দল একসঙ্গে গণতন্ত্রের দাবিতে লড়েছে, আজ তারা নিজেরাই গণতান্ত্রিক চর্চার বাইরে গিয়ে সহিংসতার আশ্রয় নিচ্ছে।
বিএনপি-জামায়াত জোট এক সময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক মিত্রতা ছিল। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসা থেকে শুরু করে বিগত দুই দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম দুই দলই ছিল এক পতাকার নিচে। কিন্তু সময়ের সাথে সেই পতাকা এখন দুই ভাগে ছেঁড়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটের ভাঙনের শুরু আসলে অনেক আগেই। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপে বিএনপি ধীরে ধীরে জামায়াতের ছায়া থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে জামায়াতও বুঝেছে, বিএনপির ওপর নির্ভর করে তাদের সাংগঠনিক পুনর্গঠন সম্ভব নয়। এখন উভয় দলই নিজেদের রাজনৈতিক স্পেস তৈরি করতে চাইছে, কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, সেই স্পেস একই ভোটারগোষ্ঠীর ভেতরেই। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
সোনাইমুড়ী এখন তারই প্রতীকী মঞ্চ। যেখানে রাজনীতি আর আদর্শের প্রতিযোগিতা নয়, বরং হয়ে উঠেছে দখল ও আধিপত্যের লড়াই।রাজনীতিতে মতবিরোধ স্বাভাবিক। কিন্তু যখন মতবিরোধ রক্তপাতের পথে যায়, তখন সেটি কেবল দলগুলোর ক্ষতি নয় গণতন্ত্রেরও পরাজয়। সোনাইমুড়ীর সংঘাত আজ সেই ভয়াবহ বাস্তবতাই তুলে ধরছে।
যেখানে একসময় একই মঞ্চে স্লোগান উঠত স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক সেই মানুষগুলো এখন একে অপরের বিরুদ্ধে মিছিল করছে, মামলা দিচ্ছে, সামাজিক মাধ্যমে কটূক্তি ছড়াচ্ছে। এ দৃশ্য শুধু সোনাইমুড়ীর নয় এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, এই সংঘাতের শিখা এখন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়ছে। মহিলা জামায়াতের কোরআন তিলাওয়াত প্রোগ্রামে হামলা, বা বিএনপি কর্মীদের হুমকি এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ক্ষয় করছে।
সোনাইমুড়ীর সাধারণ মানুষ বলছেন এখনই যদি বিএনপি ও জামায়াত শুভবুদ্ধির পরিচয় না দেয়, তাহলে এই সংঘাতের লাভবান হবে কেবল আওয়ামী লীগ। কারণ, বিরোধী শিবিরের এই বিভাজন ও সহিংসতা ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্ত করবে।
যে আওয়ামী লীগ একসময় এই দুই দলের জোটবদ্ধ আন্দোলনের মুখে বিপর্যস্ত ছিল, সেই আওয়ামী লীগই এখন দেখছে, তাদের প্রতিপক্ষ নিজেরাই নিজেদের দুর্বল করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাই বলছেন, বিরোধী শক্তি যদি নিজেদের মধ্যকার বিবাদে নিমজ্জিত হয়, তবে ক্ষমতা পরিবর্তনের স্বপ্ন শুধু অলীকই থেকে যাবে।
এই বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াতের উচিৎ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। তারা উভয়েই জানে, দমন-পীড়ন, গ্রেফতার, মামলা, নির্যাতন এসবের ইতিহাস তাদের এক করে রেখেছিল। সেই ইতিহাস যেন আজ ভুলে না যায়। কারণ, যদি তারা আবারও সংঘাতের পথে যায়, তাহলে রাজনীতির মাঠ, এমনকি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও চলে যাবে আওয়ামী লীগের দখলে।
সোনাইমুড়ী থানার ওসি মোরশেদ আলম জানিয়েছেন, উভয় পক্ষের লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। রাজনৈতিক সংঘাতের শেষ হতে পারে কেবল সংলাপে, সংযমে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ায়।
এই মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতের প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিপক্কতা ক্ষমতার হিসাব নয়, জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরে আসা। রাজনীতি যদি গণমানুষের সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে পরস্পর ধ্বংসের খেলায় পরিণত হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত হারবে জনগণ, হারবে গণতন্ত্র।
সোনাইমুড়ীর ঘটনাটি শুধু একটি সহিংস সংঘর্ষ নয়; এটি বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির নতুন অধ্যায় যেখানে পুরনো বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু একইসঙ্গে নতুন রাজনৈতিক চিন্তারও দরজা খুলছে।
যদি বিএনপি ও জামায়াত এই ভাঙনকে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে নেয়, যদি তারা বুঝতে পারে যে, জনগণ সংঘাত নয় সমাধান চায়, তাহলে হয়তো এই ভাঙন থেকেই জন্ম নিতে পারে নতুন এক গণতান্ত্রিক স্রোত।
কিন্তু যদি তারা অন্ধ প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক দোষারোপ ও সহিংসতার পথেই এগোয়, তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অনিবার্য যেখানে বিরোধী শক্তির দুর্বলতা আবারও আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্যকে পুনর্গঠিত করবে।
রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য, রক্তপাতের জন্য নয়। তাই এখনই সময় বিএনপি ও জামায়াতের শুভবুদ্ধির জাগরণের যেখানে রাজনীতি হবে সহমর্মিতার, সহিংসতার নয়।
লেখক : সাংবাদিক, স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথা