ঝড়ের রাতে বনের বুক কেঁপে উঠেছিলো। কালো মেঘে আকাশ ঢাকা, গাছের ডাল ভাঙছে টপাটপ। সেই ভয়ানক ঝড়ে একটি ক্ষুদ্র কাঠবিড়ালি নাম তার টুকটুকি, মায়ের কোলে থেকে ছিটকে পড়ল মাটিতে। ঘূর্ণিঝড়ের হাওয়ায় উড়ে গিয়ে সে পৌঁছে গেল অনেক দূরে, এক অপরিচিত জায়গায় শহরের প্রান্তে, এক নির্জন বাগানের পাশে।
ভোরে বৃষ্টি থেমেছে। রাস্তায় জমে থাকা পানির ধারে হাঁটছিলো এক ছোট্ট খোকা– নাম রিয়াদ। স্কুলে যাওয়ার আগে সে পাতা ভাসিয়ে খেলা করতো প্রতিদিন। হঠাৎ দেখল একটা ভিজে ছোট্ট প্রাণী কাঁপছে, কাঁপতে কাঁপতে চোখ মেলে তাকাচ্ছে তার দিকে।
রিয়াদ দৌড়ে গেল।
আহারে! এটা তো কাঠবিড়ালি! বেচারা!
সে নিজের রুমাল দিয়ে টুকটুকিকে মুছে নিলো, হাতে করে নিয়ে এল ঘরে। মা একটু ভয় পেলেও বললেন,
বাচ্চা প্রাণী, যত্ন নিতে পারবি তো?
রিয়াদ মুচকি হেসে বলল,
সে তো আমার বন্ধু হবে, মা!
শুরু হলো এক অনন্য বন্ধুত্ব।
রিয়াদ সকালে স্কুলে যেত, টুকটুকি তার বইয়ের ব্যাগের পাশে বসে থাকত। বিকেলে খেলা, রাতে খাওয়ার সময় ছোট্ট কাঠবিড়ালি তার কাঁধে চড়ে আসত। টুকটুকিকে থাকার ছোট্ট একটি ঘর বানিয়ে দিল– সে যেন উষ্ণতায় আরামে থাকতে পারে এবং তার খাবারের বিশেষ খেয়াল রাখা হলো।
দিন যেতে লাগল। টুকটুকি বড় হলো, কিন্তু তার চোখে কখনও বনের ভয় হারায়নি। মাঝে মাঝে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকত যেন কিছু খুঁজছে। রিয়াদ বুঝত, ওর বুকের ভেতর এখনো বনের গন্ধ আছে, স্বাধীনতার ডাক আছে।
একদিন বিকেলে টুকটুকি জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেল। রিয়াদ দৌড়ে গেল বাইরে কিন্তু টুকটুকি উড়ে গেল গাছের শাখায়, একটুখানি ঘুরে আবার ফিরে এলো। যেন বলছে,
আমি যাচ্ছি না, আমি তোমার বন্ধু হয়েই থাকব– শুধু খাঁচায় নয়, প্রকৃতির মাঝেও।
রিয়াদ হেসে বলল, ঠিক আছে বন্ধু, মুক্ত থেকো, কিন্তু ভুলে যেও না? আমি আছি।
তারপর থেকে প্রতিদিন বিকেলে রিয়াদ জানালার পাশে বসে। দূরে গাছের ডালে একটা ছোট্ট কাঠবিড়ালি লাফায়, ডাকে–
চিকচিক! চিকচিক!
রিয়াদ জানে, সেটাই তার টুকটুকি।