মোহাম্মদ হানিফ, নিজস্ব প্রতিনিধি:
সোনাইমুড়ী উপজেলায় মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে শুরু হয়েছে 'বিজয় মেলা'। বিজয়ের গৌরবকে ফুটিয়ে তুলতে মেলাটির আয়োজন করা হলেও সেখানে ঠাঁই পায়নি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব কেন্দ্রিক কোন স্টল। বিজয় মেলার নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য এমন অভিযোগ দর্শনার্থীদের।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্থানীয়দের বাদ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের নিয়ে মেলার আয়োজন হয়েছে। এমনকি বিজয় মেলা ২০২৫ উপলক্ষে স্টল বরাদ্দ সংক্রান্ত কোন ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি সোনাইমুড়ী উপজেলা প্রশাসন।
জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মহান বিজয় দিবস ২০২৫ উদযাপন উপলক্ষ্যে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩ দিনব্যাপী আড়ম্বরপূর্ণ বিজয়মেলা আয়োজন করতে বলা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সারা দেশের মত সোনাইমুড়ীতে বিজয় মেলায় আয়োজন করা হয়েছে। রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) বিকালে মেলার উদ্বোধন করেন সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসরিন আকতার।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় রয়েছে ছোট-বড় ২৫টি স্টল। এর মধ্যে ক্রোকারিজের ৪টি, কাপড়ের ৪টি, খেলনার ৬টি, জুতার ১টি, চশমা ও ক্যাপের ২টি, কসমেটিকসের ৫টি, খাবারের ১টি, প্লাস্টিক সামগ্রীর ১টি, বিভিন্ন ধরনের শো-পিস ও ব্যাগের ২টি দোকান রয়েছে। এছাড়া রাইড রয়েছে ৫ ধরনের। মিয়াকোর মত আন্তর্জাতিক ব্রান্ডও তাদের ক্রোকারিজ পণ্য নিয়ে পসরা সাজিয়েছে মেলায়। তবে চোখে পড়েনি চারু, কারু কিংবা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিল্প পণ্যের ষ্টল। নেই মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জুলাই বিপ্লবের ইতিহাসের নিদর্শন।
মেলার ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের অধিকাংশই দূর-দূরান্ত থেকে আগত। প্রত্যেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় আয়োজিত মেলায় ব্যবসা পরিচালনা করেন। স্টলের আয়তন হিসেবে ১০ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা থেকে আগত ঘড়ি ব্যবসায়ী জানান, স্টলের ভাড়া সপ্তাহ চুক্তিতে দিতে হয়। তার ষ্টলের আয়তন ৯ স্কয়ার ফুট। সর্বনিম্ন হলেও ১২ হাজার টাকা দিতে হবে।
মেলায় আচারের দোকান দেওয়ার অযুহাতে কথা হয় কমিটির এক সদস্য হিরুর সাথে। তিনি জানান, কোন ষ্টল খালি নেই। তবে বাইরে টেবিল নিয়ে বসার সুযোগ করে দিতে পারবেন। তিনফুট আয়তনের একটি টেবিল নিয়ে বসার জন্য দিন প্রতি এক হাজার টাকা দাবি করেন তিনি।
সোনাইমুড়ী চৌরাস্তা এলাকার যুবক রিয়াজ হোসেন এসেছিলেন মেলায়। আক্ষেপের সাথে বলেন, বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিজয় মেলার আয়োজন হলেও এটা দেখে বাণিজ্য মেলা মনে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বিজয় দিবস, জুলাই আন্দোলন বা বাঙালি জাতির আত্মত্যাগের ইতিহাস সম্পর্কিত কোন কিছুই মেলাতে দেখা যায়নি। এমনকি একটা স্টল রাখা হয়নি নেই যেখানে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ন্যূনতম কোন মেসেজ দর্শনার্থীরা পাবে।
চার বছরের শিশুকে নিয়ে সোনাইমুড়ী পৌর এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বিজয় মেলায় এসেছেন। তবে মেলায় বিজয় দিবস সংশ্লিষ্ট কিছু বাচ্চাকে দেখাতে না পেরে ফিরে যাচ্ছিলেন তিনি। কথা হলে জানান, বিজয় মেলায় বিজয় দিবস সম্পর্কিত কিছু রাখা হয়নি। মেলায় মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক কয়েকটি ষ্টল থাকলে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ছবি প্রদর্শিত হলে তরুন প্রজন্ম এই মেলা থেকে কিছু শিখতে পারতো।
মেলায় মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব কেন্দ্রিক কোন আয়োজন না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন জুলাই বিপ্লবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলার সিনিয়র সংগঠক খোরশেদ আলম। মেলা ঘুরে তরুন প্রজন্ম যেন মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে এমন ব্যবস্থা রাখতে উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মেলার দোকান বরাদ্দের বিষয়ে জানতে কথা হয় পরিচালনা কমিটির প্রধান একলাশপুর এলাকার মো: নিজামের সাথে। জানান, তিনি সারা দেশে মেলার আয়োজন করে থাকেন। সাত দিনের জন্য একটি সুন্দর মেলার আয়োজনের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। মেলার সকল ব্যবসায়ীদের তিনিই নিয়ে এসেছেন। আয়োজনের যাবতীয় খরচ দিচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ষ্টল প্রতি ১০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা ধার্য করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, প্রথম দিনের যাবতীয় খরচ হিসেব করে মেলার ষ্টলের ভাড়া নির্ধারণ করা হবে। মেলার জন্য সরকারি ভাবে টাকা বরাদ্দ থাকে। যদি খরচের টাকা মেলা থেকে ওঠে তাহলে আর সরকারি তহবিলে হাত দেওয়া লাগবে না।
এবিয়ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সরকারি ভাবে তিনদিনের মেলার আয়োজন করার কথা থাকলেও সোনাইমুড়ীতে সাত দিন মেলা হবে। সরকারি ভাবে স্টল বরাদ্দের জন্য কোন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। আর মেলায় মুক্তিযুদ্ধ কিংবা জুলাই আন্দোলনের স্টল দেওয়ার বিষয়ে সরকারি কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তাছাড়া উপজেলায় চারু, কারু কিংবা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিল্প পণ্যের সাথে যুক্তরা মেলায় আসতে আগ্রহী নয়।