সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া : দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত সবুজে মোড়া নিঝুম দ্বীপ—অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণী ও নির্জনতার সম্পূর্ণ সমন্বয়ে ধীরে ধীরে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার অগ্রগতি এবং প্রাকৃতিক আকর্ষণের কারণে দ্বীপটি এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন বাড়ছে এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। বিশেষ করে শীত মৌসুমে হরিণের পাল, সোনালি সূর্যাস্ত, নির্জন সমুদ্রসৈকত ও বিশাল চরাঞ্চল উপভোগ করতে দলে দলে বেড়াতে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। স্থানীয়দের মতে, গত কয়েক বছরে দ্বীপে পর্যটকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। এতে যেমন পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি বাড়ছে কর্মসংস্থানের সুযোগও।
নিঝুম দ্বীপের বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, কেয়ারা বন, ম্যানগ্রোভ জঙ্গল, নির্জন সমুদ্রসৈকত এবং শান্ত-নীরব প্রকৃতি পর্যটকদের মনে তৈরি করে অন্যরকম অনুভূতি। বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। পাশাপাশি নতুন রিসোর্ট, কটেজ, রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন সুবিধা যোগ হওয়ায় ভ্রমণ আরও সহজ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে নিঝুম দ্বীপকে আন্তর্জাতিক মানের ইকো-ট্যুরিজম স্পটে রূপান্তর করা সম্ভব। এতে জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।
নিঝুম দ্বীপ : বাংলাদেশের গোপন স্বর্গ
সবুজ অরণ্য, সাদা বালুকাবেলা, পাখির কলকাকলি ও নীল সমুদ্র—সব মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপকে অনেকেই বলেন ‘বাংলাদেশের গোপন স্বর্গ’। সমুদ্রস্নান, নৌকাবিহার, মাছধরা, পাখি দেখা—বিভিন্ন অভিজ্ঞতা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। স্থানীয় কটেজ, মৌসুমি খাবার আর জোয়ার-ভাটার খেলা দ্বীপের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
কমলার দিঘি : ইতিহাস ও প্রকৃতির সন্ধিক্ষণ
হাতিয়ার বুড়িরচর ইউনিয়নে অবস্থিত ‘কমলার দিঘি’ শুধুই একটি জলাধার নয়—এটি প্রেম, বেদনা ও ইতিহাসের এক নিদর্শন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, জমিদার তার কন্যা কমলার স্মরণে দিঘিটি খনন করেছিলেন। চারপাশে বিরাট বট, কড়ই, নারকেল ও সুপারি গাছ, আর দিঘির শান্ত জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি—সব মিলিয়ে এটি এক মনোরম দর্শনীয় স্থান। সংরক্ষণ, আলোকসজ্জা ও নৌকাবিহারের ব্যবস্থা করা গেলে এটি হাতিয়ার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
রহমত বাজার সি-বিচ : জোয়ারের গানে মুগ্ধতা
রহমত বাজার সি-বিচের ঢেউয়ের শব্দ, বিস্তীর্ণ বালুচর এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য প্রতিদিন টানে প্রকৃতিপ্রেমীদের। জেলেদের মাছধরা, নৌকা চলাচল ও জোয়ার-ভাটার খেলা পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ।
নিমতলী সি-বিচ : অপার নৈসর্গিকতার ঠিকানা
নিমতলী সি-বিচের নীরবতা, বিস্তৃত বালুচর ও শীতল বাতাস পর্যটকদের প্রশান্তি দেয়। যথাযথ প্রচারণা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারে।
এম আলী লালচর : প্রকৃতির নতুন উপহার
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে ওঠা ‘এম আলী লালচর’ বর্তমানে নতুন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত। সবুজ ঘাস, কেওড়া-গোলপাতার বন ও সাগরের ঢেউয়ের সমন্বয়ে লালচর এখন প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যপ্রেমীদের জন্য মনোমুগ্ধকর স্থান। এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও ইকো-ট্যুরিজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয় যুবক আশিকুর রহমান সোহাগ বলেন, “হাতিয়ার পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সেরা হলো কমলার দিঘি। তবে পরিবার নিয়ে আসতে গেলে সমস্যায় পড়তে হয়, কারণ বসার জায়গা নেই, টয়লেট নেই, খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকার চাইলে এটিকে কক্সবাজারের মতো মানসম্মত পর্যটন কেন্দ্রে রূপ দিতে পারে। এতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বাড়বে, সরকারও লাভবান হবে।”
পর্যটক তারেক জানান, “আমি কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিনসহ দেশের অনেক জায়গায় গেছি। তবে হাতিয়ার কমলার দিঘির মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কোথাও পাইনি। এখানে সাগর, বাগান আর দিঘি মিলেমিশে যে দৃশ্য তৈরি করেছে, তা সত্যিই অনন্য। সরকার যদি সঠিকভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন করে, তাহলে এটি জাতীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।
হাতিয়ার নারী উদ্যোক্তা ফারজানা আক্তার বলেন, যদি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে কমলার দিঘি গড়ে ওঠে, তাহলে আমরা স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্য বিক্রি করতে পারব। এতে নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।”
নিরাপদ যাতায়াত, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও আধুনিক পর্যটন সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ হয়ে উঠতে পারে দেশের পর্যটন শিল্পের নতুন রত্ন।