
রাজনীতিতে জনসভা মানে কেবল কিছু মানুষের জমায়েত নয়. এটি হলো একটি শৃঙ্খলিত জাতির মুক্তির চিৎকার। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার প্রবেশপথে এক কোটি দশ লক্ষ সিমের উপস্থিতি কিংবা ইন্টারনেটে লাখো মানুষের ব্যাকুল প্রতীক্ষা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি প্রমাণ করে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের মানুষ কতটা নিস্পৃহ আর রুদ্ধশ্বাস সময় পার করেছে। তারা কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাকে খুঁজছে না, তারা খুঁজছে এমন এক আশ্রয়, যেখানে প্রতিহিংসার আগুনে আর কোনো মা-কে সন্তান হারাতে হবে না, আর কোনো বাবাকে ডুকরে কাঁদতে হবে না। এই বিশাল জনস্রোত তারেক রহমানের জন্য যেমন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, তেমনি এটি তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।
ইতিহাসের পাতায় নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নন, তিনি সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয়ের রাজা। দীর্ঘ ২৭ বছর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানোর পর তিনি যখন মুক্ত হলেন, তার সামনে সুযোগ ছিল শ্বেতাঙ্গদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার। কিন্তু তিনি বেছে নিলেন ক্ষমা । তিনি জানতেন, প্রতিশোধ নিলে দেশটা ছাই হয়ে যাবে, আর ক্ষমা করলে দেশটা প্রাণ ফিরে পাবে।
আজ বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতির নামে ঘৃণা আর হানাহানিতে ক্লান্ত। মানুষ আর আয়নাঘর দেখতে চায় না, মানুষ আর গুম-খুনের মিছিলে শামিল হতে চায় না। তারেক রহমানের সামনে আজ ম্যান্ডেলার সেই মহানুভবতা দেখানোর সময় এসেছে। তাকে প্রমাণ করতে হবে যে, দীর্ঘ নির্বাসন তাকে প্রতিহিংসাপরায়ণ নয়, বরং আরও ধৈর্যশীল ও দূরদর্শী করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির চিরচেনা দৃশ্য হলো এক দল ক্ষমতায় গেলে অন্য দলকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। মামলা, হামলা আর জেল-জুলুমের এই চক্র গত কয়েক বছরে চরম সীমায় পৌঁছেছে। তারেক রহমানের সামনে আজ দুটি পথ। একটি হলো যুগ যুগ ধরে চলে আসা সেই পুরোনো প্রতিশোধের রাজনীতি. যা সাময়িক আনন্দ দিলেও দেশকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।
অন্যটি হলো ম্যান্ডেলা কিংবা আব্রাহাম লিংকনের পথ। লিংকন বলেছিলেন.আমরা কেউ কারো শত্রু নই. আমরা সবাই বন্ধু। আজ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের অভিভাবক হতে হলে তারেক রহমানকে বলতে হবে যারা আমাকে কষ্ট দিয়েছে. আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। বিচার হবে আইনের টেবিলে রাজপথে নয়।এই একটি বাক্যই তাকে সাধারণ নেতার আসন থেকে তুলে রাষ্ট্রনায়কের আসনে বসিয়ে দেবে।
প্রযুক্তি বলছে, গত কয়েক দিনে কোটি কোটি মানুষ কেবল একজনের নাম অনলাইনে খুঁজেছে। এই যে মানুষের ব্যাকুলতা এর পেছনে রয়েছে হাজারো না-বলা গল্প। কেউ তার ব্যবসা হারিয়েছে, কেউ হারিয়েছে প্রিয়জন, কেউবা স্রেফ কথা বলার অধিকারটুকু হারিয়েছে। তাদের চোখে আজ স্বপ্ন নয়, বরং এক ধরণের আর্দ্রতা রয়েছে।
নেতার আসল সার্থকতা বিশাল মিছিলে নয়, বরং একজন সাধারণ মানুষের চোখের পানি মোছায়। তারেক রহমানকে বুঝতে হবে, এই কোটি কোটি মানুষ তাকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য যতটা না ব্যাকুল, তার চেয়ে বেশি ব্যাকুল একটি শান্তিময় বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য। যেখানে মাঝরাতে দরজায় পুলিশের করাঘাত হবে না, যেখানে ভিন্নমত পোষণ করা অপরাধ হবে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি বা জাপানের দিকে তাকালে দেখা যায়. তারা ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে কেবল মহান নেতৃত্বের কারণে। কনরাড অ্যাডেনাউয়ার বা জওহরলাল নেহরু জানতেন, ভাঙা দেশ গড়তে হলে সবাইকে সঙ্গে নিতে হয়। আজ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, অর্থনীতি ধুঁকছে, আর মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমানকে আজ এমন এক নেতা হতে হবে, যিনি পরবর্তী নির্বাচনের কথা না ভেবে পরবর্তী প্রজন্মের কথা ভাববেন। তাকে হতে হবে এমন এক রাজনীতির কারিগর, যেখানে দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে যোগ্যতা হবে বড় পরিচয়।
আমরা এমন একজন নেতার স্বপ্ন দেখি, যার জানাজায় বা বিদায় বেলায় কেবল নিজের দলের লোক নয়, বরং বিরোধী মতের মানুষও চোখের পানি ফেলবে। যেমনটা হয়েছিল ম্যান্ডেলার ক্ষেত্রে। সারা পৃথিবীর মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করেছিল কারণ তিনি ঘৃণা করতে জানতেন না।তারেক রহমানের সামনে আজ সুযোগ এসেছে একটি নতুন ধারার রাজনীতি উপহার দেওয়ার। তাকে এমন একটি দেশ গড়তে হবে যেখানে।
একজন সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে সরকারের সমালোচনা করতে পারবে।দেশের প্রতিটি নাগরিক, সে যে ধর্মের বা যে দলেরই হোক, সমান নিরাপত্তা পাবে।বিচার বিভাগ হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, যেখানে হুকুমের বিচার হবে না। মানুষের চোখের পানি কখনো বিফলে যায় না। বাংলাদেশের মানুষ আজ এক নতুন সূর্যের অপেক্ষায় আছে। তারেক রহমান যদি তার বাবার মতো সাহসিকতা আর ম্যান্ডেলার মতো উদারতা দেখাতে পারেন, তবে তিনি কেবল বিএনপির নেতা হয়ে থাকবেন না. তিনি হয়ে উঠবেন জাতির ত্রাতা।
ইতিহাস বড় নির্মম। ইতিহাস কেবল তাকেই মনে রাখে, যে নিজের কষ্টের চেয়ে মানুষের কষ্টকে বড় করে দেখে। সময় এখন তারেক রহমানের। তিনি কি কেবল একজন জনপ্রিয় নেতা হয়ে থাকবেন, নাকি ম্যান্ডেলার মতো কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের রাজা হয়ে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন? বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ আজ সেই উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।সবাই ভাল থাকবেন সুস্থ থাকবেন এই কামনায় আজকে বিদায় নিলাম।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথার