ইতিহাস সব নেতাকে সমানভাবে স্মরণ করে না। অধিকাংশ রাজনৈতিক চরিত্র সময়ের চাহিদায় আবির্ভূত হয়ে সময়ের সঙ্গেই মিলিয়ে যায়। আবার কিছু নাম থাকে, যাদের নিয়ে ইতিহাস নিজেই বারবার প্রশ্ন তোলে, পুনর্মূল্যায়ন করে এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্থায়ী আসনে বসিয়ে দেয়। পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে আব্রাহাম লিংকন, চার্লস দ্য গল, উইনস্টন চার্চিল, নেলসন ম্যান্ডেলা, গোল্ডা মেয়ার, বেনজির ভুট্টো কিংবা ইন্দিরা গান্ধীর নাম সেই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত যাঁদের জীবদ্দশায় বিতর্ক ছিল প্রবল, কিন্তু সময়ের বিচারে তাঁদের গুরুত্ব আরও গভীর ও সুদৃঢ় হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল শ্রেণিভুক্ত নাম, যাঁকে বাদ দিয়ে এই ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হয় না। ইতিহাস কখনো ‘ভুল-ঠিক’-এর সরল হিসাব কষে না। বরং সে দেখে কে কতটা সময়কে প্রভাবিত করেছে, কে রাজনৈতিক প্রবাহকে কতটা বদলাতে পেরেছে, এবং কে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে। এই মানদণ্ডে বিচার করলে বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে দেখতে হয়।
ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, তিনি কখনো সুবিধাজনক নীরবতা বেছে নেননি। তিনি ছিলেন অবস্থাননির্ভর রাজনীতির প্রতিনিধি। তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি কখনোই নিরপেক্ষ বা নির্বিষ ছিল না বরং তা ছিল স্পষ্ট, সংঘাতপূর্ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ইতিহাসের বিচারে এমন উপস্থিতিই স্থায়ী গুরুত্ব পায়। এই বৈশিষ্ট্য তাঁকে ইউরোপের চার্লস দ্য গলের সঙ্গে তুলনীয় করে তোলে। দ্য গল ফ্রান্সের রাজনীতিতে একাধিকবার ক্ষমতা হারিয়েছেন, কিন্তু কখনো রাজনৈতিক অবস্থান হারাননি। তিনি রাজনীতিকে দেখেছেন ক্ষমতার হিসাব নয়, জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবে। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। তিনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখেছেন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল কেবল শাসনক্ষমতার প্রশ্ন নয়; ছিল আত্মমর্যাদা, অধিকার ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্ন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে ক্ষণস্থায়ী রাজনীতিকদের ভিড় থেকে আলাদা করেছে।
সমসাময়িক সময়ে আপোষহীনতাকে প্রায়ই নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। মার্গারেট থ্যাচার আপোষ করেননি বলেই ‘আয়রন লেডি’ হয়েছেন। উইনস্টন চার্চিল যুদ্ধকালীন আপোষ করেননি বলেই ব্রিটেন টিকে ছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা আপোষ করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তা করেছিলেন শক্ত অবস্থান থেকে দুর্বলতা থেকে নয়।
খালেদা জিয়ার অনমনীয়তা তাঁকে অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে একা করেছে। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এই একাকিত্বই তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে। তিনি স্বল্পমেয়াদি সমঝোতার বদলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক রেখা টেনেছেন যার মূল্যায়ন ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেনজির ভুট্টো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিনি ব্যক্তিগত জীবন ও নিরাপত্তার বিনিময়ে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে বহন করেছিলেন। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্রের প্রশ্নকে ব্যক্তিগত রাজনীতির ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছেন। তাঁর উপস্থিতি রাজনীতিকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে এ কথা সত্য। কিন্তু সেই বিভাজনের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের প্রশ্ন জীবিত থেকেছে। তিনি না থাকলে বাংলাদেশের রাজনীতি হয়তো আরও নির্বিরোধ, আরও একমাত্রিক হয়ে পড়ত ইতিহাস এই বাস্তবতাও বিবেচনায় নেবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে একটি লক্ষণ বারবার দেখা যায় যাদের বিদায়ে বিভক্ত সমাজও এক মুহূর্তের জন্য নীরব হয়, ইতিহাস সাধারণত তাঁদের গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা, জন এফ কেনেডি কিংবা গোল্ডা মেয়ারের বিদায়ে যেমন ঘটেছিল। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়েও সেই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়েছে। মতভেদ অক্ষুণ্ন থেকেছে, কিন্তু শোক ও স্বীকৃতির ভাষা হয়েছে অভিন্ন। এটি কোনো আবেগঘন কাকতাল নয়; এটি ইতিহাসের স্বভাব। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন ছিল কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর শেষকৃত্য নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। জনজোয়ার, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি এবং বিশ্লেষকদের মন্তব্য প্রমাণ করে ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি গণমানুষের হৃদয়ে অমর ছিলেন।
এই বিদায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অম্লান ছাপ রেখে গেছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষমতার হিসাবের বাইরে গিয়েও নেতৃত্ব ইতিহাসে স্থান করে নিতে পারে।ইতিহাস শেষ পর্যন্ত নেতাদের তিনটি প্রশ্ন করে.তারা কি সময়কে প্রভাবিত করেছে? তারা কি মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়িয়েছে? তারা কি আপসের চেয়ে অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছে? তিনি নিখুঁত ছিলেন না ইতিহাস নিখুঁত কাউকেই চায় না। ইতিহাস চায় প্রভাব, দৃঢ়তা ও উপস্থিতি। সেই বিচারে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের শীর্ষ সারিতেই থাকবেন যেখানে বিতর্ক থাকে, কিন্তু বিস্মরণ থাকে না।
মাহাকাল শেষ পর্যন্ত নিরপেক্ষ। সে আবেগে নয়, প্রভাবে রায় দেয়। সেই বিচারে বেগম খালেদা জিয়া কোনো ক্ষণস্থায়ী চরিত্র নন। তিনি একটি যুগ, একটি অবস্থান এবং একটি রাজনৈতিক মানসিকতার নাম।এ কারণেই বলা যায় তিনি ইতিহাসের পাতায় শুধু লেখা নন, তিনি ইতিহাসের পাঠ্য।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথার