মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
নোয়াখালী-১ এর মাঠের রাজনীতি এখন আর শুধু স্লোগান, মিছিল কিংবা পোস্টারে সীমাবদ্ধ নেই। তা ঢুকে পড়েছে অন্দরমহলে, চায়ের টেবিলের আড্ডায়, এমনকি প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সের হিসাবেও। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সময় গড়াতে গড়াতে নোয়াখালী-১ (চাটখিল–সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনের রাজনীতি যে নতুন বাঁক নিয়েছে, তার কেন্দ্রে এখন দুই ভিন্ন মেরুর দুই ব্যক্তিত্ব।
একদিকে সংসদীয় রাজনীতির পোড়খাওয়া খেলোয়াড়, বিএনপির ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। অন্যদিকে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে হাজির হওয়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জহিরুল ইসলাম। এই দুই নাম ঘিরেই এখন আবর্তিত হচ্ছে নোয়াখালী-১ এর রাজনীতির মূল গল্প।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এই জনপদের রাজনীতিতে নতুন কেউ নন। সুপ্রিম কোর্ট বার থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির নীতি-নির্ধারণী পরিসরে তার সরব উপস্থিতি তাকে দিয়েছে একটি আলাদা উচ্চতা। স্থানীয় ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে চাটখিল–সোনাইমুড়ীর কথা বলার মতো একজন অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য নেতার প্রয়োজন রয়েছে আর সেই জায়গায় খোকন এখনও শক্ত অবস্থানে।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। জাতীয় রাজনীতির ব্যস্ততায় স্থানীয় পর্যায়ে তার উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক ভোটার। গ্রামগঞ্জের মেঠোপথে, সুখে-দুখে পাশে পাওয়ার প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতির অভিযোগও শোনা যাচ্ছে। এই শূন্যতা কতটা দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে পূরণ করতে পারবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে বিএনপির ঐতিহ্যবাহী এই আসনের ভবিষ্যৎ সমীকরণ।
অন্যদিকে জহিরুল ইসলাম নোয়াখালী-১ এর রাজনীতিতে একেবারেই ভিন্ন এক চরিত্র। প্রথাগত রাজনৈতিক পরিবারের নাম না হলেও নাগরিকত্ব ত্যাগ করে জন্মমাটির টানে ভোটের লড়াইয়ে নামা এই সিআইপি ইতোমধ্যেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টি কেড়েছেন। তার ব্যক্তিগত ইমেজ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং ‘মোস্তফা হাজেরা ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তাকে অনেকের কাছে আপন করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জহিরুল ইসলামের মূল শক্তি তথাকথিত নীরব ভোটার’ এবং প্রবাসী পরিবারগুলো। যারা দীর্ঘদিনের গতানুগতিক রাজনীতিতে ক্লান্ত, পরিবর্তনের আশায় আছেন, তারা জহিরুল ইসলামের মধ্যে একজন আধুনিক, দায়বদ্ধ ও প্রতিশ্রুতিশীল নেতৃত্বের ছায়া দেখছেন।
চাটখিল ও সোনাইমুড়ীর পৌরসভা থেকে শুরু করে গ্রামের বাজার, পাড়া-মহল্লা সবখানেই এখন ভোটের অঙ্ক কষা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এবারের নির্বাচন শুধু প্রতীক দেখেই হবে না. হবে মানুষ দেখে। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা এবার বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এমন একজন নেতাকে খুঁজছে, যাকে প্রয়োজনে হাতের নাগালে পাওয়া যাবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ব্যালট যুদ্ধে খোকনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বনাম জহিরুল ইসলামের আধুনিক নেতৃত্বের লড়াই এখন সমানে সমান। খোকন যদি তার সাংগঠনিক ভিত্তিকে আরও সংহত করতে পারেন এবং স্থানীয় উপস্থিতি দৃশ্যমান করেন, তবে তার পথ অনেকটাই মসৃণ হতে পারে। অন্যদিকে জহিরুল ইসলাম যদি নীরব সমর্থনকে ভোটে রূপ দিতে পারেন, তবে নোয়াখালী-১ আসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক অঘটন ঘটাও অসম্ভব নয়।
ভোটারদের নীরবতা অনেক সময় বড় ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়। চাটখিল–সোনাইমুড়ীর মানুষ এখন সেই ঝড়ের দিকেই তাকিয়ে। কে পরবেন জয়ের মালা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একথা নিশ্চিত খোকন ও জহিরুলের এই দ্বৈরথ নোয়াখালীর রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।