হাড়কাঁপানো পৌষের এক রূপালি সকাল। পুব আকাশের ললাটে সিঁদুরে টিপের মতো সূর্যটা সবে উঁকি দিয়েছে। কুয়াশার পাতলা ঘোমটা চিরে রোদ্দুরের নরম আভা চরাচরে ছড়িয়ে পড়ছে। চারদিকে এক মায়াবী নিস্তব্ধতা; কেবল দূরে কোথাও ডানাঝাপটানো পাখির কলতান আর উত্তুরে হাওয়ার মৃদু শোঁ-শোঁ শব্দ। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো রোদের স্পর্শে মুক্তোর দানার মতো ঝলমল করে উঠছে।
সময়টা তখন খুব ভোর। রাশেদ তার পাচন লাঠিটা হাতে নিয়ে মাঠের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলো। তার বাবা আফজাল হোসেন অনেক আগেই উঠেছেন। ধর্মপ্রাণ মানুষ তিনি; ফজরের নামাজ শেষেই কাঁধে কোদাল আর মই নিয়ে চলে গেছেন মাঠে। মাত্র ছয় শতক জমি এইটুকুই তাঁদের সংসারের একমাত্র অবলম্বন। অভাবের টানাপোড়েন থাকলেও তাঁদের কুঁড়েঘরে এক চিলতে শান্তির বসতি আছে। আফজাল হোসেন সেই জমিতে নতুন শস্য বোনার স্বপ্নে বিভোর হয়ে পরম মমতায় মাটি কুপিয়ে নরম করছেন।
পথিমধ্যে রাশেদ হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। রাস্তার ধারের এক জীর্ণ অশ্বত্থ গাছের তলায় একজনকে বসে থাকতে দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল। লোকটা ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন। এই হাড়কাঁপানো শীতে তার শরীরে বলতে গেলে কোনো আবরণই নেই। রিক্ত দেহে লোকটা থরথর করে কাঁপছে। সূর্যের প্রথম আলোটুকু যখন তার গায়ে এসে পড়ল, তখন সে সামান্য একটু উষ্ণতার খোঁজে কুঁকড়ে যাচ্ছিল।
অসহায় মানুষটিকে দেখে রাশেদের কিশোর মনে এক প্রবল হাহাকার জেগে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। হাতের লাঠিটা রাস্তার পাশে ফেলে রেখে সে ঝড়ের বেগে বাড়ির দিকে দৌড় লাগাল। হাঁপাতে হাঁপাতে মায়ের কাছে সব খুলে বলল। রাশেদের মা সখিনা বিবি অভাবের মাঝেও বড় দয়ালু এক নারী। তিনি আফজাল হোসেনের সযত্নে রাখা একটি পুরনো মোটা চাদর এবং একটি ধোয়া পাঞ্জাবি বের করে দিলেন। রাশেদ তখন মায়াবী আবদার করে বসল, "মা, লোকটাকে কিছু খেতেও দিতে হবে, অন্তত কয়েকদিনের ব্যবস্থা তো হোক!"
মায়ের আঁচলে বাঁধা সামান্য সঞ্চয় থেকে একটি কড়কড়ে এক হাজার টাকার নোট তিনি রাশেদের হাতে তুলে দিলেন। কাপড় আর টাকাটা নিয়ে রাশেদ যখন পুনরায় সেই পথে ফিরে এল, দেখল রোদটা কিছুটা তেজি হয়েছে। সেই ক্লান্ত ও নিঃস্ব মানুষটি পথের ধারের এক খড়ের গাদার পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন। হয়তো রোদের ওম আর খড়ের আরাম তাকে এক চিলতে শান্তির ঘুম উপহার দিয়েছে।
রাশেদ অতি সন্তর্পণে লোকটির শিয়রে কাপড়গুলো রাখল এবং টাকার নোটটি পাঞ্জাবির পকেটে সাবধানে গুঁজে দিল। সে মনে মনে ভাবল— "মানুষের সেবা করাই তো পরম ধর্ম। আমি যদি উষ্ণতায় থাকতে পারি, তবে আমার এই আর্ত ভাইটি কেন শীতে কষ্ট পাবে?"
নিজের করা ছোট এই কাজটির তৃপ্তিতে মনটা ভরে উঠল রাশেদের। সে দ্রুত পায়ে আবার মাঠের দিকে হাঁটা দিল। জমিতে গিয়ে দেখল বাবা আফজাল হোসেন কপাল থেকে ঘাম মুছছেন। মাটি কোপানোর কাজ শেষ, এখন মই দিয়ে জমি সমান করার পালা। রাশেদ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বাবার হাত থেকে মইটা নিজের হাতে তুলে নিল এবং পথের সেই ঘটনার কথা বাবাকে খুলে বলল।
শুনে আফজাল হোসেনের দুচোখ ভিজে এল। তিনি পরম আদরে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। আবেগমথিত কণ্ঠে বললেন, "বাপ আমার, মানুষের সেবা করাই তো আসল ধর্ম। তুই আজ যা করেছিস, তাতে আমার বুকটা গর্বে ভরে গেছে।" তিনি দুহাত তুলে সন্তানের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলেন।
সূর্যের আলো তখন চারদিকে পূর্ণরূপে বিকিরিত হচ্ছে। আফজাল হোসেন ছেলের উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী হাসি হাসলেন। তিনি অনুভব করলেন, আজ সকালের রোদ কেবল পৃথিবীকে নয়, বরং তাঁর ছেলের হৃদয়কেও এক পরম স্বর্গীয় আলোয় উদ্ভাসিত করে দিয়েছে। মাঠের সেই ছোট এক টুকরো জমি ছাপিয়ে যেন সারা চরাচরে ছড়িয়ে পড়েছে রাশেদের 'রোদ্দুরে মাখা এক টুকরো মানবতা'।