উপজেলা প্রতিনিধি, কোম্পানীগঞ্জ
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও চরম জনবল সংকটের কারণে এটি নিজেই ‘অসুস্থ’ হয়ে পড়েছে। সরকারি এ হাসপাতালটিতে ডিএমএ(ডিপ্লোমা মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট) কোর্সধারীদের অশুভ দৌরাত্ম্যে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে বিসিএস ক্যাডারধারী এমবিবিএস ডাক্তারা। উপজেলার প্রায় চার লাখ মানুষের একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হয়েও পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও কর্মচারী না থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত ২৯ জন চিকিৎসকের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৯ জন। সবচেয়ে বড় ঘাটতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের। এখানে ১০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ২ জন। গুরুত্বপূর্ণ গাইনী বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় নারী রোগীদের বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে জেলা সদর হাসপাতাল বা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সব মিলিয়ে ৭টি বিশেষজ্ঞ পদ শূন্য থাকায় বিশেষায়িত চিকিৎসা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগী রোগী আসমা বেগম বলেন, “ডাক্তার না থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও সময়মতো সেবা পাই না। সামান্য অসুস্থতা দেখালেও আমাদের জেলা শহরে পাঠানো হয়। গরিব মানুষ এত দূরে গিয়ে চিকিৎসা করাবে কীভাবে?”
প্রতিদিন গড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেককেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ল্যাবে ২ জন টেকনোলজিস্ট থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ১ জন। ফলে পরীক্ষার রিপোর্ট পেতেও সময় লাগছে অনেক বেশি।রোগীর চাপে একজন টেকনোলজিস্টকে ঘর্মাক্ত হয়ে যেতে এবং বিড়ম্বনা পোহাতে হয়।
শুধু চিকিৎসক নয়, কর্মচারী সংকটও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।২৪ জন স্বাস্থ্য সহকারীর স্থলে আছে মাত্র ১৫ জন। পরিচ্ছন্ন কর্মী ৬ জনের স্থলে আছেন মাত্র ২ জন এবং ওয়ার্ডবয় ৫ জনের স্থলে মাত্র ২ জন কর্মরত। ফলে হাসপাতালের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে। রোগীরা অভিযোগ করছেন, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে থাকতে হচ্ছে তাদের।
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক চিকিৎসক সরকারি চাকরিতে থেকেও নিয়মিত প্রাইভেট চেম্বার ও ক্লিনিকে রোগী দেখছেন। সরকারি দায়িত্বে অবহেলা করে এসব ডাক্তাররা সরকারি ওষুধ, রোগী ও সরঞ্জাম নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করছেন।
অভিযোগ রয়েছে,ডিএমএধারীরা(ডিপ্লোমা মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট) উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে দৃষ্টিনন্দন সাইনবোর্ডে ডাক্তার ও নানা বিশেষণ জড়িয়ে নামের পাশে সরকারি হাসপাতালের পরিচয় ব্যবহার করেন।এসব ডিএমএধারীরা বাইরে চেম্বার হাঁকিয়ে ভিজিট নেন ৩০০-৪০০ টাকা।তদুপরি তাদের জন্য নির্দিষ্ট ঔষধের বাইরে অননুমোদিত এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশনে লিখেন।এতে সেবাপ্রার্থীরা একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন,অপরদিকে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ডিএমএধারীরা উপজেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে থাকার কথা থাকলেও তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিনিয়ত ডিউটি করে যাচ্ছেন।এতে গ্রামীণ জনপদের জনসাধারণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থাকছে।এদের দৌরাত্ম্যে হাসপাতাল প্রশাসন জিম্মি হয়ে আছে।
গাইনীর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকলেও এক বছরের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত (ইউসি) চিকিৎসকরা সিজার অপারেশন করেন। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেউ কেউ প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে সিজার অপারেশন করেন। অভিযোগ রয়েছে,গাইনী বিভাগের(ইউসি) কিছু চিকিৎসক সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নিয়ে যান নিজেদের প্রাইভেট ক্লিনিকে। এরা সিজার করতে গিয়ে প্রসূতি এবং নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
সরকারি হাসপাতালে থাকা অবস্থায়ও অনেক চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে ডিউটিতে থাকেন না, বরং প্রাইভেট ক্লিনিকে সময় দেন। এমনকি সার্জারি বা প্রসবের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা (ডিএমএ) ওটি (অপারেশন থিয়েটার) পরিচালনা করেন বলে সেবা গ্রহনকারীদের অভিযোগ।
দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থাকা কয়েকজন নার্স ও কর্মচারী ওটি ইনচার্জের দায়িত্বে থেকে প্রভাব বিস্তার করছেন। নিয়ম অনুযায়ী একজন নার্স এক জায়গায় এক বছরের বেশি থাকার কথা নয়, কিন্তু এখানে কেউ কেউ টানা ২০ বছর ধরে দায়িত্বে আছেন।
রোগীরা অভিযোগ করছেন, সরকারি হাসপাতালে সিন্ডিকেট করে সরকারি ওষুধ বিক্রি করা হয়। ১ টাকার বিনিময়ে দেয়ার কথা থাকলেও অনেক দরিদ্র রোগী ওষুধ ছাড়াই ফিরে যাচ্ছেন। সরকারি সেবা না পেয়ে সাধারণ মানুষ বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি ক্লিনিকের দ্বারস্থ হতে।
অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও জনবল সংকটের কারণে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবার মান ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ডিএমএধারীদের অনৈতিক-অশুভ দৌরাত্ন্য বন্ধ,ডাক্তার ও কর্মচারীর শূন্যপদ পূরণ, দায়িত্বহীন চিকিৎসকদের বদলি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এই বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “আমরা সীমিত জনবল নিয়ে প্রতিদিন শত শত রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে চিকিৎসক ও কর্মচারীর শূন্যপদগুলো পূরণ হলে এই হাসপাতাল আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।”