ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদকে ঘিরে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ রাজধানী ও বড় শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দেন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এই ঘরমুখো মানুষের ঢল সড়ক, রেল ও নৌপথে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে ঈদ যাত্রা অনেক সময় স্বস্তির পরিবর্তে দুর্ভোগ, যানজট এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। তাই ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতি বছর ঈদের আগে দেশের মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার প্রধান সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো সামান্য ত্রুটি বা দুর্ঘটনার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি যেমন বাড়ে, তেমনি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে এই দুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে ঈদের আগেই দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোর সংস্কার ও মেরামত কাজ সম্পন্ন করতে হবে, যাতে যাত্রাপথে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা না থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তার উন্নয়ন বা সংস্কার কাজ ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তেও চলতে থাকে, যা যানজটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এসব কাজ যথাসময়ে শেষ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করাও জরুরি। ঈদ যাত্রার সময় মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি বাড়াতে হবে এবং যানবাহনের গতিসীমা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন যানবাহন যাতে সড়কে চলাচল করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অনেক সময় পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস বা ট্রাক অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে রাস্তায় নামে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
রেলপথ ও নৌপথের ব্যবস্থাপনাও ঈদ যাত্রা সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি সড়কপথের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে রেল ও নৌপথে যাত্রী পরিবহন বাড়ানো যায়, তাহলে মহাসড়কের চাপ কমবে। এজন্য ঈদ উপলক্ষে অতিরিক্ত ট্রেন ও লঞ্চ চালু করা, টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনেক সময় টিকিট কালোবাজারি বা অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের সময় অনেক পরিবহন প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত মুনাফার আশায় নির্ধারিত আসনের বাইরে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে থাকে, যা সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় অনেক চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। এসব আচরণ সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাই পরিবহন মালিকদের উচিত নিয়ম মেনে যানবাহন পরিচালনা করা এবং চালকদের নিরাপদ গতিতে গাড়ি চালাতে উৎসাহিত করা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও ঈদ যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহাসড়কে চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কিংবা যাত্রী হয়রানির মতো অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এসব অনিয়ম বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এছাড়া গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ যাত্রার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের উদ্যোগ ও প্রচারণা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় যাত্রীরা তাড়াহুড়া করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাসের ছাদে ওঠেন বা অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাত্রা করেন। এসব কাজ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। যাত্রীদের উচিত নির্ধারিত আসনে ভ্রমণ করা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা। একই সঙ্গে চালক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখানোও জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঈদ যাত্রাকে নিরাপদ করতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; বরং সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করলে ঈদ যাত্রা অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক করা সম্ভব।
ঈদের আনন্দ যেন কোনোভাবেই দুর্ঘটনা বা দুর্ভোগের কারণে ম্লান না হয়। তাই ঈদ যাত্রার সময় সবাইকে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও দুর্ঘটনামুক্ত ঈদ যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট