নোয়াখালীর লক্ষীচরের বিস্তীর্ণ উপকূল। যেখানে বর্ষার জল সরে গেলে মাটির গায়ে লবণের দাগ শুকিয়ে থাকে, আর শীতের কুয়াশা দূরের মানুষকে ছায়ার মতো দেখায়, সেখানে বদিউল আলম নামটি কেউ খুব একটা মনে রাখেনি।
মানুষ তাকে চিনত অন্য নামে, বদিয়া চোরা।
সুবর্ণচর থানার পুলিশের খাতা আর গ্রামচৌকিদারের পুরোনো নথিতে তার নামের পাশে লাল কালিতে লেখা ছিল দাগী লিস্টেড সিঁধেলচোর। যেন নাম নয়, অপরাধই তার বংশপরিচয়। পাঁচ বছর ধরে নোয়াখালী কারাগারের একটি স্যাঁতসেঁতে ওয়ার্ডে বন্দী রয়েছে বদিয়া।
চুরির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি। জেলের ভেতর দিন গোনার আলাদা কোনো ক্যালেন্ডার নেই, সেখানে সময় মাপা হয় লোহার দরজা খোলা-বন্ধের শব্দে, ভাতের পাতিলের ধোঁয়ায়, আর রাতের শেষে কয়েদিদের দীর্ঘশ্বাসে।
বদিয়ার সঙ্গে দেখা করতে তেমন কেউ আসে না।
আসবেই বা কে?
সমাজ যার নামের আগে চোর বসিয়ে দেয়, তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আত্মীয়তার পথও একদিন শুকিয়ে যায়। তবু একজন ছিল হোরন মিয়া, ডাকনাম হোরা।
বদিয়ার ভাবশিষ্য, সিঁধকাটার বিদ্যার নীরব অনুসারী। বছরখানেক আগে সে দেখা করতে এসেছিল জেলখানায়;
সেদিন বিকেলের আলোটা ছিল মলিন। কয়েদিদের সাক্ষাৎঘরের মোটা জালের ওপারে হোরার মুখ দেখে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি বদিয়া। কিন্তু মানুষের চোখ অনেক সময় মুখের আগেই সংবাদ পৌঁছে দেয়।
হোরা মাথা নিচু করে বলেছিল
—ওস্তাদ--
—ওস্তাদ শেফালী আর নাই। একটি বাক্য।
তারপর যেন জেলের দেয়ালও কিছুক্ষণ নীরব হয়ে ছিল।
বদিয়ার একমাত্র কন্যা শেফালী বেগম;
বাবার অপরাধের উত্তরাধিকার যার কপালে জন্মের পর থেকেই সেঁটে দেওয়া হয়েছিল।
হোরা থেমে থেমে আরো জানিয়েছিল মৃত্যুর পরেও শেফালির ভাগ্যে শান্তি জোটেনি। গ্রামের মসজিদের ইমাম মওলবী নুরুল হক আপত্তি তুলেছিল জানাজা নিয়ে। কারণ শেফালি সিঁধেল চোরের মেয়ে। তার ওপর বেপর্দা চলাফেরার বদনামও ছিল। যেন মৃত্যুরও আগে সমাজ তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য জোগাড় করে রেখেছিল। পরে এলাকার মজিদ মাস্টারের হস্তক্ষেপে কোনোরকমে দাফনের ব্যবস্থা হয়। গ্রামের কবরস্থানে নয়
নদীর পাড়ে, চরভাঙা মাটির এক কোণে শেফালীকে শুইয়ে রাখা হয়েছে।
সব কথা শুনে বদিয়া কোনো কান্না করেনি
কোনো হাহাকারও নয়
শুধু সাক্ষাৎঘরের জালের ওপারে তার দুটো হাত দীর্ঘক্ষণ স্থির ছিল, যেন সিঁধ কাটার অভ্যস্ত আঙুলগুলো প্রথমবার কোনো অদৃশ্য দেয়ালের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছে।
সেই ঘটনার পর থেকেই বদিউল আলম বদলে গেছে।
আগে জেলের ভেতর মাঝেমধ্যে অস্থির হয়ে উঠত, পাহারাদারের সঙ্গে তর্ক করত, নিয়ম ভাঙত; এখন সে একদম চুপচাপ। জেলের নিয়মকানুন নিখুঁতভাবে মেনে চলে। ভোরে জেল জেলপুলিশের বাঁশি, খাবারের সারি, কয়েদিগণনার ডাক, সবকিছুর মধ্যে যেন সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে।
কেউ কেউ বলে, মানুষ যখন ভেতরে ভেঙে পড়ে তখন
বাইরে সবচেয়ে বেশি শান্ত দেখায়।
১১ ই ডিসেম্বর। আর মাত্র দুদিন পর ১৩ তারিখে বদিয়ার সাজা শেষ হবে। অন্য কোনো মামলা না থাকায়
মুক্তি পেতে তার বাধাও নেই।
তবু মুক্তির কথা শুনে তার চোখে আনন্দ দেখা যায় না;
স্ত্রীর খবর সে জানে না। তবে হোরা এসে বলে গেছে গ্রামের লোকেরা সিঁধেল চোরের বউ বলে কাজ দেয়নি, অপমান করে তাড়িয়েছে। শেষে নতুন জাগা বয়ারচরের খাসভূমিতে একখানা খুপরিঘর তুলে কোনোরকমে বেঁচে আছে সে। এইসব খবর শোনার পর থেকে বদিয়া যেন কারাগারের দেয়ালের ভেতর আরেকটি অদৃশ্য হিসাব কষছে। রাতের গভীরে, যখন জেলের বাতিগুলো মলিন হয়ে আসে আর দূরের দক্ষিণা বাতাস লোহার শিক ছুঁয়ে শোঁ শোঁ শব্দ তোলে, বদিয়া অনেকক্ষণ জেগে থাকে। তার মনে হয় পাঁচ বছর আগে সে মাটির ভিটায় সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকেছিল, আর এই পাঁচ বছরে কে যেন তার নিজের জীবনেই সিঁধ কেটে সব লুটে নিয়ে গেছে।
১৩ ডিসেম্বর। আজ বদিউল আলমের মুক্তির দিন।
পাঁচ বছরের সাজা শেষ। নোয়াখালী কারাগারের ভেতরে শেষবারের মতো ভোরের বাঁশি বাজল, কয়েদিগণনা হলো, আর বদিয়া বুঝতে পারল এই লোহার জিঞ্জিরের দিনগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্ক ফুরিয়ে এসেছে। জেলগেটে তার জন্য কেউ আসবে না এমনটাই ভেবেছিল বদিয়া।
আসবেই বা কেন? যে মানুষের নামের সাথে সমাজ বহু আগেই সিঁধেলচোর শব্দটি পেরেকের মতো গেঁথে দিয়েছে;
সেই জেলে বন্দী থাকলেই মানুষের জন্য নিরাপদ।
তবু অদ্ভুতভাবে তার মনে হচ্ছিল, চার দেয়ালের বাইরে আলো-বাতাস, প্রকৃতির ঘনছায়া, সবুজের মায়া যেন তাকে আলিঙ্গন করার জন্য অপেক্ষা করছে।
পাঁচ বছর পর মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়াবার অনুভূতি মানুষকে কখনো কখনো শিশুর মতো দুর্বল করে দেয়।
কিন্তু আজকে অন্যরকম, পৃথিবী পুরোপুরি অকৃতজ্ঞ হয়নি।
হোরন মিয়া, ওরফে হোরা বদিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল;
জেলগেটের বাইরে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে সে।
হাতে শপিং ব্যাগ। ব্যাগে নতুন লুঙ্গি, গেঞ্জি আর একটি পুরোনো কিন্তু পরিষ্কার শার্ট। দিন-তারিখ ভুলে যায়নি হোরা।
হোরা তার ওস্তাদকে ভালোবাসে
ভক্তি করে
মান্য করে।
চোরেদের ভক্তির ভেতরেও এক ধরনের নিষ্ঠা থাকে, সমাজ যাকে স্বীকার না করুক, তাদের নিজস্ব জগতে বিশ্বাসঘাতকতার চেয়ে বিশ্বস্ততার দাম অনেক বেশি।
বিকেল গড়িয়ে প্রায় পাঁচটা, লোহার গেট খুলল।
বদিয়া ধীরে ধীরে বাইরে এল;
বেরিয়েই একবার পেছনে তাকাল।
জেলের ধূসর দেয়াল, উঁচু প্রাচীর, পাহারার টাওয়ার, পাঁচ বছরের বন্দিজীবন যেন এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার বুকের ভেতর থেকে একটি দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এলো।
গেটের পাশে দাঁড়ানো এক জেলপুলিশ হেসে বলল;
—আবার আইলে দেখা হইবো বদিয়া
বদিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল
তারপর নিচু স্বরে বলল
—আর দেখা হইবো না,
একটু থেমে আবার বলল
—একদম না।
সে হাঁটতে শুরু করতেই হোরা দৌড়ে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করল। তারপর কোনো সংকোচ না রেখেই জড়িয়ে ধরল ওস্তাদকে।
বদিয়াও তাকে বুকে টেনে নিল।
দীর্ঘদিন পরে মানুষের স্পর্শ কেমন অচেনা হয়ে যায়।
হোরা হেসে বলল;
—ওস্তাদ, বহুদিন পর তোমারে পাইয়া বুকের ভিতর দারুণ সাহস জাগতাছে।
বদিয়া চোখ কুঁচকে তাকাল
—কি সাহস রে?
হোরা শপিং ব্যাগটা এগিয়ে দিল
—আগে এইগুলা গায়ে দাও। তারপর কইতাছি।
বদিয়া অবাক হয়ে ব্যাগের ভেতর তাকাল
—আরে--একদম নতুন লুঙ্গি-গেঞ্জি!
হোরা দাঁত বের করে হাসল;
—হ, ওস্তাদ। গত সপ্তাহে একটা রাত করেছি। ভালোই কামাইছি। ভাবলাম পাঁচ বছর আগের তোমার জামাকাপড় আর কি থাকে? ছিঁড়া-ফাড়া হইয়া গেছে নিশ্চয়ই। তাই বুদ্ধি কইরা আনছি।
বদিয়া নিজের গায়ের পুরোনো কাপড়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উঠল।
—আনছস ভালোই করছস। না হয় গ্রাম পর্যন্ত যাইতে মুশকিল হইত, বলেই রাস্তার একপাশে গিয়ে কাপড় বদলাতে লাগল বদিয়া। পুরোনো জামাটা খুলে হাতে নিতেই বুঝল কাপড় যেমন পুরোনো হয়েছে, নিজেও তেমনি ক্ষয়ে গেছে।
নতুন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে ফিরে আসতেই হোরা ফিসফিস করে বলল
—ওস্তাদ, দারুণ একটা খবর আছে
—কি খবর?
হোরার চোখে তখন পুরোনো উত্তেজনা।
—গিয়াস হাজীর বাড়িতে রাত করলে ভালো টাকাপয়সা, স্বর্ণালংকার, অনেক কিছু পাওয়া যাইবো।
হাজীর দুই পোলা সৌদিতে থাকে
বাড়িতে মালপত্র ভালোই আছে।
বদিয়া থেমে গেল।
মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল তার, বলল;
—না রে হোরা, চুরির কাম আর কোনোদিন করুমু না
হোরা যেন শুনে বিশ্বাস করতে পারল না।
—কি কও ওস্তাদ? তাহইলে খাইমু কি?
বদিয়া দূরের দিকে তাকিয়ে রইল ;
জেলের দেয়ালের ভেতর পাঁচ বছর ধরে পাকতে থাকা এক অদ্ভুত চিন্তা যেন তার কণ্ঠে জমাট বাঁধল।
—হ, সিঁধের চুরি আর না। জেলের মধ্যেই ভাবছিলাম;
—তাহলে কি করবা?
বদিয়া এবার সরাসরি হোরার দিকে তাকাল এবং বলল
—রাজনীতি করমু
হোরা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল
—কি কি?
—হ, রাজনীতি।
বদিয়ার গলায় অদ্ভুত দৃঢ়তা।
—বিরাট এক রাজনীতি।
হোরা হতবুদ্ধির মতো দাঁড়িয়ে রইল;
—আমরা---আমরা রাজনীতি করমু?
বদিয়া হালকা হাসল
—কেন? তোর আপত্তি আছে?
হোরা মাথা চুলকাল
—আপত্তি না ওস্তাদ?
—কিন্তু সুবর্ণচরের দশ গ্রামের মানুষ আমাগো চেনে।
আমরা চোর। তোমার সাজাও হইছে। মানুষ জানে আমরা চিহ্নিত সিঁধেলচোর।
—আমরা আবার কেমনে রাজনীতি করমু?
বদিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। দূরে দক্ষিণের আকাশে পাখির সারি উড়ছে।
তারপর বদিয়া নিচু স্বরে বলল
—হোরা--
আমরা সিঁধ কাটছি ঘরের ভিটায়
আর অনেকেই রাজনীতির সিঁধ কাটে মানুষের অন্তরে,
বিশ্বাস এবং সমাজের পেটের ভিতর।
আমাগো চুরি রাইতে হয়
ওদের চুরি দিনের আলোতে।
আমাগো করতে সমস্যা কোথায়?
এই কথা বলে বদিয়া হাঁটা শুরু করল।
হোরা স্থির দাঁড়িয়ে চিন্তায় পড়ে গেল;
ওস্তাদের কথার ভেতর সে প্রথমবার এমন এক সিঁধেলচোর শব্দ শুনল হোরা।
জেলগেট পেরিয়ে বদিয়া যখন হাঁটতে শুরু করল, হোরাও নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাঁড়াল। বিকেলের আলো তখন মাইজদীর আকাশে ঢলে পড়ছে। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে।
পাঁচ বছর পর মুক্ত বাতাসে হাঁটলেও বদিয়ার ভেতরে যেন কোনো উচ্ছ্বাস নেই। তার হাঁটার ভঙ্গিতে বরং এক ধরনের সতর্কতা।
কিছু দূর এগিয়ে হোরা নিচু গলায় বলল;
—ওস্তাদ, একটু রাত নামলেই বাসে কইরা রওনা দিমু
বদিয়া তাকাল।
—এহন যাইতে সমস্যা কি?
হোরা চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল
—সমস্যা না? মানুষেরা তো আমাগোরে চিনবে।
কেউ দেখে ফেললে হাজার প্রশ্ন জাগবে?
বদি ছাড়া পাইছে
কোথায় কি হয় আবার? এইসব। অযথা কথা বাড়াইয়া লাভ কি?
বদিয়া মৃদু হাসল,
—কেন? আমরা কি চুরি কইরা পালাইতাছি নাকি এহন?
হোরা অপ্রস্তুত হইয়া গেল
—না, তা না-- আমি ওই অর্থে কই নাই।
বদিয়া হাঁটতে হাঁটতেই বলল
—আমরা তো কোনো অন্যায় করি নাই এহন।
—আর চুরিচামারি--ওই কাম আর করমুও না ঠিক করেছি।
কথাটা শুনে হোরা একবার ওস্তাদের মুখের দিকে তাকাল; জেলের ভেতরে এই কথাটা সে আগেও শুনেছে, তবু বিশ্বাসটা পুরো জমেনি।
পরিবেশ হালকা করবার জন্য সে বলল
—আরে ওস্তাদ, বলছিলাম কি?
ওই যে শ্রমিকনেতা-
বাসশ্রমিক আর মালিক দুই দিকেরই নেতা
নাম জমির উদ্দিন
বদিয়া থামল না, তবে স্বরটা একটু ভারী হলো।
—জমির উদ্দিন?
—হ। লোকডা ভয়ংকর। মানুষ ডরায় তারে। চাঁদাবাজি, মারামারি, খুনখারাপি, মাদকের ব্যবসা, সবই চলে হের নামে।
—অনেক হেডম তার।
বদিয়া কিছুক্ষণ চুপ রইল
তারপর বলল
—বলা লাগবো না। জেলের ভিতর হের কথা শুনছি।
হোরা অবাক।
—চিনো নাকি ?
—হ, হেও আমারে চেনে।
—কেমনে?
বদিয়ার ঠোঁটে হালকা, দুর্বোধ্য হাসি ফুটল।
—একবার জেলে তার লোকজনের সাথে দেখা করতে আইছিল। হের দুইজন হাজতি আছিল আমার ওয়ার্ডে। যাওনের সময় কইয়া গেছে বদি ছাড়া পাইলে দেখা কইরো,
তোমারে আমাগো প্রয়োজন।
হোরার চোখে কৌতূহল;
—তাইলে তো ভালোই! দেখা কইরা নিলেই পারি। কামেও লাগতে পারে।
এইবার বদিয়া থেমে দাঁড়াল
সন্ধ্যার আলো তার মুখে পড়ে অদ্ভুত ছায়া ফেলেছে।
ওর কাছে আমাগো কি কাম?
—না বলতাছি---
—কেন?
—জেলের ভিতর মনেমনে একটা সিদ্ধান্ত নিছি
—কি সিদ্ধান্ত?
বদিয়া ধীরে বলল
—খারাপ লোকের লগে আর সম্পর্ক রাখমু না, খারাপ কাজও করমু না।
হোরা চুপ করে গেল
কিছুক্ষণ পরে বদিয়া নিজেই বলল
—হোরন-- তুই কি আমার ওপর আস্থা রাখছ?
—কি যে কও ওস্তাদ, শুরু থেইকা তোমার লগে আছি। মরণ পর্যন্ত থাকুমু যে।
বদিয়া এবার প্রথমবারের মতো একটু স্পষ্ট হাসল
—এই জন্যই তো বলতাছি-- আমরা একটা রাজনীতি খেলমু।
—কেমন রাজনীতি?
—কোন দলে যাইবা?
—কোনো দলে না রে
—তাহলে?
বদিয়া ধীরে বলল
—আমরা কারো রাজনীতি করুম না
রাজনীতি করুমু আমাগো নিজের।
হোরা কিছু বুঝল না।
—তুই শুধু পাশে থাহিস।
—হ, আছি তো ওস্তাদ।
কথা বলতে বলতে তারা মাইজদী বাসস্ট্যান্ডে এসে পৌঁছাল;
রাতের আবছা আলো নেমে এসেছে শহরের ওপর। দোকানের সাইনবোর্ড জ্বলছে, ভাজাপোড়ার গন্ধ বাতাসে। তারা চুপচাপ সুগন্ধা বাসে উঠে বসল।
বাস শহরের প্রধান সড়ক পেরিয়ে সোনাপুরে এসে থামল। সেখান থেকে একটি সিএনজি অটো ধরে তারা রওনা দিল চরলক্ষীর দিকে। রাত নামতে নামতে চরভূমির বাতাসে নদীর কাঁচা গন্ধ মিশে উঠল।
অন্ধকারের ভেতর বদিয়া হঠাৎ বলল
—হোরন-- তোর ভাবি কোথায় আছে?
হোরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
—জানি ওস্তাদ। ওই নদীর ধারে নতুন চরে। খাসজমিতে খুপরি বানাইছে।
একটু থেমে আবার বলল
—আমি মাঝেমধ্যে খবর নিতে যাইতাম। কিন্তু পরে ভাবিই নিষেধ করছে।
—কেন?
—কইছে, হোরন ভাই আপনি আর আইয়েন না। মানুষ চিনলে আমারে থাকতে দিব না। ভাববো চোরের লোকজন বাড়ি বাড়ি ঘুরতাছে। কাজকামও পাইমু না। আর বদি মিয়ার খবর পাইলে সব শেষ।
হোরার গলা ভারী হয়ে এলো।
—আর কইছিল চোরগো টাকাপয়সাও আমার লাগবো না।
কথাটা কইয়া মুখে কাপড় দিয়া কান্না চাপছিল ভাবি।
বদিয়া নীরব হয়ে গেল।
অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছিল নাম
কথা বলতে বলতে তারা পৌঁছে গেল ভাঙাচোরা সেই ঘরের সামনে।
পাঁচ-ছয় ডিসিমিল খাসজমি। একপাশে খড়ের চালা, অন্য পাশে পলিথিনের বেড়া। দরজাটা কাত হয়ে আছে।
হোরা বলল
—ওস্তাদ এইডাই তোমার নতুন বাড়ি।
বদিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল
তারপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাক দিল
—শেফালির মা, শেফালির মা
কোনো উত্তর নেই
আবার ডাকল
—শেফালির মা--
ভেতর থেকে হারিকেনের হলদে আলো নড়ল।
শেফালির মা বেরিয়ে এল
কণ্ঠ শুনে চিনতে কষ্ট হয়নি তার।
কিন্তু চিনেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না;
হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল
—আপনি কেন আইছেন? কোত্থেকে আইছেন?
বদিয়ার বুকটা কেঁপে উঠল।
—শেফালির মা তুমি আমারে মাপ কইরা দাও।
বাদিয়ার স্ত্রী যেন শুনলই না।
শেফালির মা হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ল;
—আপনি চইলা যান। দোহাই আল্লা, চইলা যান।
—আমি আর চুরি করুম না
—না! আমি এখন ভালো আছি। আপনারে ছাড়া ভালোই আছি। আপনি চইলা যান।
—যাইতে কইও না গো বউ
—না যাইলে আমি অহনি যেদিকে চোখ যায় চইলা যামু!
সে ঘুরে চলে যেতে লাগল।
বদিয়া স্তব্ধ।
তারপর ধীরে বলল
—হোরন তোর ভাবিরে থামা।
গলায় আহত অহংকার।
—আমি চোর হইলেও আমারও ইজ্জত আছে। আমার বউ ঘর ছাড়বে না। আমি ফজরের আগেই চইলা যামু।
হোরা এগিয়ে গিয়ে বলল
—ভাবি, বদি ভাই সত্যি ফজরের আগেই চইলা যাইবো।
দীর্ঘ নীরবতার পর শেফালির মা বলল
—ঠিক আছে। ঘরে ঢুকো না। বারান্দায় থাকো।
কিছুক্ষণ পরে সে ভাতের পাতিল আর হাঁসের মাংস এনে সামনে রাখল।
হোরা অবাক হয়ে বলল
—ভাবি তুমি রান্না করছ?
শেফালির মা নিচু গলায় বলল
—আজ জানতাম শেফালির বাবা ছাড়া পাইবো;
—তাহলে অপেক্ষা করছিলা?
সে চোখ মুছতে মুছতে বলল
—শেফালির মরার দিন কসম করছি ওর লগে আর সংসার করমু না। কিন্তু মন মন বড় বেইমান;
তাই হাঁসটা জবাই দিছি।
কথা শেষ না করেই কান্নায় ভেঙে পড়ল।
তবু বদিয়ার দিকে একবারও তাকাল না
রাত গভীর হলো।
খাওয়া শেষে বারান্দায় শুয়ে পড়ল বদিয়া আর হোরা।
কিন্তু ঘুম এল না ওদের
দূরে নদীর শব্দ
চরের বাতাসে অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
অনেকক্ষণ পরে বদিয়া ফিসফিস করে বলল
—হোরন
—হ,
—আমি কাল সকালে নতুন চরে চইলা যামু
—তারপর?
—তুই মানুষজনরে বলবি হাতিয়ায় যাইবার পথে নদীতে নৌকা ডুইবা আমার সলিলসমাধি হইছে।
হোরা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট
—কি কও ওস্তাদ?
—কাউরে বলবি না, আমি বয়ারচরে থাকমু।
—শেফালির মাকেও না?
—হ। সবাইরে।
হোরার গলা কেঁপে উঠল
—ভাবিরে মিথ্যা কইমু?
বদিয়া ধীরে বলল
—একটাই মিথ্যা। বদিউল আলম বেঁচে নেই। বাকিসব সত্য।
—কিন্তু কারণ কি?
অন্ধকারে বদিয়ার মুখ দেখা গেল না। শুধু কণ্ঠটা ভেসে এলো
—কারণ শুনবি?
একটু থামল বদিয়া।
নদীর বাতাস এসে বারান্দার পলিথিন কাঁপিয়ে গেল।
তারপর বদিয়া নিচু স্বরে বলল
—কারণ একটাই রাজনীতি।
গভীর রাত পেরিয়ে সুবেহ-সাদিকের আকাশ ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে। নদীমাতৃক চরের বাতাস ভাঙাচোরা খুপরি ঘরের পলিথিন নেড়ে যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছে এখন বদিয়ার যাবার সময়।
হ্যাঁ, বদিয়া চলে যাচ্ছে।
দূরে কোথাও নয়, নিকটস্থ নতুন জেগে ওঠা বয়ারচরে।
নতুন চর জাগলেই বদিয়ার মনে হয়, সাগর-বুকের অন্ধকারে যেন নতুন এক চাঁদ উঠেছে। অথচ সেই চাঁদের মাটি শান্ত নয়। নদী ও জোয়ারের বুক চিরে জেগে ওঠা ওইসব চর বহুদিন ধরেই জলদস্যু আর বনদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে। একসময় লাঠিয়ালদের আধিপত্য ছিল সেখানে, এখন সেসব ভূমি দস্যুদের অঘোষিত রাজ্য। ওইসব নতুন চরে রাষ্ট্রের আইন পৌঁছায় না সহজে, চলে দস্যুদের আইন।
ভূমিহীন চাষিকে জমির দখল নিতে হয় এককালীন টাকা দিয়ে। চাষাবাদ, বসতি, মাছধরা, সবকিছুর ওপর তাদের অদৃশ্য কর বসে আছে। আবার দস্যুরাও এক নয়, নানান দলে বিভক্ত। আধিপত্যের লড়াইয়ে মাঝেমধ্যেই গোলাগুলি, খুনোখুনি, প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে চরজুড়ে। তারা নিজেদেরকে নদী, বন, আর নতুন চরের শাসক মনে করে। এমন এক মধ্যযুগীয় ভয়ংকর চরে বদিয়া কেন যাচ্ছে?
আর কেনই বা নিজের মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে দিতে বলছে? হোরা কোনো কূলকিনারা খুঁজে পায় না।
ওস্তাদের কথা সে জীবনে কখনো অমান্য করেনি, প্রাণ গেলেও করবে না। তবু বুকের ভেতর অস্থিরতা জমে আছে।
ওস্তাদ কি তবে দস্যুদলে যোগ দিচ্ছে?
না, তা তো হওয়ার কথা নয়, নিজের মুখে কসম করে বলেছে, মৃত্যুর সংবাদ ছাড়া আর কিছু মিথ্যা হবে না। আর কোনো অপরাধেও জড়াবে না।
তাহলে?
বয়ারচরে গিয়ে থাকবে কোথায়? খাবে কি?
হোরার মাথায় উত্তর আসে না।
আল্লাহই ভালো জানেন।
চিন্তার ভেতরেই হঠাৎ বদিয়ার কণ্ঠ ভেসে এল;
—হোরন, আমি অহনই চইলা যাইতাছি। তুই ফজরের আজান উঠলেই বের হইস।
হোরা চমকে তাকাল।
বদিয়া শান্ত গলায় বলল
—মসজিদে যাইয়া মওলবী নুরুল হক সাহেবরে দিয়া মাইকে আমার মৃত্যুর খবরটা জানাইয়া দিস। পুরো নাম কইবি মুহাম্মদ বদিউল আলম।
হোরা বিস্মিত।
—মওলবি কইবো তোমার নাম?
বদিয়া ঠান্ডা স্বরে বলল
—কেন কইবো না?
পঞ্চাশটা ট্যাকা হাতে ধরাইয়া দিলেই হইব।
হোরা শুকনো হাসল।
—তা ঠিকই কইছ। মওলবি নিজেরে বড় বুজুর্গ মনে করে।ঝাড়ফুঁক কইরা প্রতিদিন ভালোই কামাইতাছে।
বদিয়ার ঠোঁটে কঠিন হাসি ফুটল।
—হ। ঝাড়ফুঁক দেওয়ারা নিজেরে মনে করে একেকজন একেকটা মেডিক্যাল কলেজ।
হগল রোগের চিকিৎসা বসাইছে।
একটু থামল সে।
তারপর কণ্ঠটা হঠাৎ ভারী হয়ে এল।
—আমার নিস্পাপ শেফালির জানাজা পড়াই নাই। হালা বড় বুজুর্গ বদমাইশ।
কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর বদিয়া ধীরে বলল;
—আমি চললাম। শেফালির মারে কইবি
—পারলে আমারে মাপ কইরা দিতে।
আর কিছু বলল না সে।
এই বলে বদিয়া ঘুরে দাঁড়াল। ভোরের আবছা আলোয় চরের বুক ধরে সোজা দক্ষিণমুখে হাঁটতে শুরু করল।
হোরা স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
ঠিক সেই সময় খুপরি ঘরের ভেতর থেকে চাপা কান্নার শব্দ ভেসে এল। শেফালির মা মুখে কাপড় চেপে হাঁপিয়ে কাঁদছে।
হোরা ব্যাকুল হয়ে উঠল।
—ভাবি-- তুমি ওস্তাদরে থামাও!
তোমার দুহান পায়ে পড়ি, ভাবি তুমি থামাও!
শেফালির মা কাঁদতে কাঁদতে বাইরে বেরিয়ে এল।
হারিকেনের ক্ষীণ আলো আর ফজরের আগের আধো-অন্ধকারে দূরে তাকিয়ে রইল সে।
কিন্তু ততক্ষণে বদিউল আলম অনেক দূরে।
চরের ধূসর প্রান্তর, কুয়াশা আর ভোরের আবছায়ার ভেতর তার ছায়ামূর্তি ধীরে ধীরে মিশে গেছে।
মনে হলো একজন মানুষ নয়, যেন একটি পুরোনো পরিচয় অন্ধকারের ভেতর হারিয়ে গেল।
চলবে