বিবেকের অস্থিও পঁচে মাটিতে মিশে গেছে। মৃত মানুষও তাই বিবেক বিবেচনাহীনদের নির্যাতন থেকে রেহাই পায় না! হতদরিদ্র কঙ্কালসার অসহায় বৃদ্ধ / বৃদ্ধাদের জন্য নিষ্ঠুরতম মানুষদের বুক একটুও কেঁপে ওঠে না। নির্বিচারে তারা পথে ঘাটে অনাহারে ঘুরে বেড়ায় একমুঠ ভাতের জন্য। আকাশ ছোঁয়া বিল্ডিংয়ের বাসিন্দাদের কানে তাদের চিৎকার পৌঁছেও যেন পৌঁছে না। এক প্লেট ভাত হাতে নিয়ে তাকে দেওয়ার মানসিকতা তাদের নেই। কেন নেই সেটা অজানা। আসলে মানুষের মন থেকে মায়া মমতার অনুভূতি যেন মরে গেছে!
এরূপ অবস্থা শুধু যে আমাদের দেশে তা নয়। বিশ্বব্যাপী চলছে এই বিবেকহীনতা, নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার দিগম্বর খেলা! সভা পৃথিবীর মানুষেরা মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে ভূতের মতো পেছনে হাঁটছে। ওরা ওদের আদিম পিতামাতার অনুসারী হচ্ছে। কিছুদিন পরে শোনা যাবে মানুষের কাঁচা মাংস মানুষেই ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় আশি বছর চলছে ইসরায়েল ফিলিস্তিন সমস্যা। গোটা মুসলিম বিশ্ব যেন অন্ধ,বধির ও বোবা হয়ে আছে। ওরা কীসের ঘোরে এমন হয়েছে তাও কারো অজানা নয়! আন্তর্জাতিক ভাবে যদি অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস হারিয়ে ফেলে তবে ব্যক্তি মানুষ কী করবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তির আধুনিকতম ব্যবহারকারীদের চিন্তা করতে হবে।
এভাবে নারী পুরুষ ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করে যুদ্ধবাজ দেশগুলো মনে হয় এ বিশ্বকে মানবিক গুণে গুণান্বিত মানুষ শূন্য করে ফেলবে। আর সেখানে রাজত্ব করবে সকল প্রকার মানবিক গুণ হীন অমানুষ। যাদের অবয়ব মানুষের মতো, আচরণে পশুর চেয়েও জঘন্য। তাদেরকে কোন বিশেষণেই বিশেষায়িত করার উপায় থাকবে না। বনের নিরীহ শান্তিপ্রিয় পশুপাখিরাও তাদের কিম্ভূতকিমাকার বিদঘুটে আকৃতি দেখে তাড়াতে হুলুস্থুল শুরু করবে। বৈজ্ঞানিকদের উচিত ওই যুদ্ধবাজ, জবরদখলকারী রাষ্ট্র নায়কদের শনাক্ত করে তাদের মস্তিষ্কগুলোকে বিশুদ্ধ মানবিকতার পরমাণু দিয়ে ধুয়ে দেওয়া। যাতে তাদের মগজের ভাজে ভাজে মন্দ কাজের চেয়ে ভালো কাজের অণু থাকে বেশি। মানুষ হয়ে যদি দয়া মায়ার লেশও না থাকে তাদের উচিত বনের হিংস্র পশুদের থেকে শিক্ষা নেওয়া। তা যদি সম্ভব না হয় গৃহপালিত কুকুর বিড়াল,হাঁস মুরগির মধ্যে মায়ার যে চর্চা আছে তা দেখা।
তবে প্রবাদ আছে, 'চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি'। এতক্ষণ যা বলা হলো অনেকেই ভাববে এ যে 'উলুবনে মুক্তা ছড়ানো' হলো। যে মানুষের কাছে মানুষের জীবনের কোন মূল্যই নেই, সে কোন কারণে পশুপাখির দিকে তাকাতে যাবে! তার চোখে মুখে বুকে তো লোভের আগুন জ্বলছে! সর্বভূক সামনে যা পায় সবই যে গিলে খায়! ছাই করে ছেড়ে আবার নতুন এলাকায় যায়।
আর কতকাল চলবে পৃথিবী জুড়ে এ অরাজকতা? যুদ্ধের এ দাবানলে পালের গোদাদেরই তো লাভ! তারা মাটির নীচে হাজার হাজার ফুট গভীর ব্যাংকারে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করে। মরে একেবারে সাধারণ ও নিরীহ জনগণ।কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শরনার্থীর জীবন বেছে নেয়। কেন কেন এ জঘন্যতম গণহত্যা,সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি। যে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বানিয়ে তারা অন্য দেশের সম্পদ ছিনিয়ে নেয় এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করে দেশ ও দশের ক্ষতি করে। তারা যদি সামান্য বিবেক খরচ করতো, তবে এ বিশাল বিশ্বের কোথাও একটি মানুষও না খেয়ে মরতো না। কোনো দরিদ্র মানুষকে বাতি দিয়ে খুঁজেও পাওয়া যেতো না।
আমি আবারও নতুন প্রজন্মের যুবসমাজের উদ্দেশ্যে বলবো, তোমরা তোমাদের বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে এমন একটা পৃথিবী গড়ে তোল,যেখানে শুধু বিবেকবান মানুষ থাকবে। মানবতার জয়গান গাওয়া হবে সভাসমিতি ও উপাসনালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ধর্মের শুদ্ধাচারই শুধু পালন করবে। ধর্ম কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয় যে এটাকে নিয়ে ব্যবসা বা ভণ্ডামি করবে। প্রতিটি ধর্মের রীতিনীতি যদি সঠিক ভাবে মেনে সবাই চলে পৃথিবীটা হয়ে যায় জান্নাতুন ফেরদৌস। আসুন এখনও জীবন যতটুকু আছে এরই মধ্যে আমরা যার যার অবস্থানে থেকে মানবিকতার,বিবেকের চর্চা করি। শুধু পাই পাই না করে দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলি।ব্যক্তি নিজে শুদ্ধ থাকলে সমাজও শুদ্ধ হবে। আমাদের মধ্যে সবাই শুধু কী পেলাম এ হিসেব মেলাতেই ব্যস্ত থাকে, কী দিলাম এই বিষয় বেমালুম ভুলে যাই। এটা যদিও একদম অনুচিত। আমরা ছোট বেলায় শিখেছিলাম, 'ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই সুখ'।
তাই সবশেষে বলবো, সামনে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তর উৎসব কোরবানির ঈদ তথা ঈদুল আজহা। এই ঈদের মাধ্যমে আমরা ত্যাগের মহিমা শিখি। এই ত্যাগ শুধু প্রিয় পশু কোরবানি নয়,সেই সঙ্গে কোরবানি হোক আমাদের মস্তিষ্ক, মনন ও মনের যত লোভ,হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকারের। ঈদের আনন্দ ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাই মিলে করবো। সবার মুখে হাসি এবং পেটে যেন কোরবানির মাংস পৌঁছে সেই চেষ্টা করবো অন্তর থেকে। ধর্মের নিয়মানুযায়ী যেন কোরবানির গোসতের বণ্টন হয় আর শ্রেণী মোতাবেক সবার ঘরে ঘরে পৌঁছানো হয়। আর সবাই নামাজ পড়ে প্রার্থনা করি, পৃথিবী থেকে যুদ্ধ দূর হোক, মানুষের আর্থিক ও মানসিক শান্তি ফিরে আসুক। শরনার্থীরা শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজের দেশে ফিরে এসে নিরাপদে বাস করুক। যুদ্ধের দামামা থেমে ফুলের বাগানে সাজুক আমাদের পৃথিবী।
লেখক : শিক্ষক ও কবি