উপজেলা প্রতিনিধি, হাতিয়া : মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে জেলার উপকূলীয় চার উপজেলা হাতিয়া, সুবর্ণচর, কবিরহাট ও কোম্পানীগঞ্জ আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদীর উত্তাল স্রোত ও তীব্র ভাঙনের কারণে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং মানুষের জীবিকার উৎস। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি বর্ষা মৌসুমেই আরও কয়েক কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে।
সরেজমিনে উপকূলীয় চরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার গত কয়েক বছরে একাধিকবার ঘরবাড়ি সরাতে বাধ্য হয়েছে। কেউ বেড়িবাঁধের ওপর অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রতি বর্ষা মৌসুমে ভাঙন বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু কোম্পানীগঞ্জ এলাকাতেই প্রতি বছর গড়ে প্রায় দুই কিলোমিটার ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ফলে হাজারো পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা জানান, তারা ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধান চান। কোম্পানীগঞ্জের বাসিন্দা রশিদ উদ্দিন বলেন, “একসময় যেখানে শত শত ঘরবাড়ি ছিল, আজ সেখানে শুধু নদীর পানি। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো ভূমি অবশিষ্ট থাকবে না।”
কবিরহাটের চর এলাহী এলাকার নুরুল ইসলাম বলেন, “নদী শুধু আমাদের ঘরবাড়িই কেড়ে নিচ্ছে না, সন্তানদের ভবিষ্যৎও ধ্বংস করছে। ফসলি জমি হারিয়ে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে, শিশুরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”
সুবর্ণচরের চরক্লার্ক এলাকার বাসিন্দা বাবুল বলেন, “আমরা ত্রাণ চাই না, চাই টেকসই বাঁধ। নিজের মাটিতে নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চাই।”
হাতিয়ার চানন্দী এলাকার আবদুর রহিম বলেন, “আমরা আর কতদিন যাযাবরের মতো জীবন কাটাব? সাময়িক ব্যবস্থা নয়, স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।”
এদিকে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপনের কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, তীব্র স্রোতের কারণে এসব সাময়িক ব্যবস্থা খুব বেশি কার্যকর হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জামিল আহমেদ বলেন, “নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন রোধে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ ও দীর্ঘমেয়াদি ড্রেজিং মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন, যা উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।”
নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জিও ব্যাগ ফেলে এ ধরনের ভয়াবহ ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। তারা মেঘনা ও এর শাখা নদীগুলোতে পরিকল্পিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং, আধুনিক নদী শাসন ব্যবস্থা, সিসি ব্লকের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং কেওড়া, বাইন ও গোলপাতার মতো ম্যানগ্রোভ বেষ্টনী গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
এছাড়া নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উপকূলীয় অঞ্চলের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জেলার চার উপজেলার লাখো মানুষের জীবন, সম্পদ ও জনপদ রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী ও টেকসই নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।