নিউজ ডেস্ক : নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসুদের বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে সরকার দলীয় ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের (এমপি) মধ্যে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। রোববার (২১ জুন) বিকেলে সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্যকালে এ ঘটনা ঘটে।
এদিন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনের একপর্যায়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর বক্তব্য দেন হান্নান মাসুদ। তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিএনপি সরকারের একটি আকাঙ্ক্ষার দলিল, কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তব পরিকল্পনার কোনো দলিল নয়। কারণ, বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সেটি পূরণ করা অসম্ভব। এছাড়া বাজেটে যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, সেটিও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। এতে বাজেটে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা ঘাটতি আসতে পারে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করছে, অথচ ব্যাংক খাত বর্তমানে চরম সংকটে।
এ সময় বাজেটের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরার পাশাপাশি ফ্যাসিবাদ উৎখাতের পরও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ফ্যাসিবাদী আচরণের অভিযোগ তুলে সীমান্ত হত্যা ইস্যুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেন তিনি। হান্নান মাসুদ বলেন, ‘ভারতের দালালি যেভাবে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার করত, ঠিক একইভাবে আমাদের এই সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রিরা একই ধরনের ভারতীয় ভাষায় কথা বলে। ফ্যাসিবাদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বক্তব্য দিতেন, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সেই একইভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন যে, মাননীয় স্পিকার সকল সীমান্ত হত্যাকে সীমান্ত হত্যা বলা যাবে না। আমরা বলছি প্রত্যেকটি সীমান্ত হত্যাই হত্যা, প্রত্যেকটা সীমান্ত হত্যাই আমাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।’
প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার পরদিনই চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে অথচ সরকার বলছে মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। এই বাজেটের ওপর যে জনগণের আস্থা নেই, ব্যবসায়ীদের আস্থা নেই এর প্রমাণ বাজেটে খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর ঠিক একদিন পরই খুচরা বাজারে চাল-ডালের দাম বেড়ে যাওয়া। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন ভাষণে অসত্য তথ্য দেয়ার অভিযোগ করলে সংসদে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
পরে নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক দাঁড়িয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সংসদে অসত্য তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ তুলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে হান্নান মাসুদের এ সংক্রান্ত বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ জানান। একই সময় বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে হান্নান মাসুদের বক্তব্যের কোন অংশ অসত্য সেটি স্পষ্ট করতে বলেন। সেই সঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করার অধিকার বিরোধী দলের আছে। অবশ্যই উনাকে আমরা সম্মান করি, তিনি জিয়াউর রহমান-খালেদা জিয়ার সন্তান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তার মানে এই না যে তাকে নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না, তার কোনো বক্তব্যের সমালোচনা করা যাবে না। আমরা তো গণতন্ত্রের দিকে যেতে চাচ্ছি, আমরা কোনো ফ্যাসিবাদের দিকে যেতে চাচ্ছি না।’ এ সময় ডেপুটি স্পিকারকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে দেয়া বক্তব্য এক্সপাঞ্জের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন, ‘সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদ সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন এবং এটিই সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন ফারুক পয়েন্ট আউট করেছেন।’ এ সময় হান্নান মাসুদ দাঁড়িয়ে গেলে কয়েকবার তাকে বসতে বলেন ডেপুটি স্পিকার। তবে এতেও না বসলে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হান্নান মাসুদ দয়া করে বসুন, এটা শাহবাগ চত্বর নয়, জাতীয় সংসদ।’
ডেপুটি স্পিকারের এমন বক্তব্যের পর আবারও সংসদে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলে বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে কথা বলার ফ্লোর চান।
এরপর ডেপুটি স্পিকার সুযোগ দিলে বিরোধী দলীয় নেতা তার মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘হান্নান মাসুদ বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সংসদ নেতার ব্যাপারে কিছু কথা বলেছেন। আমি আপনাকে অনুরোধ করব, বাইরের কোনো বিষয়কে টেনে এখানে এনে এক্সপাঞ্জ করা বা বক্তব্য দেয়া কোনোটিই যেন অ্যালাউ করা না হয়।’ পরে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান ডেপুটি স্পিকার।