উপজেলা প্রতিনিধি, হাতিয়া : হাতিয়া উপজেলার সাগুরিয়া রেঞ্জে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন কেটে বসতি ও ফসলি জমি তৈরির এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত এই বনাঞ্চল ধ্বংসের নেপথ্যে খোদ সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ও বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মচারীর প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে।
সরেজমিনে সাগুরিয়া রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বনাঞ্চল উজাড়ের নির্মম বাস্তবতার প্রমাণ মিলেছে। বুড়িরচর ইউনিয়নের আলাদিগ্রাম বাজারের দক্ষিণ পাশে চরআলিম বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রায় ১০০ একর সরকারি বনভূমি ধাপে ধাপে সমতল করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা যোবায়ের, আশরাফ ও মাইনউদ্দিন জানান, গত সপ্তাহে নিজাম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে বনের ভেতর এস্কেভেটর (ভেকু) চালিয়ে রাতারাতি ৯টি নতুন ভিটি তৈরি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফরেস্ট ক্যাম্পের কর্মী মোহসীন ও জুয়েল প্রতিটি ভিটি বাবদ ২০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন, যার একটি বড় অংশ রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে গেছে। এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিনও আলতাফ মাঝির ছেলে সুমন বনের ৩৬ শতক জায়গা দখল করতে মোহসীনকে ৫০ হাজার ও নিজাম চৌধুরীকে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দেন।
ক্যাম্প কর্মী মোহসীন অবশ্য দাবি করেছেন, তিনি ভিটি নির্মাণের ছবি রেঞ্জ কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তবে বাস্তবে সেখানে অবৈধ ঘর তোলার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
আলাদিগ্রাম বাজারের পশ্চিম পাশে এনাম নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রায় ২০ একর বনভূমি দখল করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। এছাড়া বন ও ভূমি বিভাগের কর্মীদের সহযোগিতায় তিনি বনের আরও ৪ একর জায়গা ১০টি ভূমিহীন পরিবারের কাছে চড়া দামে বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে। এই বাণিজ্যের সাথে বন বিভাগের বোটচালক আবুল হাসেম ও ক্যাম্প স্টাফ মোহসীনের নাম জড়িয়েছে।
একইভাবে, টানবাজার দক্ষিণ পাশে বোটচালক আবুল হাসেমের সাথে ১ লাখ টাকার চুক্তির পর ভুট্টো নামের এক ব্যক্তি আড়াই একর বনভূমি দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেন। এছাড়া আলাউদ্দিন মাঝি নামের আরেক স্থানীয় ব্যক্তি একাই বনের প্রায় ৫০টি গাছ কেটে ফেলেছেন।
চরআলিম বিটটি সরাসরি রেঞ্জ কর্মকর্তার অধীনে থাকায় সেখানে অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বনের মধু আহরণ এবং কাদিরার খাল, আলিজ্জার খাল, পচার খাল, পরিক্ষিত খাল ও বুড়িরদোনা খালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি খাল ইজারা দেওয়া নিয়ে লাখ লাখ টাকার আর্থিক কারসাজির অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে বড় অনিয়ম মিলেছে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ‘হেল্প’ প্রকল্পের আওতায় চরআলিমে ১০০ হেক্টর এবং ভাসানচরে ৩২০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের দায়িত্ব পেয়েছিল সাগুরিয়া রেঞ্জ। বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে এই নতুন বনের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে সাগুরিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, "আমার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। বন পাহারার জন্য আমাদের স্টাফরা সার্বক্ষণিক মাঠে নিয়োজিত আছেন।"
এদিকে নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন রক্ষকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সুন্দরবনের পর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের উচ্ছেদ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন হাতিয়ার সচেতন মহল ও স্থানীয় বাসিন্দারা।