বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করে। কৃষি, মৎস্য, প্রবাসী আয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল এই জেলার অর্থনীতি ধীরে ধীরে পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানসহ গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতায় নোয়াখালীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নোয়াখালীর অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনো কৃষি। জেলার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ আনুমানিক ২.২ থেকে ২.৪ লাখ হেক্টর। ধান এখানে প্রধান ফসল, যেখানে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়। পাশাপাশি সবজি উৎপাদন ২-৩ লাখ মেট্রিক টন এবং ডাল ও তেলবীজ মিলিয়ে ৫০-৭০ হাজার মেট্রিক টন।
সাম্প্রতিক সময়ে নোয়াখালীর কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার টিলার এবং উন্নত বীজ ব্যবহারের ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা কৃষকের লাভজনকতা কমিয়ে দিচ্ছে।
নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে হাতিয়া, মৎস্য উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বছরে প্রায় ২ থেকে ২.৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। এই খাতে জেলার প্রায় ১৫-২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষই এখানে প্রধান উৎস। তবে, যথাযথ কোল্ড স্টোরেজ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে উৎপাদিত মাছের পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায় না। বাজারে দামের অস্থিরতাও বড় সমস্যা।
রেমিট্যান্সের প্রভাব
নোয়াখালীর অর্থনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো প্রবাসী আয়। জেলার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ পরিবারের সদস্য বিদেশে কর্মরত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৪-২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নোয়াখালী অঞ্চলের প্রবাসীদের অবদান। এ জেলায় প্রবাসী আয়ের বড় অংশ ভোগে ব্যয় হয়। প্রায় ৪০-৬০ শতাংশ অর্থ দৈনন্দিন খরচ, বড়িষর নির্মাণ এবং সামাজিক ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের হার তুলনামূলকভাবে কম, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
গত পাঁচ বছরে নোয়াখালী জেলায় প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিতা রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রেমিট্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলার প্রবাসীদের কাছ থেকে আসে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, ইউরোপ ও ২০০ যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত শ্রমিকদের মাধ্যমে।
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যন্ত হলেও নোয়াখালীতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেনি, বরং প্রণোদনা ও বৈধ চ্যানেল ব্যবহারের উৎসাহে তা বেড়েছিল। ওই বছর জেলায় আনুমানিক কয়েক হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স আসে। ২০২১ ও ২০২২ সালে এই প্রবাহ আরও শক্তিশালী হয়, কারণ অনেক প্রবাসী তাদের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠান এবং নতুন শ্রমবাজারও ধীরে ধীরে খুলে। যায়।
২০২৩ ও ২০২৪ সালে কিছুটা ওঠানামা দেখা গেলেও সামগ্রিক প্রবণতা ছিল ইতিবাচক। গত পাঁচ বছরে নোয়াখালী জেলায় মোট রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার মতো। এই বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ নোয়াখালীর গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। নতুন বাড়ি নির্মাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে ওঠা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এর প্রভাব স্পষ্ট। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেও আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসার বিস্তার
চৌমুহনী, বসুরহাট ও নোয়াখালী শহরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা দ্রুত বাড়ছে। স্থানীয় বাজারগুলো কৃষিপণ্য সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। বাণিজ্য খাত জেলার অর্থনীতিতে আনুমানিক ১৪১৬ শতাংশ অবদান রাখে। নোয়াখালীর শিল্পখাত এখনো অনুন্নত। জেলার অর্থনীতিতে শিল্পের অবদান ১-২ শতাংশের বেশি নয়। অবকাঠামোর অভাব, বিদ্যুৎ সমস্যা এবং বিনিয়োগের ঘাটতি এই খাতের প্রধান বাধা। নোয়াখালী সদরে নগরায়ন দ্রুত বাড়ছে। প্রতি বছর প্রায় ৩-৪ শতাংশ হারে শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে আবাসন, পরিবহন এবং
সেবা খাতে নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। জেলায় আয় বৈষম্য স্পষ্ট। প্রবাসী পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল হলেও, চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্যের হার বেশি। জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের হার ১৮-২০ শতাংশের মধ্যে থাকলেও নোয়াখালীর কিছু অঞ্চলে তা বেশি।
জলবায়ু ঝুঁকি
নোয়াখালী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি জেলা। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় এবং নদীভাঙন অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর হাজার হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলছে। নোয়াখালীর অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, মৎস্য রপ্তানি, পর্যটন এবং ব্লু ইকোনমি খাত উল্লেখযোগ্য। নিঝুম দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকা পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে কৃষিতে ভ্যালু চেইন উন্নয়ন, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষতা প্রশিক্ষণ জরুরি। এছাড়া প্রবাসী আয়কে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে হবে।
নোয়াখালীর সংকট
নোয়াখালী উপকূলীয় হওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কৃষি ও বসতভিটাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতি বছর নদীভাঙনে বহু পরিবার জমি ও বসতভিটা হারাচ্ছে, যা দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, ফলে কৃষিতে আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
জেলায় বড় শিল্পকারখানা প্রায় নেই বললেই চলে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও বিনিয়োগের ঘাটতি শিল্পায়নের প্রধান বাধা। প্রবাসী আয়ের বড় অংশ ভোগে ব্যয় হচ্ছে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ কম হওয়ায় অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় মৎস্য খাত পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারছে না। প্রবাসী ও অপ্রবাসী পরিবারের মধ্যে আয় বৈষম্য বাড়ছে। চরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্যের হার বেশি। দ্রুত নগরায়ন হলেও পরিকল্পনার অভাবে বস্তি বৃদ্ধি, যানজট ও পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
দক্ষ জনশক্তির অভাব থাকায় শিল্প ও আধুনিক খাতে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নোয়াখালীর সম্ভাবনা
নোয়াখালীর উর্বর পলি মাটি ও জলসম্পদের কারণে কৃষিতে বহুমুখীকরণের বড় সুযোগ রয়েছে। ধানের পাশাপাশি সবজি, তরমুজ, চিনাবাদাম, মরিচসহ বাণিজ্যিক ফসলের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব। জেলায় উৎপাদিত ধান, সবজি ও ফল প্রক্রিয়াজাত করে মূল্য সংযোজন করা গেলে স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে। উপকূলীয় অবস্থানের কারণে সামুদ্রিক ও স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক ফিশ প্রসেসিং ও রপ্তানি ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এই খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।
নোয়াখালীর বিপুল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর পাঠানো অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে যেমন শিল্প, কৃষি বা এসএমই বিনিয়োগ করা যায়, তবে স্থানীয় অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। চৌমুহনী, বসুরহাটসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রকে ঘিরে ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তা সহায়তা বাড়ালে কর্মসংস্থান বাড়বে।
নিঝুম দ্বীপসহ উপকূলীয় এলাকা ইকো-ট্যুরিজমের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি নতুন অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। দ্রুত নগরায়নের ফলে আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষার হার তুলনামূলক ভালো হওয়ায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে উচ্চ আয়ের চাকরির সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
পরিশেষে, নোয়াখালীর অর্থনীতি এখন একটি রূপান্তরের পর্যায়ে রয়েছে। কৃষি ও রেমিট্যান্সনির্ভর কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে শিল্প ও সেবাখাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে নোয়াখালী ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
লেখক: বিজনেস এডিটর-দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ