স্টাফ রিপোর্টার : কবিরহাট উপজেলার নরোত্তমপুরে ছনখোলা দরবেশ সাহেবের এতিমখানায় ১০ বছরের এক শিশুকে একাধিক বার বলাৎকারের অভিযোগে নুর আলম নামে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগী শিশুটির অভিভাবকের করা অভিযোগের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হস্তক্ষেপে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
গত ২৫ জুলাই হেফজ বিভাগের শিক্ষক নুর আলম এতিমখানার তৃতীয় জামাতের ১০ বছর বয়সী এক ছাত্রকে বলাৎকার করেন। ঘটনার সময় তিনি নিজের মুঠোফোনে এই ভিডিও ধারণ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরে একই বিভাগের আরেক শিক্ষক শাহ পরান (নেত্রকোনা) ওই ভিডিও দেখে নিজের মোবাইল ফোনে সংরক্ষণ করেন।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরবর্তী সময়ে ভিডিওটি স্থানীয় কয়েকজনের কাছে ছড়িয়ে দেন শাহ পরান, পরে বিষয়টি এতিমখানার শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানাজানি হয়। তবে অভিযোগ ওঠার পরও তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন এতিমখানার ওয়াকফ কমিটির সদস্য কাজী মোঃ ফাহাদ।
ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে দৈনিক নোয়াখালীর কথার প্রতিনিধি সরজমিনে ছনখোলা দরবেশ সাহেবের এতিমখানায় গেলে সেখানে কর্তব্যরত এতিমখানার আবাসিক বিভাগের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক আবদুল বারী দিনাজপুরী জানান, তিনি নুর আলমের বিরুদ্ধে শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগের কথা শুনেছেন। বিষয়টি তিনি এতিমখানার পরিচালক মাওলানা নুরুল হুদা রাহমানীকে অবহিত করেন। তাঁর দাবি, পরিচালককে বিষয়টি ওয়াকফ কমিটিকে তাৎক্ষণিক জানানোর অনুরোধও করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, অভিযুক্ত শিক্ষককে কোনো ধরনের আইনগত বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা ছাড়াই প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২৭ জুলাই এতিমখানার ওয়াকফ কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বিষয়টি অবহিত হন, তবুও এ বিষয়ে তিনি কোন উল্লেখযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি, তিনি বিষয়টি অবহিত থেকেও কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। যার ফলে অভিযুক্ত শিক্ষক নুর আলম প্রতিষ্ঠান থেকে কোনরকম ছুটি, চাকরি থেকে অব্যাহতি অথবা কোন নোটিশ ছাড়াই তিনি চলে যেতে সক্ষম হন। এ বিষয়ে পরিচালকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কয়েকজন।
এদিকে অভিযোগ ও করনীয় বিষয়ে জানতে এতিমখানার পরিচালক মাওলানা নুরুল হুদা রাহমানীর সঙ্গে ওয়াকফ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা বারংবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। একপর্যায়ে তারা পরিচালক মাওলানা নুরুল হুদা রাহমানীকে আলোচনার জন্য উনার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে উনাকে আসতে বললে তিনি এতিমখানায় আসবেন না বলেও সাফ জানান। পরে শিক্ষক আবদুল বারী বলেন ঘটনা জানাজানির পর থেকে পরিচালক মাওলানা নুরুল হুদা রাহমানী আর অফিসে আসেননি , প্রতিষ্ঠানটির হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করে ১৬ আগস্টের পর তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি না থাকার বিষয়ে সত্যতাও পাওয়া গেছে।
অভিযুক্ত নুর আলমের পাশাপাশি ভিডিও সংরক্ষণ ও ছড়িয়ে দেওয়া শিক্ষক শাহ পরান নেত্রকোনার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক আবদুল বারী জানান, হেফজ বিভাগের পরীক্ষা শেষে শাহ পরান ৬ দিনের ছুটির আবেদন করে ৩ আগস্ট বাড়ির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন। ছুটি শেষে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি আর ফিরে আসবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহ পরান নেত্রকোনার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর গত ১৭ আগস্ট এতিমখানার ওয়াকফ কমিটির সদস্য কাজী মো. ফাহাদ বিষয়টি জানতে পারেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, খবর পাওয়ার পর পরই তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে এতিমখানার পরিচালক মাওলানা নুরুল হুদা রাহমানীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। কিন্তু ঘটনার বিষয়ে যথাযথ ব্যাখ্যা কিংবা কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে সন্তোষজনক উত্তর পাননি তিনি।
কাজী মো. ফাহাদ আরও বলেন, বৃহত্তর নোয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা এবং ভুক্তভোগী শিশুটির অভিভাবক যেন ন্যায়বিচার পান, এবং ভবিষ্যতেও যেন এতিমখানায় কেউ এধরনের বেআইনি কাজে উৎসাহিত না হয় সে লক্ষ্যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এ বিষয়ে ওয়াকফ কমিটির সভাপতি, সেক্রেটারি ও এতিমখানার পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চাওয়া হলেও তিনি কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি।
পরে কমিটির কয়েকজন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে বিষয়টি এতিমখানার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদম পুষ্প চাকমাকে অবহিত করেন, পরে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে ঘটনাটি দেখেন। অভিযোগের সঙ্গে থাকা তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর তিনি কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রোমেন বড়ুয়াকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এবং ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা না থাকায় তাঁর চাচা অভিভাবক হিসেবে কবিরহাট থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
এরপর ১৮ আগস্ট পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত নুর আলমকে এতিমখানার পাশের এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এ ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এতিমখানায় থাকা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ছনখোলা দরবেশ সাহেবের এতিমখানা নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার ১ নম্বর নরোত্তমপুর ইউনিয়নের নরোত্তমপুর গ্রামে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি এতিম ও অসহায় শিশুদের আশ্রয়, লালন-পালন এবং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।