উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : জাতীয় সংসদে হাতিয়ার নৌঘাটসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপিকে জড়িয়ে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর হাতিয়ায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ওই বক্তব্যকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ দাবি করে ক্ষোভের জেরে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) উপজেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাকে ঘিরে ছাত্রদল ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অনুসারীদের মধ্যে দফায় দফায় হট্টগোল, তর্ক-বিতর্ক ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনার একপর্যায়ে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। পরে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা পরিষদে মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা শুরুর আগে এমপি হান্নান মাসউদ ও তাঁর সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মীর কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্থানীয় কয়েকজন নেতা হস্তক্ষেপ করে এমপিকে সভাস্থলে নিয়ে যান।
স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সম্প্রতি জাতীয় সংসদ, জেলা আইনশৃঙ্খলা সভা ও এনসিপির দলীয় কর্মসূচিতে হাতিয়া বিএনপিকে জড়িয়ে এমপি হান্নান মাসউদের দেওয়া বক্তব্য নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে হাতিয়া বিএনপি সংবাদ সম্মেলনও করে।
তবে সভার শেষ পর্যায়ে উপজেলা পরিষদের বাইরে আবারও এনসিপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বিষয়টি জানতে পেরে এমপি সভায় বক্তব্য না দিয়েই বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও কিল-ঘুষির ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় উপজেলা যুবশক্তির সদস্যসচিব ছাইফুল ইসলাম, রাকিব এবং ছাত্রদলের আকরাম, সাকিব, সাখাওয়াত হোসেন হিরো, আজাদ ও আকরাম আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
পরে প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। উত্তেজনার কারণে এমপি হান্নান মাসউদ প্রায় এক ঘণ্টা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অবস্থান করেন। পরে প্রশাসনের সহযোগিতায় তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে বাসভবনে চলে যান।
এদিকে দিনের অন্য সময়ও হাতিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শ্রমিক শক্তির সভাপতি আবীর হোসেন স্ত্রীকে হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে ভর্তি করাতে গেলে ছাত্রদলের কর্মীরা তাঁকে মারধর করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিকেলে মসজিদ মার্কেটের সামনে প্রধান সড়কে ছাত্রশক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মো. ছাইফুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
হাতিয়া উপজেলা এনসিপির আহ্বায়ক সামছল তিব্রীজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা সভাকে ঘিরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। তাঁর দাবি, ছাত্রদলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে এবং ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে।
অন্যদিকে হাতিয়া পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশিক ইকবাল বলেন, এমপি হান্নান মাসউদ বিভিন্ন জায়গায় বিএনপিকে জড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা সভার ঘটনায় বিএনপির কোনো নির্দেশনা ছিল না।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির আহমেদ বলেন, “ঘটনার বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্য যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, “আইনশৃঙ্খলা সভায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল সভাটির মূল উদ্দেশ্য। সেই সভাকে ঘিরেই রাজনৈতিক কর্মীদের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন জনসমাগম ও প্রশাসনিক সভায় সংঘাতের রূপ না নেয়। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।