আবু জাফর মোহাম্মাদ আলী জনী, স্টাফ রিপোর্টার : কাদির হানিফ ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষ্মীনারায়ণপুর (হাঁফার গোড়া) এলাকায় বারবিকিউ পার্টির পর কথিত ‘ঝাক্কাস’ নামের নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের অভিযোগে সাকিব (২২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়ে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গুরুতর অসুস্থ কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়েছে বলে স্বজন ও বন্ধুদের সূত্রে জানা গেছে।
নিহত সাকিব কাদির হানিফ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব লক্ষ্মীনারায়ণপুর (হাঁফার গোড়া) এলাকার মৃত ইরফানের ছেলে।
স্থানীয় ও ভুক্তভোগীদের বন্ধুদের সূত্রে জানা যায়, ২ অক্টোবর রাতে কাদির হানিফ ইউনিয়নের হাঁফার গোড়া এলাকায় সাকিব, সাইফুল, রাসেল, শান্ত, টিপু, আকাশসহ আরও এক যুবক মিলে বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করেন। সাকিব মেটাল ওয়ার্কশপে এবং সাইফুল একটি সুপার শপে কাজ করেন। রাসেল সাকিবদের কাজিন বলে জানা গেছে।
পার্টির খাবার শেষে একপর্যায়ে রাসেল একটি বোতলে থাকা কথিত নেশাজাতীয় দ্রব্য 'ঝাক্কাস' বের করে সবাইকে তা সেবনের জন্য উৎসাহিত করেন বলে পার্টিতে থাকা সাইফুলের বরাত দিয়ে তার বন্ধুরা জানান। তাদের দাবি, রাসেল নিজেই কয়েক ধরনের ওষুধ ও মাদকজাতীয় উপকরণ দিয়ে ওই দ্রব্য তৈরি করেছিলেন। এতে কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন সাইফুল। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের সংমিশ্রণকে ‘মিক্সার বা ঝাক্কাস' নামেও ডাকা হয় বলেও তারা জানান।
পরদিন ৩ অক্টোবর বিকেল থেকে একে একে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে তারা নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রাজীব আহমেদ চৌধুরী জানান, বিষাক্ত ও ভেজাল মদপানের উপসর্গ নিয়ে কয়েকজন অসুস্থ ব্যক্তি হাসপাতালে এসেছিলেন।
স্বজন ও বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সাকিব ৩ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টার দিকে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তাকে অক্সিজেন ও স্যালাইন দেওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তার বন্ধুরা।
পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় মাইজদী প্রাইম হাসপাতালের সামনে হাসপাতাল রোডে থাকা অবস্থায় সাকিবের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। পরে তাকে প্রাইম হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন বলে তার বন্ধুদের দাবি। পরে রাতেই তার মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয়।
তবে পুলিশ সকালে সাকিবের বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
এদিকে রাসেল ও টিপু নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। টিপুর অবস্থার অবনতি হলে তাকে মাইজদী প্রাইম হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে আইসিইউতে রাখা হয়। পরে রাত ১টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয় বলে বন্ধুদের সূত্রে জানা গেছে। একই ঘটনায় অসুস্থ আকাশকেও প্রাইম হাসপাতালের আইসিইউ থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানান।
অন্যদিকে, পার্টিতে থাকা সাইফুলও পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বন্ধুদের কাছে তিনি জানান, কথিত ‘মিক্সার’ তিনি পান করেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যরা তাকে এটি পান করতে উৎসাহিত করলেও বোতলটি মুখের কাছে নেওয়ার পর তীব্র দুর্গন্ধ পান এবং সামান্য মুখে নেওয়ার পর তীব্র তেতো স্বাদ অনুভব করে সঙ্গে সঙ্গে তা ফেলে দেন। এরপর তিনি বমি করেন বলেও বন্ধুদের জানান।
সাকিবের মৃত্যুর ঘটনায় সাইফুল আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বলে তার বন্ধুরা জানান। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই ঢাকায় নিয়ে যান। তবে ৪ অক্টোবর সকালে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং তিনি ঢাকা থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় পার্টিতে থাকা শান্ত ‘মিক্সার’ সেবনের পরেও এখন পর্যন্ত সুস্থ আছেন বলেও জানা গেছে।
ঘটনার বিষয়ে রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সুধারাম মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ইদ্রিসুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। এর আগে শনিবার সন্ধ্যার পর সদর উপজেলার কাদিরহানিফ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব লক্ষ্মীনারায়ণপুর (হাঁফারগোড়া) গ্রামের মুসলিম কলোনির মিলনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের মধ্যে এ ঘটনায় শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের বন্ধু ও স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কথিত ‘মিক্সারে’ ঠিক কী কী উপাদান ছিল এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো পদার্থ মেশানো হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অসুস্থদের শারীরিক অবস্থার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে চিকিৎসা প্রতিবেদন ও প্রয়োজনে নমুনা পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ঘটনায় সুধারাম থানায় মামলা প্রক্রিয়াধীন, তবে পুলিশ সাকিবের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কথিত ‘মিক্সারে’ কী ধরনের উপাদান ছিল, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।