ছোট্ট শহর-নোয়াখালী। খুব একটা ঐতিহাসিক চিহ্ন এখানে নেই, কাউকে দেখানোর মতো এখানে কিছু নেই। অথচ একসময় মেঘনার স্তন্যধারায় সঞ্জীবিত, নারকেল-সুপারি, খেজুর, তাল সুশোভিত সমুদ্র শিকড়সিক্ত-সবুজাভ ধানক্ষেতে সমাচ্ছন্ন ছিল। ছোট হলেও তার একটি বিশিষ্ট জীবন-ইতিহাস আছে।
একসময় পরিচ্ছন্ন এবং বসবাসের উপযোগী শহর হিসেবে নোয়াখালী ছিল অনন্য। একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে ওঠে নোয়াখালী। পরবর্তী সময়ে যা পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক নগরীতে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে পর্তুগিজ, স্পেনীয়, ইংরেজ ও আরবীয় স্থাপত্যের বহু ইমারত ও ভবন। নোয়াখালী টাউন হল ছিল জার্মান, গ্রিক ও রোম সভ্যতার মিশ্রণে অপূর্ব স্থাপত্যকলার নিদর্শন। ছিল ঘোড়দৌড়ের মাঠ। ছিল কালেক্টরেট ভবন, জজকোর্ট, পুলিশ লাইন, জেলখানা, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, স্কুল, মাদরাসা। ছিল সুপ্রশস্ত রাস্তা। শহরে যানবাহনের মধ্যে ছিল ঘোড়ার গাড়ি। সুপ্রশস্ত রাস্তার দুধারে ছিল নয়নাভিরাম ঝাউবীথিকা। শহরজুড়ে ছিল নানা ফল আর সুবৃহৎ বৃক্ষের সাজানো বেহেশতি বাগানের মতো উদ্যান। একসময়ের কোলাহলময় ছিমছাম নোয়াখালী শহর—হাজার বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা তিলোত্তমা এ শহর ২০০ বছর ধরে ভাঙাগড়ার খেলা খেলে পঞ্চাশ দশকে শেষবারে যেন হঠাৎই একেবারে এক ঝাপটায় চিরতরে হারিয়ে গেল।
নোয়াখালী শহরের ইতিহাস ভাঙাগড়ার ইতিহাস। শত বছর আগে একটু ঘুরে আসা যাক। জেলার সর্বদক্ষিণের রেলস্টেশন সোনাপুরের মাইলখানেক দক্ষিণে ছিল তখনকার জেলা সদর সুধারাম—ছিল ঐতিহ্যের, ইতিহাসের ও সর্বোপরি গর্বেরও, এখন তা ঠাঁই নিয়েছে স্মৃতির পাতায়।
দুই।
নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ আর এর ভাষা নিয়ে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। নানান মুখরোচক গল্পও প্রচলিত আছে এই জেলাকে ঘিরে। একই সঙ্গে নানা বিদ্রূপ-টিপ্পনীও আছে। এটা তো মানতেই হবে—সারা দেশে তো বটেই, পৃথিবীজুড়ে প্রতাপের সঙ্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নোয়াখালীর মানুষ। এই অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে মিশে গেছে গ্রিক, ইংরেজি, ল্যাটিন, পর্তুগিজসহ নানান ইউরোপীয় ভাষা। সেই সঙ্গে আরবি-ফারসি তো রয়েছে। ফলে নানান ভাষার মিশেল এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের রূপ নিয়েছে ভাষায়।
পূর্ব-দক্ষিণ বাংলার মেঘনা, যেখানে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে, সেখান থেকে নোয়াখালী বেশি দূরে নয়। কিন্তু ভৌগোলিক কারণে কোনো মর্যাদা পায়নি এই শহর। নদীভাঙনে বড় ক্লান্ত এই শহর। তার সমস্ত ঐতিহ্য কেড়ে নিয়েছে নদী।
গত শতাব্দীর ত্রিশ দশক থেকে শুরু পঞ্চাশ দশকে নোয়াখালীর মানুষগুলো আতঙ্কগ্রস্ত জীবন-যাপন করেছে। দিনের পর দিন অস্থিরভাবে তারা আশ্রয় হারানোর আশঙ্কায় অবিাহিত করেছে। সাজানো সংসার, ঘরবাড়ি, ঐতিহ্য আর সভ্যতা ধারণে সুস্থির একটি সুদৃশ্য শহরকে নদীর প্রচণ্ড ছোবল থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের সেকি ব্যাকুলতা!
সর্বনাশা মেঘনা নদী যেন মানুষের সৃষ্টিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাইছে। সর্বনাশার ছিনিমিনি খেলায় দুর্বিষহ হয়ে উঠল হাজারও মানুষের জীবন। নদীর উন্মত্ত উচ্ছ্বাসে শত সহস্র সহজ-সরল জীবনের অবসান ঘটল। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ প্রকৃতির তাণ্ডবে হলো বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত।
আবার বিক্ষুব্ধ প্রকৃতির আঘাতে আঘাতে জীবনের কঠিন রূপের মুখোমুখি হলো এখানকার মানুষ। জীবনকে জানল তারা নতুনভাবে—‘ভাঙন সৃষ্টিকে আটকে রাখতে পারে না’। পৃথিবীর সবুজ সন্তানেরা আবার জীবনের সজীবতার স্পর্শ খুঁজে পায়।
মেঘনার অপরিণামদর্শী গ্রাস এখানকার মানুষকে সংগ্রামী করেছে, প্রত্যয়ী করেছে; কিন্তু আটপৌরে করে রেখেছে। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন এখানকার মানুষ পায়নি। চিরকাল নোয়াখালী অভাগাই থেকেছে।
তিন।
একজন বলছিলেন, ‘হারা জীবন নোয়াখালী শহরে এত হানি কহনো দেহি নাই। এইবার ঝরি বৃষ্টি হইলেই সড়ক ডুবি যায়, বাড়িত হানি উঠে।’ এই কথা নোয়াখালীতে যারা দীর্ঘদিন ধরে বাস করছেন, তাদের সবার। প্রাকৃতিক কারণে শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়নি; হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ আর দুর্বল পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থার জন্য। যত বৃষ্টিই হোক না কেন, এই শহরে পানি জমে থাকত না। এর অন্যতম কারণ, শহরের ভেতরেই ছিল কয়েকটি পানির প্রবাহ। ছাগলমারা খাল বলে একটি খালও ছিল। এ শহরে প্রায় ৫ লাখ মানুষের বাস। ১৬.৬৬ বর্গকিলোমিটারের এ শহরের জনসংখ্যা বাংলাদেশের অন্য শহরের তুলনায় অনেক কম। তারপরও শহরের অবস্থা এমন বেহাল।
নোয়াখালী আজ পানিতে ভাসছে। চারদিকে কেবল পানি আর পানি। এখানকার প্রায় ২২ লাখ মানুষ এখন জলবন্দী। প্রশ্ন হলো কেন? অবিরাম বৃষ্টি, ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং মুহুরী ও ফেনী নদীর পানিতে জেলার ৯ উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সামুদ্রিক ও আবহাওয়া অধিদপ্তর ‘নোয়া’ এ বছর আগস্টে লা নিনা পর্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনাকে ৭০ শতাংশে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ ত্রিপুরা রাজ্য ও ফেনী অঞ্চলের এবারের অতিবৃষ্টি হয়তো এই লা নিনার প্রভাবেই ঘটছে। সেখানে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পানির তোড়ে ভেসে গেছে বহু বাঁধ, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ। রাস্তাঘাট ও ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। স্মরণকালের ইতিহাসে এত ভয়াবহ ফ্লাশ ফ্লাড হয়েছে কি না জানি না।
জলাবদ্ধতা নোয়াখালীর পুরোনো সমস্যা। সামান্য বৃষ্টিতে কেন পানি নেমে যায় না? এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিয়ে গণমাধ্যমে লেখালেখি কম হয়নি। কয়েক বছর ধরে আমরা নানা মাধ্যমে বলে আসছি, এ অঞ্চলে যে ছাগলমারা খালসহ অন্যান্য খালগুলো ছিল সেগুলোর অধিকাংশই ভরাট ও দখল হয়ে গেছে। তাহলে এ পানি যাবে কোথায়? সেগুলো খুলে দেওয়া দরকার। দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। কোনো কর্ণপাত করেনি। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে এ সমস্যা কমার সম্ভাবনা নেই।
নোয়াখালী পৌরসভা দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভাগুলোর মধ্যে একটি। তবে দীর্ঘ বছরেও জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকরি ব্যবস্থা নেননি। কালেভদ্রে কয়েকটি ড্রেনের কাজ করা হলেও সেগুলো নিম্নমানের। হালকা বৃষ্টি হলেও এসব ড্রেন দিয়ে পানি নামতে অনেক সময় লাগে। এ ছাড়া পৌর কর্তৃপক্ষ এ ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার বা কোনো ধরনের তদারকি না করার ফলে বর্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হয় পৌরবাসীকে।
আমি তখন কলেজের ছাত্র, কুড়ি বছর আগের কথা। নোয়াখালী নাগরিক ফোরাম থেকে একটা সেমিনার হয়েছিল, সেখানে আমি স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, জলাবদ্ধতা দূর করতে হবে। রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সেই সময়েও আমরা কলেজে যেতে পারতাম না। তৎকালীন সংসদ সদস্য মো. শাহজাহান বিষয়টি আমলে নিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু কিছু হয়নি। তারপর আওয়ামী লীগ সরকার এলো। কিছু হয়নি। এত বছরে জেলা প্রশাসন, নোয়াখালী পৌরসভা তথা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নাগরিকদের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণ কর নেওয়া হয়। তার বদলে যদি জলাবদ্ধতামুক্ত শহরের সেবাও দেওয়া না যায়, তাহলে অন্যান্য সেবা পাওয়া অসম্ভব হবে। এ ব্যর্থতা আসলে আমাদের, যারা আমরা ভোট দিয়ে তাদের জনপ্রতিনিধি বানাই। যত দোষ নন্দ ঘোষ, আর কী!
কৃত্রিমভাবে যে ড্রেনগুলো আছে, সেগুলো সঠিকভাবে মেরামত করতে পারলে কিছুটা স্বস্তি পাবেন জেলাবাসী। এই ড্রেনেজ সিস্টেম মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ একক কর্তৃত্বে আনতে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ গুরুত্বসহ বিবেচনা করা প্রয়োজন। জলাবদ্ধতা নিরসনে নোয়াখালীর খালগুলো ভূমিকা রাখতে সক্ষম। খালগুলো উদ্ধারে কর্তৃপক্ষকে আরও সোচ্চার হতে হবে।
নোয়াখালী এখনো হয়ে উঠতে পারে আদর্শ জেলা। ইচ্ছেমতো এ জেলাকে সাজানো সম্ভব। এর জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব চাই, চাই দলীয় ভেদাভেদ ভুলে জেলার উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করা। প্রয়োজনে নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। নয়তো দলাদলি হবে, উন্নয়ন হবে না। যদি আমরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে দাবি তুলতে পারি, তাহলে সরকারি সহায়তা বাড়ানো সম্ভব। এতে জেলার জলাবদ্ধতা দূরীকরণসহ অন্য সব নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করাও সহজ হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক সংগঠক