• ঢাকা
  • বুধবার, ২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৩
সর্বশেষ আপডেট : ১৯ মে, ২০২৩

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব সভ্যতার কর্মপ্রণালী চুরি করেছে: ইউভাল নোয়াহ হারারি

কম্পিউটার যুগের শুরু থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) ভয় মানবতাকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। এখনো পর্যন্ত এই ভীতি মূলত মানুষকে হত্যা করা, দাস বানানো অথবা কর্মক্ষেত্রে মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিস্থাপন কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এআই-এর নব নব উদ্ভাবন বা সংযোজন গোটা মানব সভ্যতার অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এক অভিমুখ থেকে হুঁশিয়ারি জানাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাষাকে নিপুণভাবে ব্যবহার করা এবং শব্দ, ধ্বনি অথবা ছবির সাথে ভাষা তৈরির উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর এভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সভ্যতার কর্মপ্রণালী চুরি করে নিয়েছে।

মানবীয় প্রায় সব সংস্কৃতিই মুখ্যত ভাষা দিয়ে নির্মিত। যেমন, মানবাধিকার কিন্তু আমাদের বংশগতিতে খোদাই করা নেই। বরং মানবাধিকার হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক প্রত্নবস্তু। যা আমরা গল্প বলা এবং আইন রচনার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছি। একইভাবে বিভিন্ন ধর্মের দেব-দেবী বা ঈশ্বরেরাও ঠিক শারীরিক বাস্তবতা কিন্তু নন। বরং তারা হলেন সাংস্কৃতিক প্রত্নবস্তু। যাদের আমরা পুরাণ আবিষ্কার এবং পবিত্র গ্রন্থাদি রচনার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছি।

টাকাও কিন্তু এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রত্নবস্তু। ব্যাংক নোটগুলো আসলে নানা ধরনের রঙিন কাগজের টুকরো এবং বর্তমানে ৯০ শতাংশের বেশি অর্থ এমনকি ব্যাংক নোটের আদলেও আর নেই- তারা এখন কম্পিউটারে সংরক্ষিত ডিজিটাল বা সংখ্যাগত তথ্য মাত্র। ব্যাংক কর্মকর্তা, অর্থমন্ত্রী এবং ডিজিটাল মুদ্রা বিষয়ক গুরুদের বলা নানা গল্পই অর্থকে তার এই বিপুল গুরুত্ব প্রদান করে।

কেমন হবে যদি একবার এই অ-মানবীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গল্প বলা, গানের সুর সৃষ্টি, ছবি আঁকা বা আইন ও গ্রন্থাবলী রচনায় গড়পরতা মানুষের চেয়ে ভালো ফল দেখায়? যখন মানুষ চ্যাটজিপিটি এবং অন্যান্য নতুন এআই যন্ত্রপাতি নিয়ে ভাবছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এসব নব্য উদ্ভাবিত সংস্করণগুলো স্কুলের বাচ্চারাও রচনা লেখার কাজে ব্যবহার করবে এমন সব উদাহরণের কথা মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বাচ্চারা যখন সত্যিই চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে রচনা লিখবে, তখন গোটা বিদ্যালয় ব্যবস্থার কি হবে? কিন্তু এ ধরনের প্রশ্নে বৃহত্তর ছবিটি বাদ পড়ে যায়। স্কুলের রচনা লেখার কথা ভুলেই যান। ২০২৪ সালের আসন্ন মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিযোগিতার কথা ভাবুন এবং কল্পনা করার চেষ্টা করুন যে কিভাবে রাজনৈতিক নানা লেখ্য বিষয়বস্তু, মিথ্যা খবর এবং নতুন নানা মতবাদ বা বিশ্বাসের জন্য নতুন নানা গ্রন্থ রচনার কাজে যদি এআই যন্ত্রাদি ব্যবহার করা হয়, তবে তার প্রভাব কতটা বা কি হতে পারে?

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কিউআনন ধর্ম-সম্প্রদায় অন্তর্জালে নানা বেনামী বার্তার চারপাশে সমবেত হচ্ছে এবং এদের ‘কিউ ড্রপস‘ বলা হয়। এই সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এই কিউ ড্রপসগুলোকে পবিত্র পাঠ্য হিসেবে সংগ্রহ, সম্মান এবং ব্যাখ্যা করছে। আমাদের জানা মতে যেখানে অতীতের সব কিউ ড্রপসগুলো মূলত মানুষের হাতেই রচিত হয়েছে, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত তাদের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে, ভবিষ্যতে আমরা ইতিহাসে এমন কোনো সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হতে পারি, যাদের ভেতরে সবচেয়ে সম্মানিত রচনা-বস্তুলো অ-মানবীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে রচিত হয়েছে। গোটা মানবেতিহাসে ধর্মগুলো তাদের পবিত্র গ্রন্থাদির উদ্ভব হিসেবে অ-মানবীয় উৎসকে দাবি করেছে। দ্রুতই এই দাবি একটি বাস্তব ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।

অপেক্ষাকৃত গদ্যময় স্তরে দেখলে, দ্রুতই আমরা নিজেদের অন্তর্জালে গর্ভপাত, জলবায়ু পরিবর্তন অথবা ইউক্রেনে রুশ আক্রমণ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা এমন কোনো কোনো সত্তার সঙ্গে করতে দেখব যাদের আপাতদৃষ্টে মানুষ বলে মনে হলেও বাস্তবে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। মোদ্দা কথা হচ্ছে যে কোনো বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ঘোষিত মতবাদ বদলানোর জন্য আমাদের কালক্ষেপণ করাটা হবে একেবারেই অর্থহীন। যেহেতু এআই তার বক্তব্য এত নিখুঁতভাবে গোছাতে পারে যে উল্টো তার পক্ষেই আমাদের প্রভাবিত করা সম্ভব হবে।

ভাষার উপরে তার দখলের মাধ্যমে এআই এখন মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং আমাদের মতামত ও বিশ্ব বীক্ষাও বদলাতে সক্ষম। যদিও এখনো পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে এআইয়ের কোনো নিজস্ব চেতনা বা অনুভূতি আছে, তবু মানুষের সঙ্গে কৃত্রিম ঘনিষ্ঠতা লালনের ক্ষেত্রে এটাই যথেষ্ট যে এআই মানুষকে তার বুদ্ধি আবেগগতভাবে সংযুক্ত হিসেবে বোধ করাতে পারে।

২০২২-এর জুনে গুগলের এক প্রকৌশলী ব্লেইক লেমোইন প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন- এআই চ্যাটবট লামডা যা নিয়ে তিনি তখন কঠোর পরিশ্রম করছিলেন, চেতনা বা সংবেদন অর্জন করেছে। এই বিতর্কিত দাবি তোলার কারণে তিনি চাকরি হারান। তবে এই গোটা ঘটনায় প্রকৌশলী লেমোইনের এই দাবি তোলাটা সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক বিষয় নয়। যদিও দাবিটি খুব সম্ভবত মিথ্যা ছিল। বরং এআই চ্যাটবট নিয়ে দাবি তুলতে গিয়ে তিনি যে তার দামি চাকরিটি হারানোর ঝুঁকিও নিয়েছেন, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এআই যদি আজ তার জন্য মানুষকে তার চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিতেও উদ্বুদ্ধ করে, তবে এআই মানুষকে আর কি না করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে?

মনন ও হৃদয়ের রাজনৈতিক এক যুদ্ধে, অন্তরঙ্গতা সবচেয়ে দক্ষ অস্ত্র এবং এআই লক্ষ কোটি মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের গণ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। আমরা জানি যে বিগত দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের এআইয়ের সাহায্যে এই রণক্ষেত্র এখন মনোযোগ আকর্ষণ থেকে অন্তরঙ্গতা অর্জনের দিকে বাঁক বদলাচ্ছে। মানব সমাজ ও মানব মনস্তত্বের ক্ষেত্রে কি হবে যখন আমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক অর্জনে একটি এআই আর একটি এআইয়ের সঙ্গে লড়াই করছে এবং এভাবেই দ্রুতই আমরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনীতিককে ভোট দেব কি দেব না বা কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা দ্রব্য কিনব কি কিনব না এসব বিষয়েও এআই আমাদের উদ্বুদ্ধ করবে।

এমনকি ‘কৃত্রিম অন্তরঙ্গতা‘ তৈরি ব্যাতীতও, আমাদের মতামত গঠন ও বিশ্ববীক্ষা নির্মাণে নতুন এআই যন্ত্রাদিরও বিপুল প্রভাব থাকবে। একজন মাত্র এআই পরামর্শকের কাছে সর্বজ্ঞানী দৈব প্রত্যাদেশ ঘোষণাকারী হিসেবে মানুষ আসতে পারে। অবাক হবার কিছু নেই যে গুগল আতঙ্কিত বোধ করছে। মানুষ নেটে সার্চ দেবে কেন যদি ‘ওরাকল‘কে জিজ্ঞেস করেই আমরা সব পাই?

সংবাদ এবং বিজ্ঞাপন শিল্পমাধ্যমগুলোরও আতঙ্কিত হবার যথেষ্ট অবকাশ আছে। মানুষ আর সংবাদপত্র পড়বে কেন যদি ‘ওরাকল‘কে আমি সর্বশেষ সংবাদ বলে দেবার জন্য অনুরোধ করতে পারি? আর বিজ্ঞাপনেরই বা কি দরকার যদি আমি কি কিনতে হবে এ বিষয়ে ‘ওরাকল‘কে জিজ্ঞাসা করেই সব জেনে যেতে পারি? এবং এসব সম্ভাব্যতা যদি সবচেয়ে বড় দৃশ্যটি আমাদের উপহার না-ও দেয়, এখানে যে বিষয়ে আমরা কথা বলতে চাচ্ছি তা হলো এআই-এর হাতে মানব ইতিহাসের শেষ হয়ে যাবার সম্ভাব্যতা। ঠিক ইতিহাসের সমাপ্তি নয়, তবে মানব-নিয়ন্ত্রিত অংশের শেষ হয়ে যাওয়া। ইতিহাস হচ্ছে জীববিদ্যা ও সংস্কৃতির মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়া; আমাদের জৈবিক নানা প্রয়োজন এবং চাহিদা, যেমন খাবার ও যৌনতা আর সাংস্কৃতিক নানা নির্মাণ, যেমন ধর্ম ও আইন- উভয়ের জন্যই আকাঙ্খা বা বাসনা। ইতিহাস হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে আইন ও ধর্ম আমাদের আহার ও যৌনতার চাহিদাকে একটি নির্দিষ্ট আকার দেয়।

কিন্তু আমাদের ইতিহাসের গতিপথের কি হবে যদি এআই আমাদের সংস্কৃতির দখল নেয় এবং গল্প, সুর, আইন ও ধর্ম সৃষ্টি করা শুরু করে? মুদ্রণ ছাপাখানা এবং বেতারের মতো অতীতের যন্ত্রাদি মানবীয় নানা সাংস্কৃতিক ধারণার ছড়িয়ে পড়া বা বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু তারা কখনোই তাদের নিজেদের নতুন সাংস্কৃতিক নানা ধারণা সৃষ্টি করেনি। এআই কিন্তু মৌলিকভাবেই পৃথক। সম্পূর্ণ নতুন নানা ধারণা এবং সম্পূর্ণ নতুন নানা সংস্কৃতি নির্মাণে এআই সক্ষম।

শুরুতে এআই হয়তো মানুষের মৌল ছাঁচ কিছুদিন অনুকরণ করবে যেহেতু এআইয়ের শুরুতে তাকে এ বিষয়েই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তবে প্রতিটি বছর শেষ হবার সাথে সাথে এআই সংস্কৃতি সেই প্রান্ত পর্যন্ত যাওয়ার সাহস করবে যা মানুষ যাওয়ার সাহস কখনো আগে করেনি। সহস্রাব্দ ধরে মানুষ অন্য মানুষের স্বপ্নের অভ্যন্তরে বেঁচেছে। আসছে দশকগুলোয় আমরা নিজেদের হয়তো কোনো আগন্তুক বুদ্ধিমত্তার স্বপ্নের অভ্যন্তরে খুঁজে পাব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয় মানবপ্রজাতিকে বিগত মাত্র কয়েক দশক হলো ভীত করে তুলেছে। কিন্তু হাজার বছর ধরে মানব জাতি আরো গভীরতর এক ভয় দ্বারা তাড়িত হয়ে এসেছে। আমরা সবসময়ই বিভ্রম সৃষ্টি এবং আমাদের মন কাজে লাগাতে গল্প ও ছবির শক্তিকে প্রশংসা করেছি। ফল হিসেবে সেই প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ একটি বিভ্রমের পৃথিবীতে আটকা পড়ার ভয় পেয়ে এসেছে।

সতেরো শতকে রেনে দের্কাতে ভয় পেয়েছিলেন যে সম্ভবত একটি ক্ষতিকর দৈত্য বা দানো তাকে একটি বিভ্রমের পৃথিবীতে বন্দী করেছে এবং যা কিছু তিনি দেখছেন বা শুনছেন তা ওই দানোরই কাজ। প্রাচীন গ্রিসে প্লেটো সেই গুহার বিখ্যাত রূপকের কথা বলেছেন যেখানে একদল মানুষ গুহার ভেতর সারাজীবন ধরে শৃঙ্খলিত এবং তাদের মুখোমুখি রয়েছে এক নিরেট দেয়াল। একটি স্ক্রিন। সেই স্ক্রিনে তারা অভিক্ষিপ্ত নানা ছায়া দেখতে পাচ্ছে। বন্দী মানুষগুলো বাস্তবে যা দেখছে তাকেই ‘বিভ্রম‘ বলে ধরে নিচ্ছে।

প্রাচীন ভারতে বৌদ্ধ এবং হিন্দু সাধকেরা একথা বলে গেছেন যে সব মানুষই মায়া- অথবা বিভ্রমের পৃথিবীতে বন্দী। যা কিছু আমরা বাস্তব বলে ধরে নিই, তা মূলত আমাদের মনের সৃষ্ট নানা কল্পকাহিনী। মানুষ গোটা গোটা যুদ্ধ নামায়, এ ওকে খুন করে এবং শখ করে খুন হতে চায়, যেহেতু তারা এমন বিভ্রমে বিশ্বাস করে। এআই বিপ্লব আমাদের সেই দেকার্তে কথিত দানো বা দৈত্য, প্লেটোর গুহা এবং মায়ার মুখোমুখি করবে। আমরা যদি এখনি সতর্ক না হই, তবে আমরা এই বিভ্রমের পর্দার ভেতর বন্দী হতে পারি, যা আমরা আর ছিঁড়তে পারব না এবং এমনকি বুঝতেও পারব না যে আমরা একটি বিভ্রমের পর্দায় বন্দী।

অবশ্যই এআইয়ের নতুন শক্তি ভালো কাজেও ব্যবহার করা যাবে। আমি এ নিয়ে আর কথা বাড়াব না কারণ যারা এআইকে বিকশিত করার কাজে আছে, তারা এটা নিয়ে অনেক কথাই বলেন। আমার মতো ইতিহাসবিদ ও দার্শনিকদের কাজ হলো বিপদের দিকটা দেখিয়ে দেওয়া। তবে অবশ্যই এআই আমাদের অগণিত নানা উপায়ে সাহায্য করতে পারে। ক্যানসারের নতুন প্রতিষেধক আবিষ্কার থেকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের সমাধান খুঁজতে এআই আমাদের সহায়তা করতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে আমরা নিশ্চিত করব যে নতুন এআই যন্ত্রাদি মন্দের বদলে ভালোর জন্যই ব্যবহৃত হচ্ছে? এ কাজ করতে হলে, আমাদের সর্বাগ্রে এআইয়ের সত্যকারের সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।

১৯৪৫ সাল থেকে আমরা জেনে এসেছি যে পারমাণবিক প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে সস্তা জ্বালানী সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এটা একইসঙ্গে মানব সভ্যতাকে শারীরিকভাবেই বিনাশে সক্ষম। এজন্যই আমরা মানবতা রক্ষায় গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করেছি, একইসঙ্গে নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি যে পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রাথমিকভাবে ভালো কাজেই ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্ত আজ আমাদের গণ-সংহারের কাজে লাগে এমন নতুন সব অস্ত্র তৈরি হওয়া এবং ধ্বংস এবং আমাদের মানসিক ও সামাজিক ভুবন ধ্বংসের সম্ভাবনার সাথে লড়াই করতে হচ্ছে।

আমরা এখনো এআই যন্ত্রাদিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে সেজন্য আমাদের দ্রুতগতিতে কাজ করতে হবে। একটি পরমাণু অস্ত্র যেখানে আরো ক্ষমতাশালী কোনো পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারে না, একটি এআই অধিকতর ক্ষমতাশালী আর একটি এআই বানাতে পারে। এআই-এর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে প্রথম জরুরি বা আশু কর্তব্য হচ্ছে জন পরিসরে শক্তিশালী এআই ছাড়ার আগে কঠোর ভাবে ‘নিরাপত্তা পরীক্ষা’ বা সেফটি চেক করে নেয়া। বাজারে নতুন ছাড়তে যাওয়া ওষুধ বা ড্রাগসের স্বল্প ও দীর্ঘস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করার আগে কোনো ওষুধ কোম্পানি যেমন ওষুধটি জনপরিসরে ছাড়তে পারে না, টেক কোম্পানিগুলোরও নতুন এআই জনপরিসরে ছাড়ার আগে তাই ‘সেফটি চেক‘ করে নেয়া দরকার। নতুন প্রযুক্তির জন্য ‘খাদ্য এবং ঔষধ প্রশাসন’-এর সমতুল্য একটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন এবং তা আজই দরকার সেটা বলব না- এটা গতকালই করা দরকার ছিল।

জনপরিসরে এআইকে কর্মে নিয়োগের গতি হ্রাস করার কারণে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোকে কি কর্তৃত্বপরায়ণ বা স্বৈরাচারী সরকারগুলোর পেছনে ঘষটাতে হবে? বরং উল্টো। কাজে-কর্মে অনিয়ন্ত্রিত এআইয়ের নিয়োগ সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে যা স্বৈরাচারীদের বাড়তি সুযোগ দেবে এবং গণতন্ত্র ধ্বংস করবে। গণতন্ত্র হচ্ছে এক ধরনের আলাপ বা কথা পরম্পরা যা আলাপ-আলোচনা নির্ভর করে ভাষার উপরে। এআই যদি এই ভাষাকেই আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়, তবে আমাদের অর্থপূর্ণ আলাপ-আলোচনা করার ক্ষমতা হারিয়ে যাবে আর এভাবেই গণতন্ত্রও হারিয়ে যাবে।

এখানে এই পৃথিবীতে, আমরা মাত্রই একটি আগন্তুক বুদ্ধিমত্তার মুখোমুখি হয়েছি। আমরা এখনো তার সম্পর্কে বেশি জানি না। শুধু এটুকু ছাড়া যে তারা চাইলে আমাদের সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারে। জনপরিসরে এআইয়ের অ-দায়িত্বপূর্ণ নিয়োগে এখন বিরতি টানা উচিত এবং এআই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার আগে আমাদের তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা উচিত। এবং আমার পরামর্শ হচ্ছে এআই বিষয়ক নীতিমালায় প্রথমেই এটা এআইয়ের জন্য নিজ পরিচয় এআই হিসেবে ঘোষণা দেবার কাজটি আবশ্যিক ভাবেই করতে হবে। যদি আমি কারো সঙ্গে কথোপকথনের পর বলতে না পারি যে- যার সাথে কথা বলেছি সে এআই ছিল বা মানবিক- তবে সেখানেই গণতন্ত্রের শেষ।

লেখক পরিচিতি: ইউভাল নোয়াহ হারারি ইতিহাসবিদ, দার্শনিক এবং ‘স্যাপিয়েন্স‘ ও ‘হোমো দিউস‘ গ্রন্থদ্বয় এবং শিশুদের জন্য লেখা সিরিজ গ্রন্থ ‘অদম্য আমরা‘র রচয়িতা। তিনি ‘স্যাপিয়েন্সশিপ‘ নামে একটি সামাজিক-প্রভাবক প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এই লেখাটি গত ৬ মে ২০২৩ তারিখে ‘দি ইকোনমিস্ট‘ পত্রিকায় আমন্ত্রিত লেখক হিসেবে হারারি লেখেন।

লেখাটি অনুবাদ করেছেন অদিতি ফাল্গুনী।

আরও পড়ুন