• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১লা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

নদী কী উন্নয়নের অন্তরায়? : অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই

সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস পালিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রথম পাতা নদী বিষয়ক সংবাদে পরিপূর্ণ ছিল। উক্ত সংবাদগুলো পর্যালোচনার ভিত্তিতে দেশে নদী বিষয়ক তিন ধরনের সমস্যা প্রকট বলে মনে হয়েছে। প্রথমত নদীর সংখ্যা ও গণনা বিষয়ক বিভ্রান্তি, দ্বিতীয়ত প্রভাবশালী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নদীর দখলজনিত সমস্যা এবং তৃতীয়ত নদীর দূষণজনিত সমস্যা। এর মধ্যে প্রথমটি ব্যতীত দুটি কাজই চলছে কম বেশি উন্নয়নের দোহাই দিয়ে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে নদীকে অক্ষত রেখে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করতে বাধা কোথায়। নদী কী উন্নয়নের কোনো প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করে?

প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। প্রধান প্রধান শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো নদী তীরবর্তী এলাকাতেই বিকশিত হয়েছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, বংশী ও শীতলক্ষ্যার কোলঘেঁষে মহানগরী ঢাকার প্রসার ঘটেছে। একইভাবে কর্ণফুলীকে ঘিরে চট্টগ্রাম, সুরমা তীরে সিলেট, পদ্মার তীরে রাজশাহী, রুপসা ,পশুর, শিবসার পাড়জুড়ে খুলনা, ধানসিঁড়ি-কীর্তনখোলার তীরে বরিশাল, ভৈরবের কোলজুড়ে যশোর, করোতোয়া বিধৌত বগুড়াসহ বড় বড় শহরগুলোর গোড়াপত্তন নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু কথিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আড়ালে দখল দূষণজনিত অপকর্মে বর্তমানে অধিকাংশ নদীর স্বাস্থ্য যেমন ভালো নেই, তেমনি ভালো নেই নদী তীরবর্তী জনপদগুলো।

নদী তীরবর্তী এলাকায় কখনও আবর্জনা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। কখনও স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করে ব্যবসাকেন্দ্র, বিপনিবিতান, আবাসন প্রকল্প ও নানান ধরনের ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা হচ্ছে। দখলের এই কর্মযজ্ঞে বেসরকারি প্রভাবশালীরা যেমন জড়িত তেমনি সরকারি সংস্থাগুলো ও কখনও কখনও জড়িত হয়ে পড়ছে। দখলের পরিচিত কৌশল হচ্ছে প্রথমে অস্থায়ী ঘের তুলে আবর্জনা ফেলে ভরাট করা। পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে রাতারাতি স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা। পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের ভাষ্যমতে ঢাকা শহরে রাজউক নিজেই জলাশয় ভরাট করে হাউজিং করছে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজের ভাষ্যমতে ঢাকা শহরে পুকুর, বিল ও লেক রয়েছে ৩২৭টি। এর মধ্যে পুকুর ও বিল ২৪১টি এবং লেক রয়েছে ৮৬টি। ৬টি লেক সরকারের দখলে এবং ৭৯টি বেসরকারি দখলদারদের কবলে রয়েছে। সবকিছুই করা হচ্ছে উন্নয়নের নামে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকায় জলাধার ও জলাভূমি ছিল ৩০.২৫ বর্গকিলোমিটার। এখন আছে ৪.২৮ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ গত ২৮ বছরে ঢাকার ৮৬ শতাংশ জলাধার ভরাট হয়ে গেছে।

উল্লেখ্য যে, এর মধ্যে পুকুর, খাল, বিল যেমন রয়েছে, তেমনি নদীর অংশও রয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৯ অনুসারে, দেশে নদী দখলদারের সংখ্যা ৫৭ হাজার। নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদারের তথ্য অনুসারে ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৩ হাজার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে নদী দখলদারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ১১ হাজার ২৪৫ জন, সিলেট বিভাগে দখলদারের সংখ্যা সবচেয়ে কম ২ হাজার ৪৪ জন। ঢাকা বিভাগে দখলদারের সংখ্যা ৮ হাজার ৮৯০ জন। বলা বাহুল্য অন্যান্য বিভাগেও নদী দখলের চিত্র প্রায় একই রকম (অবশ্য নদী দখলদারদের এই সংখ্যা, গণনার পদ্ধতিগত ভুলের কারণ দেখিয়ে পরবর্তীতে ওয়েবসাইট থেকে অপসারণ করা হয়েছে)। নদী দিবসের সংবাদ চিত্রে এরকম কয়েকটি সংবাদ হচ্ছে, ‘চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদী দখল করে ড্রাইডক তৈরি’, ‘সিলেটে সুরমা নদী দখল করে স্থাপনা তৈরী’, ‘বগুড়ায় করতোয়া নদী দখল করে ইকোপার্ক তৈরীর প্রচেষ্টা’, ‘টঙ্গীতে তুরাগ দখল করে শিল্প স্থাপনা নির্মাণ’, ‘বরিশালে কীর্তনখোলায় অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা’, ‘কক্সবাজারে বাকখালি নদীর তীরবর্তী ৬০০ হেক্টর প্যারাগন দখলের মহোৎসব’, ‘ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের নয়ারহাট বাজার থেকে সাভার পর্যন্ত বংশী নদী দখলের প্রতিযোগিতা’ প্রভৃতি। দেশব্যাপী নদী দখলের মহোৎসবে এই চিত্র নিতান্তই সামান্য।

উন্নয়নের নামে নদী ব্যবহারের আর একটি ভয়াবহ ফলাফল হচ্ছে নদী দূষণ। যুগ যুগ ধরে আমরা বর্জ্য নিক্ষেপের স্বাভাবিক আধার হিসেবে নদীকে ব্যবহার করছি। গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে শুরু করে পয়ঃবর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্যের নব্বই শতাংশই নদী বক্ষে নিক্ষিপ্ত হয়। ফলে নদীগুলো কঠিন, তরল ও প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দূষণের কারণে অধিকাংশ নদীতে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী বেঁচে থাকার পরিবেশ নেই। এমনকি নদীর পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের উপযোগিতাও হারাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ পরিসংখ্যান ২০২০ গ্রন্থে ‘রিভার এন্ড ওয়াটার প্যারামিটার ২০১১-২০১৬’ শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশের ২৭টি নদীতে ১১টি প্যারামিটারের (ph ,DO, BOD, COD, TDS, EC, SS, Chloride, total alkalineity, turbidity ,salanity) ভিত্তিতে পরিচালিত জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু একটি প্যারামিটার ‘দ্রবীভূত অক্সিজেন’ (DO) এর ভিত্তিতে নদীগুলোর পানির প্রাপ্ত মান পর্যালোচনায় ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, শুষ্ক মৌসুমে কোনো কোনো নদীর পানিতে DO এর মান শূন্যে নেমে এসেছে। যেখানে সারফেস ওয়াটারের আদর্শ মান ৩.৫- ৭.৫ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালে শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গা নদীতে DO এর মান ছিল যথাক্রমে ০, ‘৪৫, ০, ০, ০, ০ মিলিগ্রাম প্রতি লিটারে যা অবিশ্বাস্য। জরিপকৃত ২৭টি নদীর মধ্যে DO এর ভিত্তিতে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে যথাক্রমে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা, ময়ূর ও করতোয়া নদী। উল্লেখ্য যে, এই অবস্থায় উক্ত নদীগুলোতে জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকার কথা নয়। অর্থাৎ জলজ উদ্ভিদ, প্রাণী, মাছ, ব্যাঙ, সাপ, পোকামাকড় মরে যাওয়ার কথা। অন্য প্যারামিটারগুলোর বিশ্লেষণেও কম বেশি একই চিত্র দেখা গেছে। এই ভয়াবহ দূষণের কারণ হিসেবে ‘বাংলাদেশ ডেলটা প্ল্যান-২১০০’ ভলিউম-১ এ ট্যানারি শিল্প, ফেব্রিক ডায়িং অ্যান্ড কেমিক্যাল প্রসেসিং, ফেব্রিক ওয়াশিং, গার্মেন্টস, প্লাস্টিক প্রোডাক্টসহ অন্যান্য শিল্প কারখানার অপরিশোধিত কঠিন ও তরল বর্জ্য এবং মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্যকে দায়ী করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার আশেপাশে ৮০ থেকে ১০০টি কারখানা প্রতি সেকেন্ডে আনুমানিক ৬০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নদীতে ফেলে। বলা যায় এই বিপুল দূষণের সবকিছুই উন্নয়নজনিত উপজাত।

২০২২ সালে দেশের ৫৬টি নদীর উপরে রিভার আ্যন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) কর্তৃক পরিচালিত জরিপের ফলাফল বলছে, দেশের এক-তৃতীয়াংশ নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার। নদীর পানিতে ডিজলভ অক্সিজেন (DO), বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) ও কেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (COD) এর পরিমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা জরিপ পরিচালনা করেছেন। ফলাফল বলছে, জরিপ চালানো ৭০ শতাংশের পানির গুণগত মানের প্রতিটি নিয়ামকের পরিমাণ আদর্শ মানদণ্ডের মাত্রার চেয়ে বেশি। অবশিষ্ট ৩০ শতাংশের পানির মান ভালো হলেও সবগুলোতে প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্যের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্য পাওয়া নদীগুলো হলো- বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, তুরাগ, বালু, টঙ্গীখাল, বংশী (গাজীপুর, টাঙ্গাইল), লোয়ার বানার (ময়মনসিংহ, গাজীপুর), চিলাই (গাজীপুর), খিরু (গাজীপুর), শিলা (গাজীপুর), লবনদহ (গাজীপুর), পুরাতন ব্রহ্মপুত্র (গাজীপুর ,নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী), সুতিয়া (গাজীপুর, ময়মনসিংহ), কর্নতলী (সাভার), বংশী (সাভার), ইছামতি (মুন্সীগঞ্জ), হাড়িধোয়া (নরসিংদী), তিতাস (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম), হালদা, নাফ, বাকখালি (কক্সবাজার), মাতামুহুরী (কক্সবাজার), ফেনী, সুরমা (সিলেট), খোয়াই (সিলেট), সুতাং (সিলেট), মেঘনা, কড়াংগি (হবিগঞ্জ), যাদুকাটা (হবিগঞ্জ অংশ), পশুর (খুলনা), ভৈরব (খুলনা, যশোর), রুপসা (খুলনা), সোনাই (বরিশাল,পটুয়াখালী), কাঠি, কীর্তনখোলা, সন্ধ্যা, পায়রা, বিষখালী, ভোলা খাল, রাবনাবাদ, আন্ধারমানিক, খাপড়াভাঙ্গা, বলেশ্বর, চিত্রা (নড়াইল), মাথাভাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা), ময়ূর (কুষ্টিয়া), আত্রাই (নওগাঁ), করোতোয়া (বগুড়া), ঘাঘট (রংপুর), আলাইকুড়ি (রংপুর), ও শ্যামাসুন্দরী খাল (রংপুর)।

উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত ব্রিজ, কালভার্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণ নদীগুলোর মৃত্যুর জন্য অনেকাংশের দায়ী। দক্ষিণাঞ্চলের ভবদহের জলাবদ্ধতা এবং কপোতাক্ষ, মুক্তেশ্বরী, টেকা ও হরি নদীর নাব্যতা হারানোর অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয় অপরিকল্পিত স্লুইস গেট নির্মাণকে। অনুরূপভাবে করোতোয়া নদীর মূল প্রবাহের নাব্যতা হারানোর কারণ বলে মনে করা হয় ১৯৮৮ সালে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের খুলশীতে স্লুইসগেট নির্মাণকে। আবার ভুল নকশায় অপরিকল্পিতভাবে কম উচ্চতার সেতু নির্মাণ করলে নৌযান চলাচল ব্যাহত হতে পারে এবং নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলশ্রুতিতে নদী নাব্যতা হারাতে পারে। সম্প্রতি যশোরের ৪টি নদীতে (ভৈরব, বেতনা, চিত্রা, মুক্তেশ্বরী) ৯টি কম উচ্চতার সেতু নির্মাণের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে (সূত্র: প্রথম আলো,২৪/০৯/২০২৩)। সবই করা হচ্ছে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে।

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করে নদীতে মৎস্য চাষের মাধ্যমে আর এক ধরনের সর্বনাশা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে দেশব্যাপী। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করছে এবং কোনো কোনো কৃষি ব্যক্তিত্ব এ ধরনের মৎস্য চাষের সক্রিয় প্রচারণায় লিপ্ত রয়েছেন। এর ফলে নদী দখল করে মৎস্য চাষ উৎসাহিত হচ্ছে। নদীতে নাব্যতা সংকট দেখা দিচ্ছে এবং প্রভাবশালী দখলদার মৎস্য ব্যবসায়ীদের কারণে সাধারণ কৃষকদের সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে এভাবে নদীতে মৎস্য চাষ ক্রমশ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে, নরসিংদীতে মেঘনার শাখা-প্রশাখায় এবং দক্ষিণাঞ্চলে এটা এখন পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী নদী দখল করে মৎস্য চাষের একটি খারাপ উদাহরণ হতে পারে বাগেরহাটের হোজির নদী। নদীর স্বাস্থ্যের জন্য এটা কতটুকু উপযোগী ভেবে দেখা যেতে পারে।

ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রধান সমস্যা হচ্ছে অপ্রতুল পানির প্রাপ্যতা। পানির সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় স্রোতের অভাবে নদীগুলো ভার বহন করতে পারছে না। ফলে নদীখাত সহজেই পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। মুমূর্ষু প্রায় নদী খাতে উন্নয়ন দখলদারদের দৌরাত্ম্যে বর্জ্য নিক্ষেপ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির ফলে নদীখাত ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিউনিসিপ্যালিটির দূষণ ও শিল্প কারখানার তরল দূষণ। সব মিলিয়ে দখল-দূষণে নদীগুলো মৃতপ্রায় সত্তায় পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা নিরসনের জন্য ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি রায়ে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করে দেশের নদ-নদী রক্ষায় প্রতিরোধমূলক ১৭টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খসড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ এ বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনের লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব ১ বছর কারাদণ্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। আবার পানি প্রবাহে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতিসাধন করার চেষ্টা করা হলে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য নদী দখলদারদের চিহ্নিত করা যেমন কঠিন, তেমনি চিহ্নিত দখলদারদের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগও হতে দেখা যায় না। আবার নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর অভিভাবক ঘোষণা করা হলেও নদী রক্ষায় নদী কমিশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা নেই। নদী রক্ষা কমিশন শুধু দখলদারদের তালিকা ও সুপারিশ করতে পারে। অভিযোগ রয়েছে নদী রক্ষা কমিশন সুপারিশ করার পরেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারেরই কোনো সংস্থা দখলদারদের অন্যায় সুবিধা দিয়েছে অথবা অভিযোগ থেকে দখলদারদের মুক্তি দিয়েছে। এক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের জায়গা দখল করে পাওয়ার প্লান্ট তৈরির প্রচেষ্টা একটা অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে। আবার দখলদারদের তালিকা তৈরির কাজ একটা পদ্ধতিগত বিতর্কে আটকে আছে। এটি সিএস , আরএস, নাকি বিআরএস খতিয়ান অনুযায়ী করা হবে সে বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে ঐক্যমত্য নেই। ফলে দখলদারদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। আর দখলদারদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে না পারলে নদীর জায়গা দখলমুক্ত করাও সম্ভব নয়। দখলদারদের চিহ্নিত করতে তাই নদী রক্ষা কমিশন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।

নদীর পানি দূষণ রোধের একটি খারাপ উদাহরণ হিসেবে হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প সাভারে স্থানান্তরের কথা বলা যায়। বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধের প্রক্রিয়া হিসেবে এটা করা হয়েছিল। কিন্তু ইটিপি সক্রিয় না করা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার কারণে দূষণ রোধের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। সেখানে ধলেশ্বরী নদী ও বুড়িগঙ্গার মতো একইভাবে দূষিত হচ্ছে। তাই নদীর পানি দূষণ রোধে দেশব্যাপী নদী দূষণের উৎস চিহ্নিত করতে হবে। শিল্প কারখানাগুলোতে ইটিপি স্থাপন করতে হবে। মিউনিসিপাল বর্জ্যের মিশ্রণ রোধে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করতে হবে। এরপরও কোনো প্রতিষ্ঠান পানি দূষিত করলে দূষণের পরিমাণ নির্ধারণ করে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর গ্রিন ট্যাক্স আরোপ করা যেতে পারে এবং সেই অর্থ পরবর্তীতে নদীর দূষণ রোধে ব্যবহার করা যেতে পারে।

নদীর সুস্থতার ওপর অববাহিকা এলাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষার মাধ্যমে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করায় নদীর ভূমিকা অপরিসীম। মৎস্য সম্পদের আধার হিসেবে নদী কাজ করে। সেচের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনে সচলতা এবং জল পরিবহনের মাধ্যমে অর্থনীতির গতিশীলতা বৃদ্ধি করতে নদীর জুড়ি মেলা ভার। সর্বোপরি পরিবেশের সজীবতা রক্ষায় নদীর একটি নান্দনিক গুরুত্ব ও রয়েছে। তাই নদী ধ্বংস করে, নদীকে গ্রাস করে, নদীকে দূষিত করে উন্নয়ন নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ অক্ষুণ্ন রেখে, নদীর জীবন্ত সত্তা বজায় রেখে যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

আরও পড়ুন