
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : সোনাইমুড়ী পৌর এলাকায় ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অপপ্রচার, পরকীয়া সম্পর্ক এবং মাদক বিক্রির বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ এনে সোনাইমুড়ী থানায় পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন দুই পক্ষ।
গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যার পর উপজেলার নাওতলা মুন্সী বাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওইদিন রাত ৮টার দিকে নাওতলা মুন্সী বাড়ির লালু মিয়ার চায়ের দোকানের সামনে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা থেকে মারামারির সূত্রপাত হয়। ফেসবুক আইডি হ্যাক ও এলাকায় মাদকসংক্রান্ত পুরোনো বিরোধের জের ধরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এক পক্ষের অভিযোগকারী মোশারফ হোসেন সোনাইমুড়ী থানায় মোহাম্মদ শরীফ, মো. মাসুম, মো. আসিফ, মো. রাজন, বাবলুসহ ৮-১০ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে মোশারফ হোসেন দাবি করেন, ২০১৮ সালে তার ‘Mosharof Hossain’ নামের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়। সম্প্রতি ওই আইডি ব্যবহার করে এলাকার বিভিন্ন নারী ও মেয়েদের অশালীন বার্তা পাঠানো এবং তার বিরুদ্ধে কুৎসা ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি তার প্রতিবেশী ও বন্ধু মোহাম্মদ শরীফকে সন্দেহ করে প্রতিবাদ জানান। পরে শরীফ তাকে মুঠোফোনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় মোশারফ চায়ের দোকানের সামনে গেলে বিবাদীরা তার ওপর হামলা চালায়। তার চিৎকার শুনে ভাই তাজুল ইসলাম (৩০) এগিয়ে এলে প্রতিপক্ষের লোকজন লোহার রড দিয়ে আঘাত করে তাকে মাথায় গুরুতর জখম করে।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় পক্ষের অভিযোগকারী মো. শামীম (২৪) মোশারফ হোসেন, নূর হোসেন নুরা, মো. মারুফ, মো. মাহিন, মো. তাজুল ইসলাম কালা, ইমন, রিপন, সাইফুল ইসলামসহ ৮-১০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
শামীমের অভিযোগ, বিবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তার ভাই শরীফুল ইসলাম মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
অভিযোগে শামীম আরও দাবি করেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তার বড় ভাই শরীফুল ইসলাম (২৬) ও তার তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সনিয়া আফরিন রিজবী (১৯) চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে চায়ের দোকানের সামনে বিবাদীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাদের পথরোধ করে হামলা চালায়। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীফুলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে জানা যায়, মোশারফ হোসেন ও শরীফুল ইসলাম একই এলাকার বাসিন্দা এবং একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। শরীফুলের জেঠাতো বোন শ্রাবনীর সঙ্গে মোশারফের কথিত প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
এদিকে, ২০১৮ সালে মোশারফের হ্যাক হওয়া ফেসবুক আইডি থেকে শ্রাবনীসহ স্থানীয় কয়েকজন নারীর ছবি পোস্ট করা হয় বলে জানা গেছে। বিষয়টি স্থানীয় বাসিন্দা তামিম মোশারফকে জানান। এ সময় মোশারফ তার আইডি হ্যাকের সঙ্গে শরীফুল জড়িত থাকতে পারেন বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।
পরে তামিম শরীফুলকে বিষয়টি জানালে তিনি মোশারফের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন। এ সময় তাদের মধ্যে গালিগালাজ ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় বলে জানা গেছে। পরে সন্ধ্যার পর স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মুন্সী বাড়ির দরজার চায়ের দোকানের সামনে শরীফুল ও মোশারফের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় পরিবারের স্বজনরাও এতে জড়িয়ে পড়েন।
সংঘর্ষের খবর পেয়ে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর গুরুতর আহত কয়েকজনকে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত ব্যক্তি চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তামিমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দুই পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তামিম উভয় পক্ষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কী উদ্দেশ্যে তিনি এমন ভূমিকা নিয়েছেন, সে বিষয়ে তার কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তবে মোশারফ ও শরীফুলের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে তামিমের মাধ্যমে তাদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ানোর অভিযোগের বিষয়টি উঠে এসেছে। এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, নাওতলা মুন্সী বাড়ির সংঘর্ষের ঘটনায় দুই পক্ষের পৃথক লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :