
স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি, ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র ও বৈষম্যমুক্ত পৃধিবী গড়ার জন্য বিশ্বসম্প্রদায়ের সম্মিলিত অঙ্গীকার। এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণাসহ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০২৫ সালে এসডিজি বাস্তবায়নে এক দশকের মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে বিশ্ব। কিন্তু অর্জনের ধীর গতি আশাহত করছে বিশ্ববাসীকে। অধিকাংশ দেশই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে। জাতিসংঘের এসডিজি প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশ এসডিজি উন্নয়ন সূচকে ৬৫.৯ পয়েন্ট নিয়ে ১০১ ধাপে রয়েছ, যা ভারত (৬৩.৫) ও পাকিস্থানের (৫৯.০) চাইতে ভালো কিন্তু শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দৈানেশিয়ার চাইতে অনেক পেছনে। নাগরিক সমাজ সন্দিহান, গতানুগতিক ধারায় চললে বাংলাদেশ এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য পূরন করতে বড় কোন সাফল্য পাবে কিনা, যদিনা আমরা নীতি কৌশল নিয়ে নতুন করে না ভাবি। বিগত বছরগুলোতে অতিমারী, জলনবায়ু সংকট ও যুদ্ধ বিগ্রহ সহ নানামূখী বৈশ্বিক সংকট এসডিজির অর্জনকে বাধাগ্রস্থ করেছে। লক্ষ্য ছিল কাউকে পেছনে ফেলে নয়, বরং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জলবায়ু সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে সবার বসবাসের জন্য একটি সমৃদ্ধ কিন্তু বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়া তোলা। সেই স্বপ্নপূরনের যাত্রাপথে বর্তমানের চ্যালেন্জ অনেক বড়ো। প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও উদ্যোগহীনতা সর্বোপরি নয়াউদারবাদী উন্নয়ন দর্শন সংকটকে আরো গভীর করছে। দেশে দেশে বিপন্নতার মুখোমুখি আজ শ্রমজীবি মানুষ, প্রান্তিক কৃষীজীবি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী, আদিবাসী সম্প্রদায়, জলবায়ু উদ্বাস্তু সহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
২০২৩ জুলাই শেষে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষন করে জাতিসংঘের সেক্রটারী জেনারেল বলেছিলেন এসডিজির ১৭টি অভিষ্ট অর্জনে শুধুমাত্র ১৫% সঠিক গতিপথে রয়েছ। পিছিয়ে পড়া সত্বেও জাতিসংঘ বলেছে ২০৩০ এর মধ্যে ৬৩% পর্যন্ত পৌছানো সম্ভব, যদি প্রয়োজনীয় গতি আনতে বিশ্ব নেতৃত্ব রাজী হয় এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। জাতিসংঘের আশঙ্কা, সংকট আরো বাড়বে, যদিনা এসডিজি বাস্তবায়নে গতি বাড়িয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া যায়। সার্বিক সংকট বিবেচনায়, সমাধানের পথ অন্বষনে আগামী ২২-২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে জাতিসংঘের উদ্যোগে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সামিট ফর ফিউচার। ধারাবাহিকভাবে ২৪ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বনেতৃবৃন্দ মিলিত হচ্ছেন জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের সভায়। এই সময় দেশে দেশে নাগরিক সমাজ এসডিজির অগ্রযাত্রা পর্যালোচনায় মিলিত হচ্ছে। নাগরিক সমাজের বৈশ্বিক প্লাটফর্ম গ্লোবাল এ্যাকশন এগেনইস্ট পভার্টি – জিক্যাপ দেশে দেশে আয়োজন করছে পিপলস এসেম্বলী বা জনসম্মিলন।
ক্ষুধা, দারিদ্র ও বৈষম্য মুক্তি; অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা :
ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশ্ব ১৫ বছর পিছিয়ে গেছে, জাতিসংঘের স্টেট অফ ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০২৩ সালে ৭১৩ থেকে ৭৫৭ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধার মুখোমুখি হয়েছিল, যা বিশ্বের প্রতি ১১ জনের মধ্যে একজনের সমান। এশিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্য এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সাম্প্রতিক বৃদ্ধির কারণে এটি আরও বেড়েছে। পুষ্টি এবং প্রাপ্যতা, জমি ও খাদ্যের উপর কৃষকদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং খাদ্য বাণিজ্যের যে সকল সমস্যা মানুষের অধিকারকে ক্ষুন্ন করে তা সমাধান করার মাধ্যমে মানুষের খাদ্যের অধিকারের সংজ্ঞার আওতা সম্প্রসারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রমবধর্মান অর্থনৈতিক বৈষম্য উদ্বেগজনক পর্যায়ে। বিশেষ করে প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য, যারা সুযোগ এবং সম্পদে অভিগম্যতা পাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত। যাদের জীবন ও জীবিকা প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেন্জের মূখোমুখি। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশে দারিদ্র হ্রাসে অর্জিত অগ্রগতিকে ব্যাপক ঝুঁকিতে ফেলেছে। যার প্রভাব গ্রাম থেকে শহরের সর্বত্র। দেশে দারিদ্রের হার শহর এলাকায় ১৮.৭% এবং গ্রাম এলাকায় ২০.৫% যা ২০১৬ সালের তুলনায় সামান্য কমেছে এবং বর্তমানে একযায়গায় দাড়িয়ে আছে। দারিদ্রে এই হার ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে বিরাট বাধা।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ভালো, বিগত বছরেও ৭.৩% প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে, কিন্তু সম্পদের ব্যাপক অসম বন্টন সমাজে আয় বৈষম্য সহ অপরাপর বৈষম্যকে তীব্রতর করেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, বানিজ্য ভারসাম্যহীনতা, নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি, সম্পদের কেন্দ্রীভবন ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে অসমতা বাড়ছে প্রতিদিন। অতি ধনী বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন পৃথিবীতে প্রথম এবং ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে তৃতীয়। সবচেয়ে দ্রুততম গতিতে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি, শীর্ষ ধনীদের কাছে সম্পদের পরিমান কেন্দ্রীভুত হবার পরিসংখ্যান মারাত্বক অসমতাকে নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ১০% মানুষ ৪১% সম্পদ নিয়ন্ত্রন করে এবং দরিদ্র ১০% মানুষ মাত্র ১.৩১% সম্পদের অধিকারী। গিনি গুনাঙ্ক অনুযায়ী ২০১০ সালে বৈষম্য ছিল ০.৪৬, যা ২০২২ সালে ০.৫৭ এ উন্নীত হয়েছে। বৈষম্য উর্ধমূখী, যা এসডিজির কাঙ্খিত বৈষম্য হ্রাস প্রক্রিয়াকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। তাই দারিদ্র মোকাবেলায় নতুন কৌশল, অসমতা কমানোর সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরী।
সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা :
পিছয়ে পড়া বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা, দারিদ্র ও অসমতা হ্রাসকরণ সহ সম্পদের পুনবন্টন নীতি ২০৩০ এর মধ্যে এসডিজি অর্জনের বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করবে। সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সমাজে মানবিক সংহতি তৈরির প্রধান উপাদান। বিশেষভাবে নারী, শিশু, বয়স্ক নারী পুরুষ, ভাষমান বেদে সম্প্রদায়, তুতীয় লিঙ্গের মানুষ, জেলে ও ঝুকিপূর্ন কাজে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। বর্তমানে ১১৫টি সামাজিক নিরাপত্বা কর্মসুচির মাধ্যমে জিডিপির প্রায় ২.৫% বরাদ্ধ দেয়া হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে এ খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। প্রস্তাবিত বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৭%। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছ সামাজিক সুরক্ষা ব্যায়ের মধ্যে, সরকারী কর্মচারীদের পেনশনসহ অন্যান্য অনেক খাতের অর্থ যুক্ত করার হিসাব নিয়ে। প্রকৃত বঞ্চিত বা অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য বরাদ্ধের পরিমাণ মর্যাদাপূর্ন জীবনমান অর্জনের মানদন্ড অনুযায়ী এবং বর্তমান বাজার মূল্যর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার। এছাড়াও ত্রুটিপূর্ন পেনশন স্কীমের সংস্কার করে সর্বজনীন স্কীম করা দরকার যা সকল মানুষের জন্য কার্যকর হবে। হতদরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক নিরাত্তা বেষ্টনি আওতায় বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও দুঃস্থ মহিলা ভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। বতর্মান বাজেট ক্রমবর্ধমান বিপদাপন্নতা মোকাবেলাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী করে তুলেছে। তাই প্রান্তিক মানুষের বিপদাপন্নতা দূরীকরণে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং এর আওতা সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা
সবার জন্য নিখরচায় বা স্বল্প মূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হলো সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মূলনীতি। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবাগ্রহীতার চিকিৎসা খরচের প্রায় ৬৯% নিজ পকেট থেকে যায়। এসডিজির লক্ষ্য-৩ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে এ ব্যয় ৩০% এ নামিয়ে আনতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সঠিক নীতি কৌশল, জনগনের আকাঙ্খা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবার গুনগত মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় জনবল ও উপযুক্ত নেতৃত্বে তৈরি। দেশের গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো অপর্যাপ্ত হলেও, যা রয়েছে তাতে স্বাস্থ্যসেবাকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করা সহজ। কম্যুনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সহ উপজেলা হাসপাতাল যে সুবিধিদি রয়েছে তা কম নয়, কিন্তু নেই লোকবল তথা ডাক্তার ও চিকিৎসা কর্মী। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তর আলাদাভাবে কাজ করায় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছেনা, সম্বয়হীনতা ও অপচয় বেশী হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্ধ অপ্রতুল, যা জিডিপির মাত্র ২.৩৬%। সাধারনভাবে স্বাস্থের জন্য অর্থায়নের মানদন্ড জিডিপির ৫% আবশ্যক। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাউকে পিছনে না ফেলে সকলের জন্য রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ভিত্তিক সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দরকার।
জলবায়ু সংকট :
পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি দায়ী হলেও এর জন্য বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট চরম আবহাওয়া, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘুর্নীঝড়, জলোচ্ছাস, নদীভাংগন, জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগ সহ বিভিন্ন কারনে প্রান্তিক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে শতশত পরিবার। জলবায়ু বাস্তুচ্যুত বা ক্লাইমেট ইমিগ্রেন্ট জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিপূরন দিতে অস্বীকার করছে আবহাওয়া দূষনকারী ধনী দেশসমুহ। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র ০.১৭% শতাংশ। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান এখনো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৭ টি দেশের মধ্যে (জার্মান ওয়াচ, ২০২২), জলবায়ু সংকটের জন্য বাংলাদেশের দায় অতি সামান্য। এখনো পর্যন্ত ভুক্তভোগী দেশসমূহকে পরিবেশ ক্ষতিপূরনের দাবী ধনী দেশগুলো মেনে নিচ্ছেনা। জাতিসংঘের লস এন্ড ডেমেজ নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশের জলবায়ু ক্ষতিপূরন দাবিতে আন্তজাতিক আন্দোলন জোরদার করা দরকার। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল সহ জলবায়ু ঝুকিপূর্ণ অঞ্চলসমূহে মানুষের বিপদাপন্নতা ও দুর্গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানির লবণাক্ততা বাড়ছে, ফলে সুপেয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বিআইডিএস গবেষণায় উঠে এসেছে, ওইসব অঞ্চল থেকে মানুষ শহরে চলে আসছে এবং একই সঙ্গে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে শহরেও। জলবায়ু মোকবেলায় রেজলিয়েন্স তৈরিতে সক্ষমতা অর্জনের জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক কার্যক্রমে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন ভুক্তভোগী মানুষের জন্য।
বৈদেশিক ঋন ও দেনা সংকট :
বর্তমান ঋণ ও বৈদেশিক দেনা পরিস্থিতি মানবিক সংকট তৈরি করছে অনেক দেশে। বাংলাদেশ সহ অনেক দেশ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ব্যায়ের চাইতে বৈদেশিক ঋণের সূদ ও কিস্তি পরিশোধে বেশি অর্থ ব্যয় করছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ আমাদের আন্তঃবিভাগীয় ঋণ সংকট সমাধানে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না, বরং তাদের শর্ত ও নীতি জনগণের সংকট ও দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে বলে নাগরিক সমাজ মনে করে। পাশাপাশি ধনী দেশ ও পুরোনো ঔপনিবেশিক শক্তি তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের ঐতিহাসিক দায় দেনা পরিশোধের দাবী আমলে নিচ্ছে না। এছাড়াও জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য দায়ী দেশসমূহ, পরিবেশগত দেনা পরিশোধের বদলে নতুন নতুন ঋন দিয়ে যে সংকট তৈরি করছে, তার ভুক্তভোগী তৃতীয় বিশ্বের সাধারন মানুষ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যায় সংকোচন করে ঋন পরিশোধ করে যাচ্ছে। নাগরিক সমাজ দেশে দেশে এরকম জনস্বার্থ বিরোধী বৈদেশিক দেনা মুক্তির দাবী জানাচ্ছে।
কর সুবিচার :
বাংলাদেশের কর ব্যাবস্থা অধোগতিশীল। এটি এমন এক ধরণের কর যা আয় নির্বিশেষে আদায় করা হয়, এতে নিম্ন ও উচ্চ-আয়ের উপার্জনকারীরা একই পরিমাণ অর্থ প্রদান করে। এই জাতীয় কর উচ্চ-আয়ের উপার্জনের চেয়ে স্বল্প-আয়ের উপার্জনকারীদের উপর একটি বড় ভার হয়ে দাঁড়ায়। একটি প্রগতিশীল কর ব্যবস্থায়, সর্বনিম্ন আয়ের লোকেরা কর অবকাশ পায় যখন সর্বোচ্চ আয়ের লোকেরা সর্বোচ্চ কর দেয়। করের দায় ব্যক্তির আয়ের সাথে বৃদ্ধি পায়। এটি অর্থ প্রদানের ক্ষমতার নীতির উপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমাদেরর কর ব্যাবস্থায় প্রত্যক্ষ কর ৩০% এর মতো যা দক্ষিন এশিয়ায় নিন্মতম, আমাদের প্রতিবেশী ভারতে যা ৫০%। একটি প্রগতিশীল কর ব্যবস্থায় সম্পদশালী বেশি আয়ের মানুষ ও কর্পোরেট কর মিলিয়ে ৬৫% এর বেশি হওয়া দরকার। কিন্তু দুঃখজনক সত্য বাংলাদেশের ধনি গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশী কর ফাকি দেয়। কর্পোরেট গোষ্ঠী কর্তৃক বিদেশে সম্পদ এ অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যক্তি পর্যায়ে কর ফাঁকি প্রবণতা অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে, যা এসডিজির সার্বিক অগ্রগতিকে চ্যালেঞ্জেরে মুখোমুখি করে এবং ক্ষুধা, দারিদ্র ও অসমতা হ্রাসে প্রয়োজনীয় অর্থ যোগানের জন্য বাধা হয়ে দাড়ায়।
পরিশেষ :
দারিদ্র্য, অসমতা, খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক দেনা সংকট থেকে উত্তরনের জন্য জরুরী প্রয়োজন বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীকে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নিয়ে আসা। জলবায়ু সুবিচার, অর্থনৈতিক সুবাচার এবং এসডিজি অর্জনের কার্যকর পথঅন্বেষন নিয়ে আরো মতবিনিময় করতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নে বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারত্ব দুর্বল। স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের নিশ্চত করার জন্য প্রতিশ্রুত বৈশ্বিক অর্থায়ন কথার ফুলঝুরিতে ঝুলে আছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিরূপ প্রভাবকে যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামো আকার্যকর হয়ে পড়বে। তাই জাতীয় পর্যায় সহ, জাতিসংঘ ও বৈশ্বিক সম্মেলন পরিষরে প্রান্তিক মানুষের দাবিনামা তুলে ধরা দরকার। আশাকরি নতুন সরকার জনপ্রত্যাশা বাস্তবায়নে এগীয়ে আসবে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী সমাজ, আদীবাসী জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও যুবসমাজকে যুক্ত করে দারিদ্র ও অসমতামুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য ব্যাপক সংলাপের আয়োজন করবে, যা একটি নতুন সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে তুলবে।
আবদুল আউয়াল, জাতীয় সমন্বয়কারী, এসডিজি অ্যাকশন এলায়েন্স, বাংলাদেশ।
আপনার মতামত লিখুন :