প্রকাশিত: ১০ জুলাই, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১০ জুলাই, ২০২৫

বন্যায় বিপর্যস্ত নোয়াখালী: লাখো মানুষের জীবনে অন্ধকার

মোহাম্মদ হানিফ নিজস্ব প্রতিনিধি : কৃতির রুদ্ররূপ আবারও আছড়ে পড়েছে নোয়াখালীর বুকে। টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় জেলার ৬৩ হাজার ৮৬০টি পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। পানিবন্দি এসব মানুষের চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা আর শঙ্কা। ৪৬৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হলেও, বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) সকাল ১১টা থেকে শুরু হওয়া ব্যাপক বৃষ্টিপাত নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

একদিকে অবিরাম বৃষ্টি, অন্যদিকে নদীর ফুঁসে ওঠা জলরাশি। এর সম্মিলিত তাণ্ডবে গ্রামের পর গ্রাম, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এখন অথৈ পানিতে নিমজ্জিত। মাইজদী জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রের ছবিটা আরও করুণ। ডিসি অফিস, প্রেসক্লাব সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো জলের নিচে অদৃশ্য। এমনকি লোকালয়ের প্রাণকেন্দ্র নোয়াখালী পৌর মার্কেটও এখন পুরোপুরি পানির কবলে। মানুষের স্বপ্ন, জীবিকাসবকিছুই যেন ভাসছে এই অথৈ জলে।

সদর পৌরসভার আলিপুর এলাকার বাসিন্দা জহুরুল হক মিয়ার গ্যারেজের নিজাম উদ্দিনের কণ্ঠের অসহায়ত্বই যেন গোটা নোয়াখালীর প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, ভারী বর্ষণের ফলে আমাদের বসতঘর ও তার আশপাশ ডুবে গেছে। আমরা পানিবন্দি জীবনযাপন করছি। ভোররাত থেকে বৃষ্টি না থাকায় কিছুটা স্বস্তি লাগছিল, কিন্তু বেলা ১১টার পর আবারও ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে গেছে। আল্লাহ যেন আমাদের রক্ষা করেন। ২০২৪ সালের বন্যায় আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছিল।

কবিরহাট পৌরসভার বাসিন্দা আমির হোসেনের কথায় উঠে আসে আরও উদ্বেগজনক তথ্য, “আমাদের এলাকায় ২০২৪ সালের বন্যার থেকেও বেশি পানি হয়েছে। অনেকের বসতঘর ডুবে গেছে, বাতাসে গাছপালা পড়ে গেছে। বেশিরভাগ মানুষ ইতোমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। এই চিত্রই প্রমাণ করে, এবারের বন্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “আমাদের প্রায় ৯ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রয়েছে। ইতোমধ্যে ১০১টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। ৫০০ টন চাল, ২ হাজার ৭৮০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং নগদ ১৮ লাখ টাকা মজুত আছে।” এই প্রস্তুতি কিছুটা স্বস্তি দিলেও, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের কাছে তা কতটা যথেষ্ট, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।ইতিমধ্যে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২৬৮টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

কিন্তু টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। জেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রমে অংশ নিলেও, বৃষ্টিপাত না থামলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। নোয়াখালীর মানুষ এখন বন্যার এই ভয়াবহতায় দিশেহারা, ত্রাণ, চিকিৎসা আর নিরাপত্তার অভাবে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই দুর্যোগময় মুহূর্তে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন আরও ব্যাপক উদ্যোগ ও সংহতি।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর