প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১২ জুলাই, ২০২৫

পৌর বাজার থেকে গ্রাম, সর্বত্র পানির রাজত্ব: অবহেলা আর দখলের বলি লাখো মানুষ

মোহাম্মদ হানিফ, নিজস্ব প্রতিবেদক : টানা বর্ষণ শেষে নোয়াখালীতে রোদের দেখা মিললেও, জলাবদ্ধতার ঘোর কাটেনি। জেলার নয়টি উপজেলার বিস্তৃত এলাকা এখনো পানির নিচে, বিশেষ করে প্রাণকেন্দ্রের পৌর বাজারের চিত্র ভয়াবহ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও ড্রেন দখলের কারণে সৃষ্ট এই দুর্ভোগে লাখো মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, বাড়ছে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি।

টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টিপাতের পর অবশেষে নোয়াখালীর আকাশে দেখা মিলেছে ঝলমলে রোদের। শুক্রবার সকাল থেকেই আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় খানিকটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই স্বস্তি ক্ষণিকের। কারণ, রোদের দেখা মিললেও জেলার জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। নোয়াখালীর সদর, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, বেগমগঞ্জ, সেনবাগসহ নয়টি উপজেলার বহু গ্রাম এখনো গভীর পানির নিচে নিমজ্জিত। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও বাজার-হাটে থৈ থৈ পানি, আর এই অভূতপূর্ব দুর্যোগে দুর্ভোগে রয়েছেন লাখো পানিবন্দী মানুষ।

জেলা শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত নোয়াখালী পৌর বাজার। সমগ্র পৌরবাসীর পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষেরও এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার। ছুটির দিনগুলোতে এখানে ক্রেতা.বিক্রেতার ভিড় থাকে চোখে পড়ার মতো। অথচ জনগুরুত্বপূর্ণ এই বাজারটি চরম অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। এখানে নেই ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা, নেই পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেখা যায় না। যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো বাজার ময়লা ও হাঁটু পানিতে ডুবে একাকার হয়ে যায়। এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে রাস্তার উপরে চলে আসেন। এতে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কেই চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। নোংরা পরিবেশ, দুর্গন্ধ এবং কাদা-পানিতে চলাচল রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়ে। একজন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন বলেন, আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সকল মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের ব্যাপক লোকসান হচ্ছে।

কোম্পানীগঞ্জের বাংলাবাজার এলাকার বাসিন্দা আলী আজম জানান, “রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম। সকালে বাংলাবাজারে এসে দেখি সূর্য উঠেছে, তাই বাড়িতে ফিরছি। কিন্তু বাড়িতে এসে দেখি সবকিছু পানির নিচে, ঘরের ভেতরেও হাঁটু সমান পানি। এমন ভয়াবহ বন্যা আমি আর দেখিনি। গত বছরের চেয়ে এবারের পানি অনেক বেশি। গত বছরও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম, এবার তার চেয়েও বেশি ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু কোনো ত্রাণ পাইনি।

ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, রোদ উঠলেও ঘরে পানি। রাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম, সকালে রোদ ওঠার সাথে সাথে বাড়িতে ফিরে দেখি পানি আগের চেয়ে একটুও কমেনি, বরং বেড়েছে। কবে যে পানি যাবে, তা বুঝতে পারছি না। রান্না করা তো দূরের কথা, চলাচলও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ সাময়িক শুকনো জায়গায় আশ্রয় নিলেও, অনেকে বাধ্য হয়ে ভেঙে পড়া ঘরেই দিন কাটাচ্ছেন।

অন্যদিকে, সেনবাগ উপজেলার কাবিলপুর ইউনিয়নের আরিফ হোসেন কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করে জানান, আমাদের দিকে পানির চাপ গত বছরের চেয়ে কিছুটা কম, যা কিছুটা স্বস্তিদায়ক। কাঙ্ক্ষিত সূর্যের দেখা মিলেছে, আশা করছি এবার পানিও দ্রুত কমবে। আসলে পানিতে থাকতে থাকতে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। তা ছাড়া অনেক মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, “নোয়াখালীর পৌরসভাগুলোতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা, যা অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, খাল ও ড্রেনগুলো দখলের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এসব ড্রেন ও খালগুলো পুনরুদ্ধারে আমরা পৌরসভাকে বারবার নির্দেশনা দিয়েছি।” তিনি আরও জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ১৯টি খাল চিহ্নিত করেছে যা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেবে। এছাড়াও, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর প্রকল্পের আওতায় ১৭১ কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক আশা প্রকাশ করেন, “এই কাজগুলো বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন হবে। আকাশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি কেটে যাবে বলে আমরা আশা করছি।

রোদের দেখা মিললেও নোয়াখালীর লাখো মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। যতক্ষণ না পর্যন্ত খাল দখলমুক্ত করে পানি নিষ্কাশনের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা করা হচ্ছে, ততদিন এই অঞ্চলের মানুষকে প্রকৃতির এই অবিচার মেনে নিয়েই বাঁচতে হবে। স্থানীয়দের একটাই দাবি, ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধান। তারা একটি আধুনিক, সুপরিকল্পিত এবং জলাবদ্ধতামুক্ত নোয়াখালী চান।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর