প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

আর্জেন্টাইনদের জন্য মেসি লিখেছেন ‘অমর গল্প’

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার রোমাঞ্চ নিয়ে। লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে, ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে, ‘কখন আসবে কবি?’

বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তাল জনসমুদ্রে রুপ নিয়েছে। কবি নির্মলেন্দু গুনের এই কবিতার মতোই এক ‘কবির’ অপেক্ষায় উন্মত্ত অধীর হয়ে বসেছিল লাখো দর্শক-শ্রোতা। আকাশি-সাদা জার্সিতে এই আঙিনায় হয়তোবা শেষবারের মতো লিওনেল মেসি নামের এই কবি আরো একবার তাঁর জাদুকরি ছন্দ লিখবেন।

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন । কে রোধে তাহার বজ্রকণ্ঠ বাণী? রোজারিওর সেই ছোট্ট মেসি থেকে ফুটবলের সর্বজয়ী মেসি মাঠ নামক মঞ্চে উঠেই করলেন জোড়া গোল। এমন উজ্জ্বল বিদায় কে না চায়? ঘরের মাঠে এমন রাজসিক বিদায় স্বপ্নে লালন করে এসেছেন মেসি। ম্যাচ শেষে সেটাই বললেন মহাতরকা, ‘ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে, আর আমরা ম্যাচের পর ম্যাচ উপভোগ করেছি, আমি খুবই খুশি। এখানে এভাবে শেষ করতে পারা আমার সবসময় সপ্ন ছিল।’

আর্জেন্টিনায় সম্ভাব্য বিদায়ী ম্যাচ শুরুর আগেই যে মেসিকে নিয়ে আবেগ-উন্মাদনায় বুঁদ হবেন দর্শকেরা অনুমেয় ছিল। নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরাকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশনে’ আর মেসি-মেসি স্লোগানে স্লোগানে আলবিসেলেস্তারা জানান দিয়েছেন, মেসি তাঁদের কতটা হৃদয়জুড়ে আছেন। আর ভালবাসায় সিক্ত মেসি চোখের জল লুকানোর কোনো চেষ্টা করলেন না।

দাদীর হাত ধরেই নাকি স্বপ্নের এই যাত্রার সূচনা। এরপর দেখতে দেখতে এই মাঠ, এই ঘাস, এই শিশির, এই বাতাস কতটা আপন হয়ে উঠেছে ৩৮ বছর বয়সী ফুটবল জাদুকরের কাছে। কত তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও তো যেতে হয়েছে মেসিকে।

এই চেনা উঠোনেই নিজের ছবি আগুনে পুড়তে দেখেছেন, গ্যালারি থেকে শোনা যেত দুয়োধ্বনি।

মেসি নাকি শুধুই বার্সেলোনার, জাতীয় দলের জার্সিটা একটা সময় বেদনার চিহ্ন হয়ে উঠেছিল। পরের রূপকথার চিত্র কার না জানা? একে একে আর্জেন্টিনার হয়ে সব সাফল্যই ধরা দিয়েছে মেসিকে। আর সেই দুয়োধ্বনির পরিবর্তে এস্তাদিও মনুমেন্তালে অসীম ভালোবাসা, সম্মানের সুর।

ঝাকড়া চুলের তরুণ মেসি প্রস্তাব পেয়েছিলেন স্পেনের হয়ে খেলার। লম্বা চুল গুলো মুখের সামনে থেকে আলতো করে সরিয়েই হয়তো মেসি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তার পরিচয় শুধুই একজন আলবিসেলেস্তা। দেশকে কিছু দিতে না পারার গ্লানিতে তিনি যেমন অবসর নিয়েছিলেন, তেমনি দেশের টানেই আবার ফিরেছেন। তিনি ফিরেছেন, জিতেছেন,জিতিয়েছেন।

রেখেছেন নিজের প্রয়াত দাদীকে দেওয়া কথা। মনুমেন্টাল এ এদিন গোল করেও আকাশের দিক হাত তুলে হয়তো আরো একবার দাদীকেই স্মরণ করলেন তিনি।

মেসির এখন শেষের শুরু। ফুটবলকে পূর্ণতা দেওয়া মেসি উপভোগের মন্ত্র নিয়েই মাঠে নামার কথা বলে আসছেন কাতার বিশ্বকাপের পর থেকে।

২০২৬ বিশ্বকাপই ইন্টার মায়ামি তারকার ‘লাস্ট ডান্স’। শুনুন মেসির কণ্ঠেই, ‘যেমনটা আগেও বলেছি, আরেকটা বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে সামনে চলে এসেছি বলে খেলতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত ও অনুপ্রাণিত বোধ করছি। ম্যাচ ধরে ধরেই এগোতে চাই।’

বুটজোড়া তো একদিন তুলে রাখতেই হবে মেসিকেও। সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মের কাছে হার মানলেও ভক্ত-সমর্থক আর অনাগত ফুটবল প্রেমীদের নিয়ে নিজের সোনায় মুড়িয়ে রাখার মতো ফুটবলীয় ক্যারিয়ার মেসির শেষ কথাটা হয়তো নির্মলেন্দু গুনের কবিতাতেই আছে- ‘অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি, শিশু পারকের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে

লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।’

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর