প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১৭ অক্টোবর, ২০২৫

হাতিয়ায় এইচএসসি ফলাফল ভরাডুবি : শিক্ষার নামে প্রহসন, দায় এড়াতে পারবেন না কেউ

সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া : হাতিয়ার শিক্ষাঙ্গনে নেমে এসেছে এক অন্ধকার অধ্যায়। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দ্বীপের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভরাডুবি। মোট ১০৬৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ৭৯৮ জন। অর্থাৎ, ৭ জনের মধ্যে ৫ জনই ফেল করেছে। পাশের হার নেমে এসেছে ১৫ শতাংশেরও নিচে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল হতাশাজনকই নয়—বরং শিক্ষার নামে এক নির্মম প্রহসন।

সবচেয়ে করুণ চিত্র হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজে। ৪৭৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ৪০২ জন। হাতিয়া ডিগ্রি কলেজে ১৭০ জনের মধ্যে ফেল ১৩৭, প্রাকৌশলী ফজলুল আজিম মহিলা কলেজে ২৬৩ জনের মধ্যে অধিকাংশই অকৃতকার্য। তমরদ্দি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২৩ জনের মধ্যে ২১ জন ফেল, হাতিয়া কমিউনিটি কলেজে ৪৫ জনের মধ্যে ৩৮ জন এবং মোহাম্মদ আলী কলেজে ৮৯ জনের মধ্যে ৬৮ জন ব্যর্থ হয়েছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে কোচিং ব্যবসায় ব্যস্ত থাকেন। ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার বাইরে কোনো ভিত্তিমূলক জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরাও স্বীকার করছে, ক্লাস না হওয়া এবং শিক্ষকদের অনীহার কারণে তারা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। ভৌগোলিক বৈষম্য, আধুনিক শিক্ষার অভাব এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে শিক্ষকদের পাল্টা দাবি, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি ও অভিভাবকদের তদারকির অভাবই বড় কারণ।
তমরদ্দি স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন মনে করেন, আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারেনি।

হাতিয়া কমিউনিটি কলেজের অধ্যক্ষ মামুনুর রশীদ বলেন, শিক্ষার্থীর পড়াশোনার জন্য অভিভাবকের সহযোগিতা ও শিক্ষকদের শাসন-সোহাগ দুটোই বাড়ানো জরুরি।

মোহাম্মদ আলী কলেজের অধ্যক্ষ দায় ভাগ করে নিলেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, “এবারের ফলাফল আমাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। শিক্ষার্থীরা যথাযথ পড়াশোনা না করার পাশাপাশি ক্লাসে অনুপস্থিত থেকেছে। আবার শিক্ষকরা চাইলে আরও বেশি সময় ও মনোযোগ দিতে পারতেন। অভিভাবকরাও সন্তানের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেননি। ফলে শিক্ষার্থীরা দ্বিগুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা মনে করি, সবাই মিলে একসাথে এগিয়ে এলে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন সম্ভব।

ফলাফলের বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ মো. তোফায়েল হোসেন বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করছে না। তারা পড়ালেখার চেয়ে মোবাইল ফোনে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে পড়াশোনার প্রতি তাদের আগ্রহ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। অভিভাবকরাও এ বিষয়ে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন না। ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত কলেজে আসছে কিনা, ক্লাস করছে কিনা—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের কোনো তদারকি নেই। তদারকি না থাকলে পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

এখন প্রশ্ন হলো, কলেজে যদি ছাত্র-ছাত্রীরা উপস্থিত না হয়, তাহলে আমি কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের ডেকে এনে ক্লাস করাতে পারবো? এভাবে তো সম্ভব নয়। এজন্য শুধু শিক্ষক নয়, অভিভাবকরাও সমানভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। সবাই মিলে তদারকি করলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান উন্নত হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হতাশাজনক ফলাফল আর হবে না।”

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এ ফলাফল কেবল ব্যর্থতা নয়, বরং হাতিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থার অশনিসংকেত। এখনই যদি কার্যকর সংস্কার ও কঠোর তদারকি শুরু না হয়, তবে দ্বীপের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা থেকে সম্পূর্ণভাবে ছিটকে পড়বে।

সচেতন মহল বলছেন, দায় শুধু শিক্ষক বা অভিভাবকের নয়—কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহি করতে হবে। অন্যথায় এই ব্যর্থ প্রজন্ম শুধু সার্টিফিকেট হাতে বেকার শিক্ষার্থী হিসেবেই বেড়ে

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর