প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১৫ নভেম্বর, ২০২৫

মেঘনার গ্রাসে বিলীন জনপদ, পদক্ষেপ না নিলে নিশ্চিহ্ন হবে হাতিয়া

সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া :
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সুরক্ষাবলয় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া আজ অস্তিত্ব সংকটে। ভয়াল মেঘনার আগ্রাসী ভাঙনে প্রতিদিন জনপদ, জমি, বসতভিটা, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাচ্ছে নদীগর্ভে। এটি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়- এটি এখন জাতীয় মানচিত্র রক্ষার লড়াই।

উপজেলার হরণী, চানদি, সুখচর, নলচিরা, তমরদ্দি, সোনাদিয়া, জাহাজমারা, বুড়িরচর, চরঈশ্বর, চরকিং, নিঝুমদ্বীপ- প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে ভাঙন মহামারীর রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন শত শত ফুট ভূখণ্ড গ্রাস করছে মেঘনা। নদীর উত্তাল স্রোত ও অরক্ষিত তীর জনজীবনকে পরিণত করেছে অভিবাসী উদ্বাস্তুতে।

শুধু ঘরবাড়ি নয়- বিদ্যালয়, মসজিদ, বাজার, সড়ক, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র পর্যন্ত ভাঙনের মুখে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চরঈশ্বর বাংলা বাজার এলাকা প্রবল বাংলা মুখে,বাংলা বাজার থেকে উত্তর দিগে প্রতিদিন কয়েক নল বসতবাড়ি বসলে জমি ভেঙ্গে চর্চার হয়ে যাচ্ছে, আফাজিয়া সংলগ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে।

চরকিং ইউনিয়ন শেখ ফরিদ বলেন আমার জন্ম এই মাটিতে, বড় হয়েছি এই নদীর পাড়ে। কিন্তু আজ সেই নদীই আমার সব কেড়ে নিয়েছে। বাবার রেখে যাওয়া ভিটে, ঘর, উঠান সবকিছু চোখের সামনে নদীতে ধসে গেছে। ঘরের টিন, খাট, এমনকি সন্তানদের স্কুল বই পর্যন্ত বের করতে পারিনি। এখন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নিচে থাকি। রাতে নদীর শব্দ শুনলে বুক কেঁপে ওঠে, মনে হয় এই বুঝি আবার ভাঙন শুরু হলো। আমরা সরকারের কাছে ভিক্ষা চাই না, শুধু চাই— আমাদের বাঁচার মতো মাটিটা যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয়।”

চরঈশ্বর, মৌলভী গ্রাম কল্পনা বালা জল রাবী দাস স্বামী দিনমজুরি করে, তার রোজগারে কোনো রকম সংসার চলত। কিন্তু ভাঙন সব শেষ করে দিল। জমি গেছে, ঘর গেছে, রান্নার চুলাটাও নদী নিয়ে গেছে। এখন অন্যের উঠানে আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু সাহায্য কতদিন? সন্তান রাতে খাবার চাইলে বুক ফেটে কান্না আসে। স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। ভয় হয়— সন্তানকে মানুষ করতে পারবো তো? আমরা কি এভাবে প্রতিদিন মরে মরে বাঁচবো? সরকার যদি এখনই এগিয়ে না আসে, আমাদের বেঁচে থাকার আর কোনো পথ নেই।

নলচিরা ইউনিয়নের হকসাব বলেন,ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি নদী ভাঙবে, আবার গড়বে। কিন্তু এখন শুধু ভাঙে, আর কিছু গড়ে না। আমাদের পৈতৃক জমি, ক্ষেত-খামার, ফসলের মাঠ— সব পানির নিচে। এক মাস আগেও যেখানে গ্রাম ছিল, আজ সেখানে মাঝি নৌকা চালায়। আমরা কোথায় যাব? সরকার বড় বড় প্রকল্প নেয়, উন্নয়ন হয়, কিন্তু নদীর পাড়ের মানুষ বাঁচে না। আমরা চাই শুধু একটি স্থায়ী বাঁধ, যাতে আমাদের সন্তানরা অন্তত স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে বড় হতে পারে।”

আশি বছর উদ্দে বুড়িরচর ইউনিয়নের ইব্রাহিম বলেন “আমি পাকিস্তান আমল দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, ঝড় দেখেছি— কখনও ভিটা ছাড়িনি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নদীর কাছে হেরে গেলাম। এখন পরের জায়গায় তাঁবু টাঙিয়ে থাকি। নিজের মাটিতে মরার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সেই মাটিটাই তো আর নেই। চোখ বন্ধ করলে শুধু ভেসে ওঠে— আমার বাড়ি, লাল মাটির উঠান, সেই উঠানে নাতি-নাতনির দৌড়। আজ সব স্মৃতি নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। সরকারের কাছে আমার আকুতি মরার আগে যেন নিজের মাটিতে দাঁড়াতে পারি।”

নিঝুমদ্বীপ, নামার বাজার শাহেদ উদ্দিন জানান “আমি ২০ বছর ধরে ব্যবসা করি, দোকানই ছিল জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু এখন সেই দোকানের অর্ধেক নদী নিয়ে গেছে। ক্রেতা নেই, মালামাল বিক্রি হয় না, ধারদেনা বাড়ছে। প্রতিদিন সকালে দোকান খুলতে গিয়ে ভয় হয়— কাল হয়তো আর এই বাজারই থাকবে না। নিঝুমদ্বীপ পর্যটনের সম্ভাবনাময় জায়গা, কিন্তু নদী ভাঙন সব শেষ করে দিচ্ছে। এই দ্বীপ বাঁচলে দেশ পাবে, অর্থনীতি বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন।”

সোনাদিয়া ইউনিয়নের আবদুল মান্নান রানা সোনাদিয়া এক সময় ছিল সমৃদ্ধ জনপদ, ধানক্ষেত আর মৎস্যে ভরপুর। কিন্তু এখন নদী আস্ত গ্রাম গিলে খাচ্ছে। এখানে যেসব সরকারি প্রকল্প শুরু হয়, ভাঙন সেগুলোও শেষ করে দেয়। আমরা আর আশ্বাস শুনতে চাই না, আমরা দৃশ্যমান কাজ চাই। ব্লক চাই, নদী-শাসন চাই, স্থায়ী বাঁধ চাই। সোনাদিয়া যদি হারিয়ে যায়, এটাও দেশের জন্য বড় ক্ষতি। শুধু পরিবার নয়— একটি পুরো জনপদ বাঁচানোর লড়াই এটা।”

তমরদ্দি, ক্ষিরদিয়া গ্রাম আশিক আলী বলেন “আমরা তরুণরা স্বপ্ন দেখি, পড়াশোনা করি, খেলাধুলা করি— কিন্তু এখন স্বপ্ন দেখতেও ভয় লাগে। মাঠ নদীতে, রাস্তা ভাঙনে, স্কুল হুমকিতে। অনেক বন্ধু পরিবার হারিয়ে শহরে চলে গেছে, কেউ কাজের খোঁজে দিশেহারা। আমরা আমাদের এলাকা ছেড়ে যেতে চাই না, আমরা এখানেই জীবন গড়তে চাই। সরকারের কাছে অনুরোধ আমাদের যুবসমাজকে বাঁচান, আমাদের গ্রাম বাঁচান, আমাদের ভবিষ্যৎ বাঁচান।”

হরণী ইউনিয়ন সুমন উদ্দিন হরণীতে এমন কোনো পরিবার নেই, যারা ভাঙনের ক্ষত সহ্য করেনি। আমরা ঘুমাই আতঙ্কে, জাগি আতঙ্কে। বর্ষা মৌসুম এলে বুকের ধড়ফড়ানি বেড়ে যায়। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে মনে হয় ফিরিয়ে আনার মতো ঘরটা থাকবে তো? আমরা দুর্যোগের সঙ্গে লড়তে রাজি, কিন্তু খালি হাতে তো লড়াই করা যায় না। আমাদের শুধু একটি নিরাপদ বেড়িবাঁধ দিন, আমরা বাকি যুদ্ধ নিজেরাই লড়বো।”
“এখনই যদি নদী শাসন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হয়, আগামী কয়েক বছরে হাতিয়া মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে।”

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে- ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
মানবিক সহায়তা কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন জলবায়ু ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন-একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প ছাড়া হাতিয়াকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
ব্লক স্থাপন, নদী শাসন টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্লান এখনি জরুরি।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর