প্রকাশিত: ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

সম্ভাবনাময় প্রতিভা আমাদের ইমন – শিরীণ আক্তার

 

সদ্য আমি এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করেছি। কিছুদিন আগে শুনলামড়আমাদের অতি প্রিয় পারভীন আপা প্রথম সন্তানের মা হয়েছেন। খবরটি শুনে মন যেন উড়ে গেলো; কবে গিয়ে নবজাতককে দেখে আসব, সেই অপেক্ষা শুরু হলো । পারভীন আপা আমার প্রতিবেশী বড়বোন; বলা যায়, বান্ধবীও। আর বিয়ের পর তিনিই হলেন আমার নিকটতম প্রতিবেশীড় পাড়াতো ননদের মতো। দুই সম্পর্কের চেয়েও বড় ছিল তাঁর সঙ্গে আমার আত্মিক বন্ধনড়জ্যেষ্ঠ বান্ধবীর সম্পর্ক। আর তাঁর প্রথম সন্তান, আমাদের বোনপো বা ভাগনেহাবীব ইমন। আমরা তাকে স্নেহভরে ডাকি ‘ইমন’।

অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেনড়বোনপোই যদি হয়, তবে তাকে কেন সম্মানসূচক সম্বোধনে ডাকি? আমার উত্তর খুব সহজ: তিনি যদি নিজের গুণে, নিজের পরিশ্রমে সমাজে একটি সম্মানীয় আসন অর্জন করেন, তাহলে আমি মা-ফুফি-চাচি হয়ে তাঁকে সম্মানের সর্বনামে সম্বোধন করতেই পারি। এটি কোনো আচরণগত দূরত্ব নয়, বরং হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত শ্রদ্ধা। তিনি সারা জীবন যদি তাঁর আদর্শ ও মানবিকতার জায়গায় অবিচল থাকেনড়আমি তাঁর প্রতি এই সম্মান বজায় রাখব। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই জায়গায় সে নড়চড় হবে না। আমি কখনো দেখিনি, নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে সে প্রতারণা করেছে। হাবীব ইমন শুধু আমাদের পরিবারের সন্তান নন; তিনি মাইজদী, নোয়াখালী তথা বাংলাদেশ ও বিশ্বের এক সূর্যসন্তান। আমার বিশ্বাস, যেমন সূর্যের আলো পৃথিবী ভরিয়ে তোলে, তেমনি তাঁর আলোয় আলোকিত হবে আমাদের দেশ, আমাদের জাতি। আমি অন্তর থেকে চাইড়বিশ্ব যেন আমাদের ইমনের মধ্য দিয়ে আরেকজন হকিং-এর মতো মননশীল, দার্শনিক ও মানবিক প্রতিভাকে ফিরে পায়।
যাঁরা তাঁকে আন্তরিকভাবে লক্ষ্য করবেন, তাঁরা তাঁর মধ্যে বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মানবিকতা, জনপ্রিয়তা ও সৎ ব্যবহারের মেলবন্ধন দেখতে পাবেন। পারিবারিক শিক্ষা তাঁর চিন্তা, শিষ্টাচার, বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বকে সংহত ও শাণিত করেছে।

নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারের সন্তান হাবীব ইমন। তাঁর শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত কোনো অসদাচরণ চোখে পড়েনি বা কানে শুনিনি। তিনি স্বভাবতই ভদ্র, বিনয়ী, অমায়িক, সংযত ও শিষ্টাচারপরায়ণ। তাঁর একটি সামান্য ‘অভাব’ড়তিনি প্রচলিত মানদণ্ডে খুব সুদর্শন নন। এটি তাঁর কোনো দোষ নয়স্রষ্টার ইচ্ছা। তাঁর অবয়বগত ত্রুটি জীবনের অনেক ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও তিনি নিজের শক্তিতে সেগুলোকে উপড়ে ফেলেছেন। কোনো বিশেষ সাহায্য ছাড়া বারবার একাকী নিজেকে সাহসের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ যার দেহে ত্রুটি রাখেন, অন্যদিকে তাঁকে প্রজ্ঞা, মনন ও মানবিকতার মতো অতিরিক্ত শক্তি দিয়ে পূরণ করেনড়ইমন সেই ব্যতিক্রম নন। এতে পরিবারের কারো দোষ নেই। মানুষ জানে সন্তান যতই কদাকার বা বিকৃত হোক, বাবা-মায়ের কাছে সে অমূল্য, অতিপ্রিয়। ইমনও তাঁর পরিবারের হৃদয়ের খুব গভীর জায়গায়।

সামাজিক অবস্থানে উচ্চবংশ, বিদ্যা ও বিত্ত থাকা সত্ত্বেও তাঁর মধ্যে কখনো অহংকার দেখা যায়নি। তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য, যার সঙ্গে মেশে খুব ভালোভাবে মেশে, তাদেরকে সে বুঝতে পারে বা বুঝতে চায় । কিন্তু তাঁকে আমরা ক’জন বুঝতে পারি?, তিনি জনদরদী, মানবিক, নিরহংকারী ও বিনয়ীড়এই গুণই তাঁকে সবার কাছে সম্মানীয় করেছে। কিছু মানুষ অবশ্য আছে, তাকে ভেতরটাকে সহজভাবে সঠিক অনুবাদ করতে না পেরে বিপরীতভাবে তাকে মূল্যায়ন করে। আমরা কেউই তাঁর লড়াইয়ের যোগ্য সঙ্গী হতে পারিনি। কেবলমাত্র তাকে উপহাস করেছি বিভিন্ন সময়ে।

আমি তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, “বাবা, তুমি নির্বাচন করতে চাও কেন? মানুষ কি তোমাকে ভোট দেবে?” তার জবাব ছিলড়“আমি আমার কথা বলার জন্য ভোটে দাঁড়াতে চাই না, মানুষের কথা বলার জন্য দাঁড়াব। আমি নোয়াখালীকে আধুনিক শহরে পরিণত করতে চাই । তরুণদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করব। নোয়াখালী কেমন হওয়া উচিতড় তাদের নিয়ে তার রূপরেখা দাঁড় করাতে চাই।”

ওর কথা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি। ওর পরিকল্পনার গভীরতা আমাকে অবাক করেছে। জন্মভূমির প্রতি ওর টান অসাধারণ। ওর ভাবনা দেখে বুঝলামড়সে সত্যিই নোয়াখালীর জন্য কিছু করতে চায়, সবার জন্য করতে চায়। উদাহরণ হিসেবে তাঁর নানা প্রফেসর আবদুল জলিল স্যারের কথা বলতে হয়, আমরা দেখেছি, কিভাবে তিনি এ অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে অকুতোভয় ভূমিকা রেখেছেন ।

ইমন মানবিক, কর্মব্যস্ত, প্রাণবন্ত এক তুখোড় তরুণ। সদা হাস্যোজ্জ্বল এক বাম রাজনৈতিক কর্মীর সকল ইতিবাচক গুণ তাঁকে আরও উজ্জ্বল করেছে। যদিও বিভিন্ন তাঁর বিভিন্ন লেখায় আমরা দেখতে পাই, তার সহজ স্বীকারোক্তি, আমি কমিউনিস্ট হতে পারিনি। এ সরল স্বীকারোক্তিই বা কজন উপলব্ধি করতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতে তাঁর পরিচিতি ব্যাপক। লেখক হিসেবেও অর্জন করেছেন যথেষ্ট খ্যাতি। তিনি জন্মগতই কবিতার মানুষ।,

 

তিনি দুই বাংলার পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক বিষয়ে তিনি অন্যতম কলামিস্ট এবং অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। ২০১০ সালে তাঁর কলামসমগ্র বই ‘লেখা-অলেখা’ এবং কাব্যগ্রন্থ কবি হয়ে জন্মাতে চাইনি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা থেকে ২০১৫ সালে । কলকাতা থেকে আরেকটি কাব্যগ্রন্থ দূরের মানুষ আমি দূরেই থেকে যাচ্ছি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ সালে।

তার বাবা সদ্য প্রয়াত খলিল উল্লাহ ছিলেন একজন সফল ব্যাংকার। মা মাকসুদাহ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, আরমানিটোলা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর নিয়েছেন।

উচ্চতর ডিগ্রিধারী ইমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও লেখালেখিও। তিনি ‘স্পর্ধা সবসময়ে’ নামক সাহিত্য কাগজের সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় নেতা এবং বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের প্রেসিডিয়াম সদস্য। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাহিত্য শাখার টানা তিন বার সম্পাদক ছিলেন। তিনি একজন প্রতিভাধর, মানবিক ও সৃজনশীল মানুষড়নিজের অন্তর্দৃষ্টি, চিন্তার শক্তি ও কলমের জোরে সমাজে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। মানুষ কেমন তা মুখে নয়ড়মনেই বোঝা যায়। মনের আলোই সত্যিকারের পরিচয়। সেই মানবিক আলো ইমনের মধ্যে প্রবল দীপ্তিতে 9
বিদ্যমান ।

ঐশ্বরিকভাবে প্রাপ্ত অবয়বগত ত্রুটি তাঁর সৃজনশীলতা, সংবেদনশীলতা, দার্শনিকতা বা কর্মশক্তিকে এক মুহূর্তের জন্যও ম্লান করেনি। বরং এগুলো তাঁকে আরও কোমল, গভীর ও সহমর্মী করেছে। তিনি প্ৰমাণ করেছেনড়সৃজনশীলতা, অধ্যবসায় ও সততা দিয়েই মানুষ সম্মান অর্জন করেরূপ বা বাহ্যিক জৌলুশ দিয়ে নয়।

ইমন একজন উচ্চশিক্ষিত, যুক্তিবাদী, সৃষ্টিশীল ও মেধাবী তরুণ। বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তা এবং বিশেষভাবে সিপিবির আদর্শ তাঁকে সমাজে ন্যায়, সমতা ও শোষণমুক্তির পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর লেখায় এই বিশ্বাস খুব স্পষ্ট। তিনি রাজনীতিকে কখনো ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে নয়ড়মানবকল্যাণের দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আদর্শিক, সৎ এবং সমাজসচেতন নাগরিকের আসনে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর স্বপ্ন উচ্চাভিলাষী, কর্মে তিনি নিরলস, নিরাপোষ পরিশ্রমী, দুর্বার গতির তরুণ।

আমার দেখা মানুষের মধ্যে ইমন এক মহৎপ্রাণ চরিত্রড়যিনি অবয়বগত সৌন্দর্যে নয়, মনের দীপ্তি ও মনুষ্যত্ব দিয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করেন। তিনি শুধু সৃজনশীল কথাসাহিত্যিক ননড়একজন চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবী; যার লেখায় সমাজবোধ, শ্রেণীচেতনা ও মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।

ইমন অবিবাহিত, কিন্তু একাকী নন। তাঁর কথাবার্তা ও আচরণে বোঝা যায়ড়তিনি কতটা পরিবারবান্ধব ও মানবিক। তাঁর প্রধান সঙ্গী বই, কলম, খাতাড়আজ তার মোবাইলও সেই সঙ্গীর একটি অংশ। ব্যক্তিগত জীবনে যে ভালোবাসা হয়তো তিনি পাননি, সেই ভালোবাসাই তিনি ছড়িয়ে দেন নিখুঁত শব্দেড়অতন্দ্র শব্দসৈনিকের মতো। এ প্রশ্নটা অনেকে করেন, তাঁর লেখার মধ্যে নেতিবাচক বিষয় কেনো আসে। এর উত্তর হয়তো এমন হতে পারে, আমরা কি তাঁকে পজিটিভ জীবনের সন্ধান দিয়েছি? অনেকেই হয়তো এটা জানে না, তাঁর ভেতরে কতটা পজিটিভ বিষয় আছে। সমস্যা হলো ও নিজেকে জাহির করতে পারে না। জানান দিতে চায় না সত্যিকারের ইমনকে।

নোয়াখালীর অরুণ চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নোয়াখালী জিলা স্কুল এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে তিনি পড়াশোনা শেষ করেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন । মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করেছেন। দুই বাংলার কাগজে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে নেতাজি সুভাষ বসু জন্মবার্ষিকীতে তিনি সংবর্ধিত হন।

আজ দেশ-বিদেশে অস্থিরতা, যুদ্ধ, প্রতিক্রিয়াশীলতা, অবিচার আর মৃত্যুর ধ্বনি চারদিকে। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। কেন এ দেশ মৃত্যুর উপত্যকায় পরিণত হলোড়এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ইমন । তরুণ লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মী হিসেবে তিনি শুধু মাঠে নয়ড় বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়েও সক্রিয়।

আমি তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ জীবন কামনা করিড়তিনি যেন দেশের মানুষ, সমাজ ও মানবতার সেবা করে চিরদিন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্যমান থাকেন। তিনি যেদিন জন্মেছিলেনড়তখন তিনি আমার পুত্রতুল্য ছিলেন; আজ তিনি আমার গর্ব, এবং আমি বিশ্বাস করিড় একদিন তিনি আরও বড় মাপের মানুষ হবেন। আমার সমর্থন ওর সঙ্গে আছে ।

শিরীণ আক্তার : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, কবি-লেখক

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর