প্রকাশিত: ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

একটি মৃত্যু, একটি রাষ্ট্র, একটি বিবেক – মোহাম্মদ হানিফ

একটা জলজ্যান্ত মানুষ হাঁটছিল। কথা বলছিল। স্বপ্ন দেখছিল। আগামী দিনের পরিকল্পনা ছিল তার চোখে, তার কণ্ঠে। হঠাৎ একটি গুলির শব্দ। মুহূর্তেই থেমে গেল সব। থেমে গেল শুধু একজন হাদি নয় থেমে গেল আমাদের রাষ্ট্রীয় বিবেকের আরেকটি ধুকপুকানি।এই কি সেই বাংলাদেশ যে দেশের জন্য লাখো মানুষ বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল?

আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি, তা কোনো পতাকার কাপড়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, কোনো দেয়ালে লেখা স্লোগানের মধ্যেও আটকে ছিল না। সেই স্বাধীনতার ভিত গড়া হয়েছিল রক্তে, সাহসে, নির্ভয়ে সত্য বলার অধিকারে। আজ সেই কণ্ঠই গুলি করে থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আজ কথা বলাই অপরাধ, প্রশ্ন করাই রাষ্ট্রদ্রোহ, সত্য উচ্চারণ করাই যেন অঘোষিত মৃত্যুদণ্ড।

হাদির কণ্ঠে ছিল সাহস। তার বলার ভঙ্গিতে ছিল দৃঢ়তা যা ভয় পায় না, মাথা নত করে না, চোখে চোখ রেখে কথা বলতে জানে। সেই কণ্ঠই আজ চিরতরে স্তব্ধ। আর আমরা? আমরা কি আরও নীরব হবো? নাকি নিরাপত্তার অজুহাতে মাথা নিচু করে বেঁচে থাকার অভিনয়ই আমাদের শেষ পরিচয় হয়ে থাকবে?

আজ বাংলাদেশ এক ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের জটিল চক্রে আমাদের রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অন্ধকারের অতলে। নির্বাচনকে বানচাল করতে, গণতন্ত্রকে হত্যা করতে, জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে যদি হাজারো হাদির রক্ত ঝরাতে হয় তবে কি এটাই আমাদের ভবিতব্য? তবে কি স্বাধীনতার মূল্য এতটাই সস্তা হয়ে গেছে?

আজ আমি লিখছি একজন সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি লিখছি একজন মানুষ হিসেবে একজন ভীত, আহত, অসহায় নাগরিক হিসেবে। বিশ্বাস করুন, আজ সারাদিন ঘর থেকে বের হতে ভয় পেয়েছি। কলম হাতে নিয়েছি কাঁপা হাতে। কারণ আজ সত্য বলার মূল্য জীবন। ইতিহাস সাক্ষী এদেশে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রতিবাদী কণ্ঠ বরাবরই টার্গেট। তবু প্রশ্ন থেকেই যায় আমরা কি থেমে যাবো?

মানুষ মরণশীল। এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় কেউ স্থায়ী নয়। দুনিয়ার টাকা-পয়সা, ক্ষমতা, প্রাসাদ, বাহিনী সবই একদিন পড়ে থাকবে। কবরে যাবে না কিছুই; যাবে শুধু আমল আর দায়িত্ব। পবিত্র কোরআন আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু মৃত্যুর আগে মানুষ কী করলো, সেটাই আসল হিসাব।

আজ হাদির রক্ত মজলুমের রক্ত। এই রক্ত শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের ন্যায়বোধ, আমাদের মানবিকতা। হাদির মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের কান্না নয় এটি পুরো জাতির শোক। দল-মত নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ আজ চোখের পানি ফেলেছে। হ্যাঁ, হয়তো কিছু মানুষ খুশিও হয়েছে কিন্তু ইতিহাস তাদের কখনো ক্ষমা করবে না। কোনো মৃত্যুই উৎসব হতে পারে না। কোনো লাশের ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি টেকে না টিকলেও তা অভিশপ্ত হয়ে যায়।

ঘাতকের গুলিতে হাদি জীবন হারিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার মৃত্যু জায়গা পেয়েছে বিশ্ব মিডিয়ায়। অথচ নিজের দেশে আমরা কী দেখলাম? তার মৃত্যুকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা, সত্য আড়াল করার চক্রান্ত, ভয় দেখানো, হুমকি, মিডিয়া হাউসে আগুন। এটা কি কেবল একজন মানুষের হত্যাকাণ্ড? না এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর আরেকটি রক্তাক্ত আঘাত।

আজ মানুষের রক্তে আগুন লেগেছে। হৃদয় ক্ষতবিক্ষত। রাজপথ নীরব, কিন্তু বাতাস ভারী। এই নীরবতা ভয়ংকর কারণ নীরবতার ভেতরেই জন্ম নেয় স্বৈরাচার, বড় হয় অন্যায়।

আমরা আল্লাহ তাআ’লার কাছে সাহায্য চাই। দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র থেকে তিনি যেন এই দেশটাকে কুদরতি হাতে হেফাজত করেন। হযরত ওমরের মতো ন্যায়পরায়ণ, সাহসী, দায়িত্বশীল হাজার হাজার হাদি যেন এদেশে জন্ম নেয় যারা ভয় পাবে না, যারা সত্য ছাড়বে না, যারা জীবন দিয়ে হলেও ন্যায়ের পাশে দাঁড়াবে।

হাদি, আপনি নেই। কিন্তু আপনার রক্ত আমাদের সামনে রেখে গেছে কিছু কঠিন প্রশ্ন আমরা কি মানুষ হয়ে থাকবো, নাকি ভীতু দর্শক হয়ে যাবো? আমরা কি সত্যের পক্ষে দাঁড়াবো, নাকি নিরাপত্তার নামে নীরবতার দাসত্ব মেনে নেবো?

আল্লাহর ফয়সালা মেনে নিতে হয় এটা সত্য। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোও ঈমানের অংশ। আজ যদি আমরা চুপ থাকি, আগামীকাল আমাদের কণ্ঠেও গুলি বসবে।

এই কলম আজ শুধু লেখে না এই কলম কাঁদে।এই কলম আজ শুধু সংবাদ নয় এই কলম সাক্ষ্য দেয়।ইতিহাস সাক্ষী থাকবে হাদির মৃত্যুতে বাংলাদেশ কেঁদেছিল। এবং ইতিহাসই একদিন বিচার করবে কারা মানুষ ছিল, আর কারা মানুষ খুন করে ক্ষমতা চেয়েছিল।
আল্লাহ তাআ’লা হাদিকে শহীদ হিসেবে কবুল করুন।জান্নাতের উচ্চ মাকাম তাকে দান করুন এই দোয়াই করছি মহান রবের কাছে।
আর আমাদের ভয় নয়, বিবেক দান করুন।

লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথা

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর