প্রকাশিত: ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫

হাদি কেবল একটি নাম নয় হাদি একটি ইতিহাস – মোহাম্মদ হানিফ

কিছু মানুষ জন্ম নেয় নিজের জন্য নয় জন্ম নেয় সময়ের জন্য। তারা আসে প্রশ্ন হয়ে, প্রতিবাদ হয়ে, আলো হয়ে। ওসমান হাদি ছিলেন ঠিক তেমনই একজন। মাত্র ৩২ বছরের জীবনে তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন ইনসাফের পথে হাঁটা মানুষ কখনো পরাজিত হয় না, কখনো মরে না।

ঘাতকের গুলি তার হৃদপিণ্ড থামিয়ে দিতে পেরেছে, কিন্তু থামাতে পারেনি তার চিন্তা। থামাতে পারেনি তার স্বপ্ন। থামাতে পারেনি তার দেশপ্রেম।

হাদির জানাজায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তা কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় ছিল না। তা ছিল ভালোবাসার বিস্ফোরণ, নীরব প্রতিবাদের সমুদ্র। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায় মানুষ আর মানুষ। কেউ এসেছেন চোখের পানি নিয়ে, কেউ এসেছেন স্তব্ধ শ্বাস নিয়ে, কেউ এসেছেন কেবল বুকভরা হাহাকার নিয়ে।

সেদিন মানুষ কেঁদেছে একজন মানুষকে হারিয়ে নয়, কেঁদেছে একটি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ হারানোর বেদনায়। দল-মত, আদর্শ, রাজনৈতিক পরিচয় সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ সেদিন এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। কারণ হাদি কোনো একক দলের নাম ছিল না; হাদি ছিল ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষের নাম।

তিনি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন নির্ভয়ে।তিনি চেয়েছিলেন ইনসাফের এক জনপদ, ন্যায়ের এক রাষ্ট্র, মর্যাদার এক বাংলাদেশ।যেখানে তরুণেরা গুলির ভয় নয়, স্বপ্নের সাহস নিয়ে বাঁচবে।

যেখানে রাষ্ট্র প্রশ্নকে ভয় পাবে না, বরং প্রশ্ন থেকেই নিজেকে শুদ্ধ করবে।
আজ হাদির কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষ যে নীরব কান্না কাঁদছে, তা কেবল শোক নয় তা একটি শপথ। শপথ এই যে, তার স্বপ্ন মাটিচাপা দেওয়া যাবে না।

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এটি এক নির্মম সত্য। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, তার আদর্শ কেড়ে নেওয়া যায়নি। কারণ আদর্শ কখনো একা থাকে না; আদর্শ বাস করে মানুষের হৃদয়ে।

হাদির বিদায়ে মানুষের এই অভূতপূর্ব উপস্থিতি আবারও প্রমাণ করে ইতিহাস গড়ে ওঠে খুব অল্প কিছু মানুষের হাত ধরে। তারা সংখ্যায় কম, কিন্তু প্রভাব তাদের সীমাহীন। তারা চলে যায়, কিন্তু রেখে যায় এক অদৃশ্য উত্তরাধিকার চেতনার উত্তরাধিকার।

ইতিহাস আমাদের শেখায়, যাদের বিদায়ে মানুষ কাঁদে না, তারা ক্ষমতাবান হলেও নেতা ছিলেন না। আর যাদের বিদায়ে মানুষ বুক ফাটিয়ে কাঁদে তারা হয়তো ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন মানুষের হৃদয়ের শীর্ষে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি১৯৮৯ সালে তার জানাজায় অংশ নিয়েছিল এক কোটিরও বেশি মানুষ। সে সময় ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিল। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও সেই জানাজা স্থান পেয়েছে।

এরপর ২০২০ সালে শহিদ কাশেম সোলাইমানির জানাজায় প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণ ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। চলতি বছরের নভেম্বরে নাইজেরিয়ার ইসলামী পণ্ডিত শেখ তাহিরুল ওসমানির জানাজায় অংশ নেয় প্রায় ৪০ লাখ মানুষ।এই সংখ্যাগুলো কেবল ভিড় নয়।

এগুলো ভালোবাসার পরিমাপ। এগুলো আদর্শের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার প্রমাণ। আজ সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় উচ্চারিত হচ্ছে আরেকটি নাম ওসমান হাদি।
হয়তো সংখ্যার বিচারে তার জানাজা গিনেস বুকে উঠবে না।

কিন্তু হৃদয়ের হিসাবে, আদর্শের হিসাবে, ভালোবাসার হিসাবে এই বিদায় যুগ যুগ ধরে উচ্চারিত হবে।

কারণ হাদি ছিলেন সেই মানুষদের একজন, যাদের মৃত্যু মানুষকে দুর্বল করে না বরং আরও দৃঢ় করে তোলে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর