প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫

সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি সব্যসাচী লেখক ও কিংবদন্তির রাজপুত্র সৈয়দ শামসুল হক : শিরীণ আক্তার

সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিন উপলক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি
সব্যসাচী লেখক ও কিংবদন্তির রাজপুত্র সৈয়দ শামসুল হক
—— শিরীণ আক্তার

এক.
বাংলা সাহিত্যে যারা কেবল সৃষ্টিশীল লেখক শুধু নন,বরং একটি সাহিত্যিক চেতনার ধারক সৈয়দ শামসুল হক তাদের মধ্যে অন্যতম।কবিতা, নাটক,উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ, গান ও চিত্র নাট্যে তার সমান পারদর্শীতা তাকে দিয়েছে সব্যসাচী লেখক অভিদা। গীতিকার হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। মানুষের জটিল জীবন প্রবাহ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তার সাহিত্য কর্মের মূল প্রবণতা।সাহিত্যের গঠন শৈলীর প্রতি তিনি সর্বদাই নিরীক্ষা প্রিয়। সময়, সমাজ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সাহিত্যের গভীর সংযোগ তাকে পরিণত করেছে কিংবদন্তির রাজপুত্রে। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হচ্ছে — বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা,প্রতিধ্বনিগণ,পরাণের গহীন ভিতর, রজ্জু পথে চলেছি,।  পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, গণনায়ক, নূরলদীনের সারাজীবন, এখানে এখন, ঈর্ষা প্রভৃতি তার কাব্য নাটক।

সৈয়দ শামসুল হক বাংলা সাহিত্যে একমাত্র লেখক যিনি মাত্র ২৯ বছর বয়সে তার —- কাব্যের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন।তিনি আদমজি সাহিত্য পুরস্কার, নাসির উদ্দীন স্বর্ণপদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একুশে পদক সহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।

১৯৩৫সনে কুড়িগ্রামে জন্ম নেওয়া সৈয়দ শামসুল হক বেড়ে ওঠেন গ্রামীণ প্রকৃতি ও প্রান্তিক জনপদের মধ্যে। এই জীবনানুভব তার সাহিত্যে বারবার ফিরে এসেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন ” লেখক কখনও শূন্যে দাঁড়িয়ে লেখে না, সে তার সময়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে। ” এ সময় সচেতনতা তার সাহিত্যকে দিয়েছে ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক গভীরতা। কবি হিসেবে সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন গভীর ভাবে আত্মসচেতন দেশপ্রেমিক। তার কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভব ক্রমে রাজনৈতিক দার্শনিকতায় রূপ নিয়েছে। পরাণের গহীন ভিতর কাব্যে তিনি লিখেছেন,
” আমার ভেতরে এক দেশ জেগে থাকে
যে দেশ কথা বলে ক্ষুধার ভাষায় “।

এ পঙক্তিতে ব্যক্তি ও দেশের একাত্মতা প্রকাশ হয়েছে। তার কবিতায় তিনি কেবল সৌন্দর্য নয় দায়িত্বও বহন করেছেন। নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় কবিতায় তিনি যখন বলেন,
” নূরলদীনের কথা যেন সারাদেশে
পাহাড়ি ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়
অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে এ আশায়
নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক, জাগো বাহে কোনঠে সবায়? ”
সৈয়দ শামসুল হকের “নূরলদীনের সারাজীবন”  একটি বিখ্যাত কাব্যনাটক, যা ব্রিটিশ আমলে রংপুর অঞ্চলের কৃষক বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে রচিত এবং শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ ও  জাগরণের প্রতীকী আখ্যান। যেখানে নূরলদীন নামক এক
সাধারণ কৃষক হয়ে
ওঠে শোষিত মানুষের
বাতিঘর। যে ডাক
দেয়, “জাগো বাহে
কোনঠে সবায় “?

সব্যসাচী লেখক হিসেবে পরিচিত সৈয়দ শামসুল হকের অন্যতম  শ্রেষ্ঠ কীর্তি যা তার নাট্যশৈলীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উপন্যাস ‘নীল দংশন’ ও ‘খেলারাম খেলে যা’ তে তিনি দেখান ইতিহাস কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উক্তি — “রাষ্ট্র বড় হয় মানুষের ঘাড় মাড়িয়ে ”
এই বক্তব্যে লেখকের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিবাদী অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যে কেবল ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি একটি নৈতিক অবস্থান। তাঁর কবিতা, উপন্যাস, গল্প ও নাটকে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে।

দুই.
ভাষার ক্ষেত্রে সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন নিরীক্ষাধর্মী। তিনি একদিকে আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন অন্যদিকে উচ্চ কাব্যিক ও  নাট্যসংলাপ নির্মাণে ছিলেন সিদ্ধ হস্ত। পাশ্চাত্য নাট্যরীতি ও আধুনিকতাবাদের প্রভাব থাকলেও তার সাহিত্য কখনো দেশজ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি।

সব্যসাচী লেখক মানে যিনি একাধিক ক্ষেত্রে সমান পারদর্শী। বাংলা সাহিত্যে এই অভিধা খুব কম লেখকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।সৈয়দ শামসুল হক সেই বিরল প্রতিভার অধিকারী।সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি সৃষ্টি করেছেন মানসম্পন্ন রচনা। কবি হিসেবে তিনি ছিলেন সংবেদনশীল দার্শনিক। তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে সমাজ রাজনীতির সূক্ষ্ম বিশ্লেষক। নাট্যকার হিসেবে প্রতিবাদী ও নির্মোহ। প্রাবন্ধিক হিসেবে যুক্তিবাদী ও মননশীল। তাঁর এই সব্যসাচীতা কেবল বহুমুখিতা নয় একই চেতনা বোধের ভিন্ন ভিন্ন শিল্পরূপ। তাঁর সমস্ত সৃষ্টির কেন্দ্রে ছিল মানুষ। মানুষের স্বাধীনতা,মর্যাদা, প্রেম, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। এ কারণেই তাঁর সাহিত্য কোনো বিচ্ছিন্ন সৃষ্টিকর্মের সমষ্টি নয়,একটি সুসংহত সৃজন ভুবন। আর কিংবদন্তির রাজপুত্র সৈয়দ শামসুল হকের ক্ষেত্রে প্রতীকী ও অর্থবহ।

তিনি কোনো সাহিত্য ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়ে আসেননি। তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছিলেন নতুন ঐতিহ্য। জীবদ্দশাতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান।তাঁর কিংবদন্তির রাজপুত্র হওয়ার মূল ভিত্তিসমূহ হচ্ছে —
সৃষ্টির বহুমাত্রিকতা,
নৈতিক দৃঢ়তা,
সময়ের সঙ্গে সংলাপ এবং তাঁর সব্যসাচী লেখক সত্তা। তাঁর সৃজনশীলতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও স্বাধীন চিন্তা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে শক্ত ভিত্।

সুতরাং বলতে হয়,সৈয়দ শামসুল হককে যখন কিংবদন্তির রাজপুত্র বলা হয় সেই রাজপুত্রত্বের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে তাঁর সব্যসাচী লেখক সত্তা।  যা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে ব্যাপ্তী,গভীরতা  ও আন্তর্জাতিকতা। পরিশেষে বলতে হয়, সৈয়দ শামসুল হক আমাদের শিখিয়েছেন, সাহিত্য কেবল সৌন্দর্য নয়, এটি প্রতিবাদ,দায় ও মানবিকতার শিল্প। তিনি মূলতঃ ছিলেন সময়ের সন্তান, আবার সময়কে অতিক্রম করা এক সাহিত্যিক সত্তা। তাঁর সাহিত্য আমাদেরকে শেখায়, লেখক হওয়া কেবল শিল্পচর্চা নয়, বরং সময় ও মানুষের প্রতি দায় স্বীকার করা। তাই বাংলা সাহিত্যগগনে সৈয়দ শামসুল হক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন সব্যসাচী লেখক ও  কিংবদন্তির রাজপুত্র হয়ে।  যিনি শব্দ দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন মানবতা ও মুক্তির এক স্থায়ী রাজ্য।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর