
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
গতকাল ভোর ছয়টা।বাংলাদেশ যেন হঠাৎ করে একটু থেমে গেল। চারপাশে তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়ায়নি। পাখির ডাক, আজানের ধ্বনি, শহরের ঘুম ভাঙার প্রস্তুতির মধ্যেই খবরটি মানুষের বুকের ভেতর নেমে এলো বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। কেউ চিৎকার করল না, কেউ হৈচৈ করল না। তবু মনে হলো, একটি জাতির ভেতরে কোথাও গভীরভাবে কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
রাজনীতি সচেতন মানুষ হোক কিংবা রাজনীতির বাইরে থাকা সাধারণ নাগরিক সবার মনেই তৈরি হলো এক ধরনের শূন্যতা। শব্দহীন, নিঃশ্বাস আটকে দেওয়া এক শূন্যতা। যেন দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত একটি কণ্ঠ হঠাৎ থেমে গেছে। যেন পরিচিত এক ছায়া আর পাশে নেই। এই মৃত্যু শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায় নয়।এটি একটি সময়ের সমাপ্তি। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, কঠিন, রক্তাক্ত ও সংগ্রামী অধ্যায়ের ইতি।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট, ফেনীর পশুরাম এলাকায় এক মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন খালেদা খানম পুতুল। সেদিন কে জানত এই মেয়েটির জীবন একদিন জড়িয়ে যাবে একটি দেশের ভাগ্য, আশা ও হতাশার সঙ্গে। সাধারণ এক পারিবারিক জীবনের স্বপ্ন নিয়েই তাঁর বেড়ে ওঠা। রাজনীতির কোনো প্রস্তুতি ছিল না, ক্ষমতার কোনো বাসনা ছিল না। ১৯৬০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের পর তাঁর জীবন ধীরে ধীরে প্রবেশ করে রাষ্ট্রীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু এই যাত্রা ছিল না আরামের, ছিল না নিরাপত্তার। এটি ছিল দায়িত্বের, অনিশ্চয়তার এবং একের পর এক ত্যাগের পথচলা।
১৯৭৭ সালে তিনি হন বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি। তখন হয়তো অনেকেই ভেবেছিলেন, এখানেই তাঁর গল্প শেষ। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে সেই পরিচয়ের মধ্যেই আটকে রাখেনি। ১৯৮১ সালে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডে স্বামীকে হারানোর পর তাঁর জীবনের মোড় চিরতরে বদলে যায়। সেই দিনটি শুধু একজন রাষ্ট্রপতির হত্যার দিন ছিল না, ছিল একজন স্ত্রীর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার রাত।
কিন্তু সেই শোক তাঁকে ভেঙে দেয়নি। বরং ধীরে ধীরে তাঁকে শক্ত করে তুলেছিল। একজন নিঃসঙ্গ নারী তখন দাঁড়িয়ে গেলেন রাষ্ট্রের সামনে। নিজের ব্যক্তিগত কষ্টকে বুকের ভেতর চেপে রেখে তিনি দায়িত্ব নিলেন একটি রাজনৈতিক দলের, পরে একটি আন্দোলনের, পরে একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার।
১৯৮২ সালে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে খালেদা জিয়ার জীবন হয়ে ওঠে সংগ্রামের সমার্থক। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন দৃঢ়, অবিচল, অনমনীয়। রাজপথে আন্দোলন, সভা-সমাবেশ, গ্রেপ্তার, কারাবরণ এই শব্দগুলোই হয়ে ওঠে তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারের অন্ধকার কক্ষ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অব্যাহত চাপ কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। এই সময়েই তিনি পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ নামে। এই নাম শুধু একটি রাজনৈতিক অভিধা ছিল না এটি ছিল তাঁর মানসিক শক্তির পরিচয়। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করা, তরুণদের রাজপথে নামানো এই কাজটি ছিল সহজ নয়। কিন্তু খালেদা জিয়া তা করেছিলেন দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে। সেই ছাত্ররাই একদিন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অগ্রভাগে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাস আজও সাক্ষ্য দেয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই সংগ্রামে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অনিবার্য।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি নির্বাচিত হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফিরে পায় সংসদীয় গণতন্ত্র। দীর্ঘ সময়ের স্বৈরশাসনের পর মানুষ আবার ভোটের অধিকার ফিরে পায়, কথা বলার সাহস ফিরে পায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়টা ছিল দেশের জন্য নতুনভাবে দাঁড়ানোর সময়। অর্থনীতিতে গতি আসে, কর্মসংস্থান বাড়ে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে নারীর অংশগ্রহণ নতুন দিগন্ত তৈরি করে। শিক্ষা খাতে নেওয়া উদ্যোগ বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি আজও সমাজে প্রভাব রেখে চলেছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি ছিলেন স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠস্বর। জাতিসংঘে গঙ্গার পানি বণ্টনের প্রশ্ন, হোয়াইট হাউসে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সংকট বিশ্ব দরবারে তিনি তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের কথা, বাংলাদেশের মানুষের কষ্ট।
ক্ষমতা ছাড়ার ক্ষেত্রেও তিনি দেখিয়েছিলেন বিরল দৃষ্টান্ত। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হয়েও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এটি ছিল রাজনৈতিক পরিপক্বতার এক অনন্য উদাহরণ। বিরোধী দলে থেকেও তিনি ছিলেন শক্ত অবস্থানে। সংসদে গড়ে তুলেছিলেন কার্যকর বিরোধিতা।
২০০১ সালে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। শিক্ষা, প্রশাসন, সামাজিক খাতে তাঁর সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলেছিল। এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর আসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। এক-এগারো, জরুরি অবস্থা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, কারাবাস। পরিবারের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ চাপ। সন্তানদের গ্রেপ্তার করা হয়, তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলে। কিন্তু তিনি যাননি।
তিনি বলেছিলেন,দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই। এই কথার ভেতর ছিল ভয় নয়, ছিল নীরব দৃঢ়তা। ২০১০ সালে বাসা থেকে উচ্ছেদ, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অবরুদ্ধ জীবন। আর ঠিক সেই সময়েই প্রবাসে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু। একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা কল্পনা করা কঠিন। হয়তো সেই সময় তিনি কাঁদতেও পারেননি। রাষ্ট্র, রাজনীতি, আন্দোলনের চাপের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁকে শক্ত হয়ে।
২০১৮ সালে দেওয়া কারাদণ্ড আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নের মুখে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ জানায়। তবু সময় থেমে থাকেনি। সময় এগিয়েছে, ইতিহাস নিজের পথে চলেছে।২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি মুক্তি পান। বয়স ও অসুস্থতা তাঁকে দুর্বল করেছিল, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ছিল পরিণত এক রাষ্ট্রনায়কের বার্তা। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন ধ্বংস নয়, প্রতিহিংসা নয়, শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা। আজ তিনি নেই। কিন্তু রেখে গেছেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস।এক নারীর নীরব সহনশীলতা। এক নেত্রীর অবিচল দৃঢ়তা। বাংলাদেশ আজ একজন রাজনীতিককে নয় একটি সময়কে বিদায় জানাল।
কিন্তু যতদিন এই দেশে গণতন্ত্রের কথা বলা হবে, সংগ্রামের কথা বলা হবে বেগম খালেদা জিয়া ততদিন থাকবেন মানুষের স্মৃতিতে, নীরব শ্রদ্ধায়, ইতিহাসের পাতায়। আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করি তিনি যেন বেগম খালেদা জিয়াকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। আমিন।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথার
আপনার মতামত লিখুন :