
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন যেন এক ‘সিজনাল অফার’ চলছে। এক সময় এ দেশের রাজনীতি ছিল অনেকটা ‘অ্যানালগ’ ঘরানার। তখন এক দলের নেতা অন্য দলের কর্মীকে ধাওয়া দিয়েছে কিংবা লাঠালাঠি-পাল্টাপাল্টি করেছে; সেটুকুই ছিল রাজনীতির চেনা ব্যাকরণ। কিন্তু কালক্রমে সেই ব্যাকরণ বদলেছে। মানুষের জীবন যেমন আধুনিক হয়েছে, রাজনীতির মারপ্যাঁচও হয়েছে অত্যন্ত ‘স্মার্ট’। এখন আর বাইরের শত্রু লাগে না; নিজের দলের ভেতরেই ‘ভাইয়ে ভাইয়ে’ এমন নিবিড় ভ্রাতৃত্ব যে, স্বার্থের দ্বন্দ্বে মাঝেমধ্যে রাজপথে লাঠালাঠি না করলে যেন কারো পেটের ভাত হজম হতে চায় না। রাজনীতির মাঠ এখন অনেকটা শোরগোলপূর্ণ মাছের বাজারের মতো যেখানে আদর্শের চেয়ে দর কষাকষি আর গলার জোরটাই দিনশেষে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
বিগত বছরগুলোর রাজনৈতিক মহড়াগুলোর দিকে তাকালে এক অদ্ভুত পরিহাস চোখে পড়ে। তৎকালীন সরকার কৌশলের ফাঁদ পাতল আর বিচিত্র সব রাজনৈতিক দল যেন অনেকটা জেনেবুঝেই সেই মরণফাঁদে পা দিল। প্রতিবাদ যে হয়নি তা নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের ‘কঠোর হস্ত’ আর ‘পক্ষপাতমূলক আচরণের’ তপ্ত নিশ্বাসে সেই প্রতিবাদী স্বরগুলো খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল। আমাদের দেশের এক শ্রেণির সুশীল সমাজ আবার কলম চালানোয় বেশ ওস্তাদ। তাঁরা এসি রুমে বসে পত্রিকার পাতায় তপ্ত বাক্যবাণ ছুড়লেন ঠিকই, কিন্তু তপ্ত রোদে মাঠে নেমে ধুলোবালি মাখার কষ্টটুকু আর সইলেন না। আর প্রতিবেশী দেশ? তারা তো বরাবরই বন্ধুর মুখোশ পরে দূর থেকে হাততালি দিয়ে উৎসাহ জুগিয়ে গেছে, যেন এক রোমাঞ্চকর নাটক মঞ্চস্থ হতে দেখছে তারা।
তবে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত বিপ্লব পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর দৃশ্যপট হঠাৎ আমূল বদলে গেছে। দীর্ঘ সতেরো বছর যারা মুখে কুলুপ এঁটে অন্ধকারের প্রহর গুনছিলেন এবং টুঁ শব্দটি করার সাহসটুকুও সঞ্চয় করতে পারেননি, এখন তাঁদের গলাই সবচেয়ে চড়া। চারদিকে এখন শুধুই অধিকার আদায়ের মিছিল। ছাত্র-জনতা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী—সবাই যেন সহসা এক মহাজাগরণে জেগে উঠেছেন। সরকারকে দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা বুঝি মর্ত্যের সব অমীমাংসিত সংকটের জাদুকরী সমাধান দিতেই ক্ষমতায় এসেছেন। মানুষের মনে দীর্ঘকাল পর আশার প্রদীপ জ্বলছে। তারা ভাবছে, হয়তো অনেক বসন্ত পর নিজের ভোটটা নিজেই নির্ভয়ে দিতে পারবে। তবে এই পরিবর্তনের পিচ্ছিল পথ কতটা নিরাপদ, তা বুঝতে আমাদের আরও কিছুদিন ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতিতেই অটল থাকতে হবে।
এই বাজারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দৃশ্য হলো ‘নতুন দল’ গঠনের এক অভূতপূর্ব হিড়িক। বিশেষ করে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP) বা এনসিপি-র মতো দলগুলো যখন রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রে পাল তোলে, তখন জনমনে একই সাথে কৌতূহল ও শঙ্কার উদ্রেক হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, যারা যোগাযোগের কৌশলে দক্ষ এবং সময়মতো সঠিক চালটি চালতে পারবে, তারাই হবে আগামীর ভোটের মাঠের আসল কারিগর। তবে সংশয়ের জায়গাটি হলো এই নতুন খেলোয়াড়রা মাঠে নামতে না নামতেই কেন ‘পুরানো খেলোয়াড়দের’ ড্রেসিংরুমে ভিড় বাড়াচ্ছেন?
একটি প্রবাদ আছে, ‘পুরানো চাল ভাতে বাড়ে’। তবে বর্তমান বাজারে ‘নতুন চালের’ কড়কড়ে ঘ্রাণও কিন্তু বেশ চড়া দামে বিকোচ্ছে। এনসিপি-র মতো দলগুলো যখন জামায়াতে ইসলামীর মতো সুসংগঠিত শক্তির সাথে কৌশলগত রসায়নে মেতে ওঠে, তখন প্রশ্ন জাগে এটি কি শুধুই রাজনৈতিক বাস্তবতা, নাকি ক্ষমতার স্বাদ নিতে পুরোনো পথেই হাঁটা? জুলাই বিপ্লবের সেই শুদ্ধ স্লোগানগুলো কি তবে শেষমেশ পুরোনো সেই ‘জোট-মহাজোট’ আর ‘সিট ভাগাভাগির’ চোরাবালিতেই পথ হারাবে? নতুন দলগুলো যদি কেবল বড় দলের ‘বি-টিম’ বা ছায়া হয়ে দাঁড়াতে চায়, তবে তারা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে চরম প্রতরণাই করবে। তাদের মনে রাখা উচিত, সস্তা জনপ্রিয়তার প্লাস্টিক চাল দিয়ে ক্ষুধার্ত জাতির পেট ভরে না।
তবুও আমরা আশাবাদী হতে চাই। অনেক বছর পর এই জনপদের রাজনীতিতে মেধাবী তরুণদের স্বপ্ন ও সাহসের মিলন ঘটেছে। এনসিপি বা সমমনা দলগুলো যদি সত্যিই একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন কোনো রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম দিতে পারে, তবে তা হবে দেশের জন্য আশীর্বাদ। আমরা এমন এক বাংলাদেশের প্রতীক্ষায় আছি যেখানে পেশিশক্তির আস্ফালন নয়, বরং মেধার লড়াই হবে। যেখানে দলগুলো একে অপরকে ‘নির্মূল’ করার শপথ না নিয়ে ‘জনসেবার’ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে।
রাজনীতির এই নতুন সমীকরণে শেষ পর্যন্ত কার পাতে কোন মাছ উঠবে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এই জনপদের সাধারণ মানুষ শুধু এটুকুই চায় যেন মাছ কেনা হোক বা না হোক, বাজারের তীব্র শোরগোলে তাদের কান ঝালাপালা না হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতির এই ডামাডোলে যেন পচা মাছ কোনোভাবেই তাদের পকেটে ঢুকিয়ে দেওয়া না হয়। জুলাইয়ের যে স্পিরিট আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে, সেই স্পিরিট যেন নতুন দলগুলোর হাত ধরে একটি টেকসই ও অর্থবহ গণতন্ত্রের ঠিকানায় পৌঁছে দেয়। দিনশেষে এ দেশবাসীর এটাই একমাত্র মিনতি।
আপনার মতামত লিখুন :