প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

নদীভাঙন আর অবহেলায় সুবর্ণচরে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে খেজুরের রস

উপজেলা প্রতিনিধি, সুবর্ণচর :
শীত এলেই একসময় সুবর্ণচর উপজেলায় ভোরের কুয়াশার সঙ্গে মিশে থাকত খেজুরের রসের মিষ্টি গন্ধ। গ্রামের পথে পথে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা খেতের আইলে সারি সারি খেজুর গাছে ঝুলে থাকত হাঁড়ি। ফজরের আজানের আগেই গাছিরা রস নামাতে বের হতেন, আর সেই রস দিয়েই তৈরি হতো পিঠা-পুলি, গুড় আর শীতের নানান ঐতিহ্যবাহী খাবার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। শীত আছে, কুয়াশা আছে, কিন্তু সুবর্ণচরে খেজুরের রস আজ বড়ই দুষ্প্রাপ্য।

স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, কয়েক দশক আগেও সুবর্ণচরের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই খেজুর গাছ ছিল। নদীভাঙনে বহু বসতভিটা ও জমি বিলীন হয়ে গেছে, সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে অসংখ্য খেজুর গাছ। আবার অনেক জায়গায় রাস্তা, ঘরবাড়ি ও নতুন স্থাপনা নির্মাণের সময় এসব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। নতুন করে খেজুর গাছ লাগানোর তেমন উদ্যোগ না থাকায় গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

গাছিরা জানান, খেজুরের রস সংগ্রহ এখন আর আগের মতো লাভজনক নয়। গভীর রাতে ঠান্ডার মধ্যে গাছে ওঠা, ঝুঁকি নিয়ে হাঁড়ি বসানো এবং ভোরে রস নামানো—সব মিলিয়ে পরিশ্রম অনেক। কিন্তু গাছ কমে যাওয়ায় এবং রসের পরিমাণ কম হওয়ায় ঠিকমতো আয় হয় না। তাই অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ বলেন, “আগে এক রাতেই কয়েক হাঁড়ি রস পাওয়া যেত, এখন একটা গাছ থেকেও ঠিকমতো রস মেলে না।”

সাধারণ মানুষের মধ্যেও আক্ষেপ স্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, এখনকার প্রজন্ম শীতের আসল স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাজারে যে রস বা গুড় পাওয়া যায়, তার দাম বেশি এবং বিশুদ্ধতা নিয়েও সন্দেহ থাকে। ফলে আগের মতো ঘরে ঘরে খেজুরের রস দিয়ে পিঠা বানানোর দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না।

পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। শীতের তাপমাত্রা আগের মতো স্থায়ী না থাকায় খেজুর গাছ থেকে স্বাভাবিক রস নিঃসরণ ব্যাহত হচ্ছে। কখনো শীত দেরিতে আসে, কখনো হঠাৎ গরম পড়ে যায়—এর প্রভাব সরাসরি রস উৎপাদনে পড়ছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বীকার করছেন, খেজুর গাছ ও রসের ঐতিহ্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা নেওয়া হয়নি। তারা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ, গাছিদের উৎসাহ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে আবারও এই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সুবর্ণচরের মানুষ মনে করেন, খেজুরের রস শুধু একটি খাদ্য নয়, এটি শীতকালীন গ্রামবাংলার সংস্কৃতির অংশ। এই ঐতিহ্য রক্ষা করতে এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে শীত মানেই কেবল কুয়াশা থাকবে, কিন্তু খেজুরের রস থাকবে শুধু স্মৃতির গল্পে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর