প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৈষম্য: একটি নিরন্তর আক্ষেপ ও উত্তরণের পথ – আব্দুল কাদের

রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো মূলত এক একটি ইটের গাঁথুনি যা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিষ্ঠার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি দক্ষ এবং জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার প্রধান শর্ত হলো সেই প্রশাসনের প্রাণশক্তিদের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে মোট ১০টি জাতীয় বেতন কমিশন গঠিত হয়েছে। প্রতিটি নতুন স্কেল ঘোষণার সময় বেতন বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমানে ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বেতন কি কেবল সংখ্যায় বেড়েছে নাকি সাধারণ কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান প্রকৃতপক্ষে উন্নত হয়েছে, তা আজ গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

পে-স্কেলের বিবর্তন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৯৭৩ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সরকার যখন প্রথম বেতন কাঠামো ঘোষণা করেন, তখন মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। সে সময় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত নগণ্য যা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ইঙ্গিত প্রদান করেছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে ১৯৭৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন স্কেল ঘোষণা করা হয়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলে। এই স্কেলে পূর্ববর্তী কাঠামোর তুলনায় বেতন প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয় এবং সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের মতো জটিল পদ্ধতিগুলো বাতিল করে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রথা চালু করা হয়। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেখা গেছে যে এই বিপুল বেতন বৃদ্ধির সুফল বাজার সিন্ডিকেট আর লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ কর্মচারীদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে।

২০২৬ সালের বাস্তবতা ও প্রস্তাবিত স্কেলের বিশ্লেষণ :
বর্তমান ২০২৬ সালের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ২০১৫ সালের নির্ধারিত বেতন কাঠামো আজ তার কার্যকারিতা প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়েছে। ২০তম গ্রেডের বর্তমান ৮,২৫০ টাকার বিপরীতে যে ২০,০০০ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের নিরিখে কোনো বিলাসিতা নয় বরং একটি মৌলিক মানবিক দাবি।

প্রস্তাবিত এই কাঠামোটি বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচিত হয়। উচ্চতর গ্রেডগুলোতে বেতনের অংক যেভাবে বৃদ্ধি করার কথা বলা হয়েছে, তাতে নিম্নতর গ্রেডগুলোর সাথে বিদ্যমান ব্যবধান আরও প্রকট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যখন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বেতন এবং একজন অফিস সহায়কের বেতনের পার্থক্য টাকার অংকে লাখ ছাড়িয়ে যায়, তখন প্রশাসনের তৃণমূল পর্যায়ে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতা ও অসন্তোষ জন্ম নেয়। এই বিশাল ব্যবধান দূর করা না গেলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

বৈষম্য বজায় থাকার প্রধান কারণসমূহ:
সরকারি বেতন কাঠামোতে বৈষম্য কেবল মূল বেতনে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি বিভিন্ন ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। প্রথমত, ২০১৫ সালে ৮,২৫০ টাকা দিয়ে যে পরিমাণ নিত্যপণ্য কেনা সম্ভব ছিল, আজ ২০২৬ সালে তার দ্বিগুণ অর্থ দিয়েও তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাজারের প্রকৃত মূল্যস্ফীতির সাথে পাল্লা দিতে পারছে না।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা ভাতা এবং শিক্ষা সহায়তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো গ্রেড অনুযায়ী ভিন্ন হওয়া মোটেও যৌক্তিক নয়। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সন্তানের শিক্ষার ব্যয় এবং একজন নিম্ন পদের কর্মচারীর সন্তানের শিক্ষার ব্যয় একই বাজার দ্বারা নির্ধারিত। অথচ ভাতার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক। এছাড়া উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি ঋণ ও গৃহ ঋণের যে বিপুল সুবিধা রয়েছে, নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে তার ছিটেফোঁটাও নেই। এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্যই মূলত বেতন বৈষম্যকে জিইয়ে রেখেছে।

বৈষম্য নিরসনে টেকসই সমাধানের পথ  একটি বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও কার্যকর প্রশাসন গড়তে হলে কেবল বেতন বাড়ানোই যথেষ্ট নয় বরং এর জন্য প্রয়োজন নীতিগত আমূল পরিবর্তন। নিচে বৈষম্য নিরসনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হলো।
সর্বপ্রথম সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই ব্যবধান এক ও পাঁচের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ ২০তম গ্রেডের বেতন যদি ২০,০০০ টাকা হয় তবে সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন ১,০০,০০০ টাকার আশেপাশে থাকা উচিত। এতে করে সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের মধ্যে বঞ্চনার বোধ কাজ করবে না।

দ্বিতীয়ত, প্রতি ৫ বা ১০ বছর অন্তর নতুন পে-কমিশনের জন্য অপেক্ষা না করে অটো-ইনডেক্সিং পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক ঘোষিত বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হারের সাথে সমন্বয় করে প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করলে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কখনো হ্রাস পাবে না। এছাড়া চিকিৎসা ভাতা এবং শিক্ষা সহায়তা সকল গ্রেডের জন্য সমান করা উচিত কারণ এসব মৌলিক চাহিদা পদের ওপর নির্ভর করে না।

তৃতীয়ত, মহানগরীগুলোতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য সুলভ মূল্যে টিসিবির মাধ্যমে স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা এবং সরকারি আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরি। বচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে না পারলে কোনো স্কেলই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে না।

বাস্তবসম্মত সুপারিশমালা :
বেতন বৈষম্য নিরসন এবং একটি সুষম বেতন কাঠামো গড়ে তুলতে নিম্নলিখিত নীতিমালা গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. রেশিও ভিত্তিক বেতন নির্ধারণ: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অনুপাত (যেমন ১:৫ বা ১:৬) বজায় রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর ফলে যখনই উচ্চতর গ্রেডের বেতন বৃদ্ধি পাবে, তার সাথে আনুপাতিক হারে নিম্ন গ্রেডের বেতনও সমন্বয় হবে। এটি সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনবে।

২. মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় সূচক : প্রতি ৫ বা ১০ বছর পর পর নতুন পে-কমিশনের জন্য অপেক্ষা না করে প্রতি বছর সরকারিভাবে ঘোষিত মুদ্রাস্ফীতির হারের সাথে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল বেতন বৃদ্ধির বিধান করতে হবে। এতে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাজারে অস্থিতিশীলতার মুখেও সুরক্ষিত থাকবে।

৩. অভিন্ন ভাতা নীতিমালা: শিক্ষা ভাতা, চিকিৎসা ভাতা এবং টিফিন ভাতার মতো বিষয়গুলো গ্রেড নির্বিশেষে সমান হওয়া উচিত। কারণ বাজারের ওষুধের দাম বা সন্তানের শিক্ষার ব্যয় পদের উচ্চতা দেখে নির্ধারিত হয় না। এই বৈষম্য দূর করলে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।

৪. রেশন ও আবাসন নিরাপত্তা: কেবল বেতন বৃদ্ধি করলেই বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তাই বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি মহানগরীগুলোতে ডরমিটরি বা যৌথ আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলে আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।

বৈষম্য বজায় থাকার প্রধান কারণসমূহ:
সরকারি বেতন কাঠামোতে বৈষম্য কেবল মূল বেতনে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি বিভিন্ন ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান। প্রথমত, ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বাজারের প্রকৃত মূল্যস্ফীতির সাথে পাল্লা দিতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি ঋণ ও গৃহ ঋণের যে বিপুল সুবিধা রয়েছে, নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে তার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্যই মূলত বেতন বৈষম্যকে জিইয়ে রেখেছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৈষম্য কেবল একটি আর্থিক হিসাব নয় বরং এটি একটি মানবিক ও সামাজিক প্রশ্ন। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রশাসনের সর্বনিম্ন স্তরের কর্মচারীটি তার পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা না পাবে, ততক্ষণ একটি দুর্নীতিমুক্ত ও গতিশীল রাষ্ট্র উপহার দেওয়া সম্ভব নয়। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের উচিত কেবল সংখ্যা দিয়ে বেতন নির্ধারণ না করে কর্মচারীদের পুষ্টি, শিক্ষা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রস্তাবিত বেতন স্কেলটি যদি বৈষম্য কমিয়ে এবং প্রকৃত বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই তা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর